সতর্কতাই আত্মরক্ষা

চলমান ভারী বৃষ্টি এবং উজানে ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের ১২ জেলা হঠাৎ বন্যার কবলে পড়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বৃষ্টি কমে আসবে। সেই হিসাবে আজকের মধ্যেই পানি যখন নেমে আসবে, ঠিক তখনই শুরু হবে জীবনসংগ্রাম। বন্যার চেয়েও কঠিন, বন্যাপরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। এখন পর্যন্ত ১৩ জন মারা গেছেন। বন্যাকবলিত এলাকায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ সদস্য ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। এ বিষয়ে শুক্রবার দেশ রূপান্তরে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে মধ্য এশিয়ার উপরিভাগে ‘জেট স্ট্রিম’ অবস্থান করছে। ফলে ভারতসহ বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। প্রতি বছর ভারত বন্যায় আক্রান্ত হলেই বাঁধ খুলে দেয়। এ বছরও কোথাও কোথাও বাঁধ খুলে দিয়েছে। আস্তে আস্তে পানি কমে আসার পর জেগে উঠবে ডুবে যাওয়া ঘরবাড়ি আর জনপদ। একই সঙ্গে বন্যাক্রান্ত মানুষ মুখোমুখি হবে বিভিন্ন সমস্যার। কর্তৃপক্ষকে বন্যা হওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করে এখন সতর্ক হতে হবে।

আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আজকের মধ্যেই দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসতে পারে। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মনু, খোয়াই, ধলাই নদীগুলোর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল থেকে পরবর্তী সময়ে উন্নতি হতে পারে। এ ছাড়া দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানের ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসতে পারে। এ সময় ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার মুহুরী, ফেনী, গোমতী, হালদা ইত্যাদি নদীগুলোর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল থেকে উন্নতি হতে পারে।    

যেসব এলাকায় রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর ভাঙন দেখা দিয়েছে সেগুলো দ্রুত মেরামত করতে হবে। না হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটবে।  সেই সঙ্গে যেসব স্কুলে অবকাঠামোর অবনতি হয়েছে সেগুলো ঠিক করতে হবে। যেসব জায়গায় রেলসেতু ভেঙে পড়েছে সেগুলো অস্থায়ীভাবে নয়, স্থায়ীভাবে মেরামত করতে হবে। যেসব কালভার্ট ধসে পড়েছে সেগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে মেরামত করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বন্যাপরবর্তী সময়ে আক্রান্তদের বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন করার বিষয়টি। এ বিষয়ে প্রত্যেক মানুষকে সচেতন করার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য টিম গঠন করা দরকার। বন্যাপরবর্তী মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ঝুঁকি অনেক বেশি। এরইমধ্যে ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বন্যাকবলিত এলাকায় খাবার ও পানির সংকট তৈরি হয়েছে। এজন্য তাদের বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে হবে। ডায়রিয়া-আমাশয়ের মতো রোগ থেকে রক্ষা পেতে স্যালাইন ও অন্যান্য ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া পানিবাহিত রোগ থেকে রক্ষা পেতে মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। বন্যায় অনেক মানুষ ধান, গবাদি পশু ও খামারের মাছ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। অনেকে কর্মসংস্থানহীন। এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে আছে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশু। বন্যাদুর্গতদের সহযোগিতায় উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সহযোগিতার জন্য পৌঁছেছে সেনাবাহিনী ও কোস্ট গার্ড। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্বেচ্ছাসেবীরাও সেখানে যাচ্ছেন। সেনাসদস্যরা ত্রাণ ও খাদ্য বিতরণসহ উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

আমরা প্রত্যাশা করি, ঘরবাড়ি-রাস্তাঘাট মেরামত ও কৃষিতে ক্ষতিপূরণসহ সব বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে। এখন সময় রাজনৈতিক মতপার্থক্যের নয়, একজন আরেকজনের কাছাকাছি আসাই মানবিকতা। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা আরও খারাপ পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্ক করেছেন। দেশের অন্যান্য জেলা বন্যাকবলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে সতর্কতার সঙ্গে প্রস্তুতি নিতে হবে। যেসব জেলায় বাঁধের অবস্থা করুণ, তা দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ করে প্রস্তুত থাকতে হবে। সমষ্টিকে রক্ষা করতে হলে, কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে তা সিদ্ধান্ত হোক। ত্রাণ ব্যবস্থাপনা যেন ঠিকমতো হয়। মানবিকতার চেয়ে প্রকৃষ্ট কিছু থাকতে পারে না, থাকতে নেই। আমরা যেন মানবিক হই।