পানিবন্দিদের উদ্ধারে ফেসবুকে স্বজনদের আকুতি

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টিতে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যা সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে ফেনীতে। এছাড়া চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, খাগড়াছড়ি এবং কক্সবাজার জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব জেলাগুলোতে বন্যায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

হঠাৎ বন্যায় তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি। মানুষ বাড়ির ছাদে, গাছের ডালে আশ্রয় নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন। যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর হাহাকার। ফেনী সদর, পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, দাগনভূঞাসহ প্রায় সব উপজেলায় এখন এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সড়ক ডুবে যাওয়ায় সড়কপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় ও মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ায় ঠিকভাবে যোগাযোগ সম্ভব হয়ে উঠছে না। তাই এসব জেলা থেকে দেশে বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরতরা নিজ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় তারা পানিবন্দি স্বজনদের উদ্ধারে ফেসবুকে সহযোগিতা চাচ্ছেন।

এমনি একজন ফেনী সদরের  ইমামুল হাসান আদনান। যিনি ঢাকায় বেসরকারি একটি পত্রিকায় কাজ করেন। হঠাৎ বন্যায় স্বজনদের কাছে যেতে পারেননি। মোবাইলে স্বজনদের খোঁজখবর নিতে পারলেও গতকাল রাত ১২টা থেকে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। তাই নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন ‘গতকাল রাত ১২টা থেকে বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। বাড়িতে শতাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। ফেনীর পরিচিত কারো নাম্বারই খোলা নাই। পরিচিত কেউ এ স্ট্যাটাস দেখে থাকলে প্লিজ সংবাদ জানান। দম বন্ধ হয়ে আসছে। ফেনী সদরের বালিগাঁও ইউনিয়নের সুন্দর গ্রামে ফয়েজ ভূঁইয়া বাড়িতে স্বজনরা পানিবন্দি।’

জিয়ন সরকার নামের আরেকজন নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আমার (বিপা) আপুর সাথে গতকাল বিকেল থেকে যোগাযোগ করতে পারছি না। তবে বিশ্বাস আছে আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে। এই স্ট্যাটাস দেয়ার সময় চোখ ভিজে যাচ্ছে। সবার কাছে দোয়ার আরজি, একটাই বোন আমার। ফেনী শাহিন একাডেমির পাশেই ওদের বাসা। মিস ইউ আলিজা মামা।’ 

সুজানা মালিহা নামের একজন নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘ফেনী সদর, পাঠানবাড়ি রোড ওইদিকে কী কোনো ভলান্টিয়ার টিম এসেছেন? থাকলে দয়া করে জানান। গত দুইদিন আগে শেষবারের মতো যোগাযোগ হয়েছে। দুইদিন আগে থেকেই খাবার পানি শেষ, আর কোন ধরনের পানিও পানি, তাই খাবার পানির প্রচন্ড দরকার। কেউ ওইদিকে একটু পানি পৌঁছাতে পারবেন শুধু।’

বন্যাকবলিত ফেনীসহ অন্যান্য জেলায় পানিবন্দি মানুষদের বাঁচাতে ঠিক এভাবেই স্যোশাল মিডিয়ায় আকুতি জানাচ্ছেন স্বজনসহ নিকটআত্মীয়রা। বন্যায় পানিবন্দি মানুষদের নিরাপদ স্থানে নিতে উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

এদিকে বন্যায় দেশের ১১ জেলায় ৭৭ উপজেলা প্লাবিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়ন/পৌরসভা ৫৮৪টি। এ পর্যন্ত ১৩ জন মারা গেছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ৪৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৩৫ জন। শুক্রবার (২৩ আগস্ট) সচিবালয়ে চলমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুল হাসান এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের ১১টি জেলা বন্যা প্লাবিত আছে। বন্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে ফেনীতে। এছাড়া চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, খাগড়াছড়ি এবং কক্সবাজার জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। ১১ জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ৪৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৩৫ জন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৬২৯ জন বলেও জানান তিনি। এখন পর্যন্ত বন্যায় মোট ১৩ জন মারা গেছেন জানিয়ে দুর্যোগ সচিব বলেন, এর মধ্যে দুইজন নারী রয়েছেন। কুমিল্লায় ৪ জন, ফেনীতে একজন, চট্টগ্রামে ২ জন, নোয়াখালীতে একজন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন, লক্ষ্মীপুরে একজন এবং কক্সবাজারে তিনজন মারা গেছেন।