বন্যায় অন্তত ৪৯ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। সরকারি উদ্যোগে দুই লাখের মতো মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ের কোনো হিসাব না থাকলেও এ সংখ্যা দুই লাখের বেশি হওয়ার কথা নয়। সে হিসাবে এখনো পনিবন্দি আছে ৪০ লাখের মতো মানুষ। এসব মানুষ আত্মীয়স্বজন ও নানা মাধ্যমে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনদের বাঁচাতে উদ্ধারকারীদের সহায়তা চাইছেন। আবার অনেকেই উদ্ধারকারী দলের ফোন নম্বর দিয়ে ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে পোস্ট করছেন। বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দারা উদ্ধারকারী দলের অপেক্ষা করছেন। তাদের কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনকে ফোন করে উদ্ধারের আকুতি জানাচ্ছেন। অনেকে এলাকার মসজিদের মাইক থেকে বানভাসি মানুষদের উদ্ধারের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এদিকে সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। খোলা হয়েছে একাধিক হেল্প লাইন। পুলিশ জানিয়েছে, ৯৯৯-এ কল করলে আটকে পড়া মানুষকে তারা উদ্ধারে সহায়তা করবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কন্ট্রোল রুমে তথ্য ও সহযোগিতার জন্য ০২৫৫১০১১১৫ নম্বরে কল করতে অনুরোধ করা হয়েছে। তাছাড়া জানমালের নিরাপত্তায় ও মানবিক সহায়তাসহ যেকোনো প্রয়োজনে র্যাব কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে (০১৭৭৭৭১০৭৯৯) যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করেছে। কিন্তু অনেক এলাকার মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় আত্মীয়দের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছে না দুর্গতরা। গতকাল বিকেলে জাহিদুল ইসলাম চৌধুরী নামে একজন ফেসবুকে পোস্টে লেখেন, ‘আমার মেজো আপা, তার বড় ছেলে এবং দুলাভাই গত চার দিন তাদের বাড়ির ছাদে আটকে আছেন। এখন পর্যন্ত কোনো রেসকিউ টিম তাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। যদি কেউ পারেন তাহলে দয়া করে নিচের লোকেশনে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন। আমার ভাগিনার মোবাইল নম্বর ০১৮৮১৫০৯৭৪৭। লোকেশন পুরাতন মুহুরীগঞ্জ থেকে ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার আগে।’
মাহতাব হোসাইন সিয়াম নামে একজন লেখেন, ‘জরুরি সাহায্যের প্রয়োজন। আমি আর পারছি না। সারা দিন কারও হেল্প পেলাম না। দুই মাস বয়সী বাবুর অনেক জ¦র। আমার স্ত্রী না খেয়ে আর টিকতে পারছে না। অনেক চেষ্টা করে, লাখ টাকা দেব বলেও একটা নৌকা পেলাম না। আমার বড় ভাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাবার দিতে গিয়েছে। কাউকে ম্যানেজ করতে পারিনি। আমাদের চেষ্টার পথগুলো সংকীর্ণ হয়ে আসছে। ইয়া আল্লাহ আমি কী করব, বুঝতে পারছি না। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে... আমার উমার (ছেলের নাম)।’ সিয়ামের ফেসবুকের তথ্য অনুযায়ী, তিনি মিসরের কায়রোতে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি কুমিল্লা।
ফেনীর বাসিন্দা গণমাধ্যমকর্মী কেফায়েত শাকিল পরিবারের সঙ্গে মেসেজের কিছু স্ক্রিনশট যোগ করে তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘মিনিট পরপর মেসেজে বাঁচার আকুতি করছে আমার পরিবার। কী জবাব দেব, জানি না। আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। আমার আব্বু নিজে চলাচল করতে অক্ষম। অলরেডি দোতলায় পানি উঠে গেছে। প্লিজ কেউ বাঁচান। আমাদের বাসা ফেনী শহরের রামপুর লাতুমিয়া সড়কের খান মহল (রাস্তার মাথায় তৃতীয় দোতলা বিল্ডিংটা) হাজী আলাউদ্দিন সাহেবদের বাড়ি থেকে কয়েক বাড়ি পর।’
তিনি আরও লেখেন, ‘আমার নম্বর-০১৮১৭১০৩৬৬৬, আব্বুর নম্বর-০১৮১৭১০৩৬৬৭। কেউ উদ্ধারে যেতে পারলে নক দিয়েন। আপাতত খোঁজ নিতে কল দিয়েন না। আপনার কলের কারণে আমি উদ্ধারের যে চেষ্টা করতাম, সেটাও পারছি না।’ অনেকেই বন্যাসংক্রান্ত নানা পোস্টের কমেন্ট বক্সেও উদ্ধারের জন্য সহযোগিতা কামনা করেছেন।
৭৭৯ জনকে উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস : বন্যাকবলিত এলাকায় আটকাপড়া ৭৭৯ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। তাদের মধ্যে পাঁচজন অন্তঃসত্ত্বা নারী ও ১৯ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা রয়েছেন। গতকাল ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ফেনী থেকে ২৮৭, কুমিল্লা থেকে ১৬৪, চট্টগ্রাম থেকে ১১৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১১২, নোয়াখালী থেকে ১৩, খাগড়াছড়ি থেকে ২৩, চাঁদপুর থেকে ৬, মৌলভীবাজার জেলা ৫০ এবং লক্ষ্মীপুর জেলা থেকে ৯ জনকে উদ্ধার করেন।
এর আগে গতকাল সকালে দেশের বন্যাকবলিত এলাকা ও সেখানকার উদ্ধারকাজ পরিদর্শন করেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন। এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেনেন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল থেকে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি টিম বন্যাদুর্গত এলাকায় উদ্ধারকাজ ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের কাজ করছে।
হেলিকপ্টার দিয়ে বন্যাদুর্গতদের উদ্ধার করল র্যাব : র্যাব সদর দপ্তরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার সহকারী পরিচালক এএসপি আল আমিন বলেন, ফেনীর পশুরাম সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলা ও দুজন নবজাতক শিশুকে উদ্ধার করে অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে সুস্থ করে তাদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়েছে র্যাব। এ ছাড়া নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ বন্যাদুর্গত এলাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা পানিবন্দিদের র্যাব হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করেছে।
বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে পুলিশ : বন্যাকবলিতদের পাশে দাঁড়িয়েছে পুলিশ। বন্যার্তদের সহায়তা দিতে থানা, উপজেলা ও জেলায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা কাজ করছেন। পুলিশ সদর দপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে।
কোস্ট গার্ড : ফেনীতে বন্যার্তদের উদ্ধার ও ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে কোস্ট গার্ড। গতকাল সকালে কোস্ট গার্ড সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে কোস্ট গার্ড। ফেনীর বন্যাকবলিত এলাকায় পানিবন্দিদের উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিচ্ছে বাহিনীর ডুবুরি দল।