মোবাইল নেটওয়ার্ক বিদ্যুৎ বন্ধে উৎকণ্ঠা

‘কদিন ধরে পরিবারের সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ করতে পারছি না। আমার বউ, বাচ্চা, মা সবাই খাবার অভাবে মারা যাইতেছে।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন ফেনীর সিলোনিয়া এলাকার দুবাইপ্রবাসী সাইফুল হাসান।

সাইফুলের মতো এমন বহু মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন, যাদের স্বজনরা ফেনীসহ বন্যাদুর্গত বিভিন্ন এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ আর অনিশ্চতায় দিন কাটাচ্ছেন যোগাযোগবিচ্ছিন্ন দুর্গত এলাকার বহু মানুষ। এর সঙ্গে সেখানে বিদ্যুৎ না থাকায় উদ্বেগ আর আতঙ্কটা উৎকণ্ঠা বেড়ে গেছে বহুগুণে।

বন্যা উপদ্রুত বিভিন্ন জেলার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফেনী। ভারতের সীমান্তঘেঁষা এই জেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক দিন ধরে সেখানে কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কিছু মোবাইল টাওয়ার সচল করা গেলেও গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৬৫৩ টাওয়ারের মধ্যে ৬১৬টি অচল হয়ে পড়ে আছে।

অন্যান্য জেলার অনেক স্থানে বিদ্যুৎ নেই। বেশিরভাগ মোবাইল টাওয়ার বন্ধ থাকার পাশাপাশি বিদ্যুতের অভাবে অনেকেই তাদের মোবাইলে চার্জ দিতে পারছে না। ফলে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে। অনেকে পানিবন্দি হয়ে থাকলেও তাদের উদ্ধারের কথা জানাতে পারছে না। পাশাপাশি বিদ্যুতের অভাবে এই দুর্যোগেও অন্ধকারে রাত কাটাতে হচ্ছে বানভাসি মানুষের।

ফেনীর যেসব মানুষ দেশের অন্যান্য জায়গায় এবং বিদেশে অবস্থান করছেন, তারা জানেন না যে গ্রামে বসবাসরত তাদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের কী অবস্থা। যোগাযোগ করতে না পারায় উৎকণ্ঠা আরও বাড়ছে।

ঢাকায় বসবাসরত একজন সরকারি কর্মকর্তা ফারুক হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রায় তিন দিন ধরে তিনি তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। সবার মোবাইল ফোন বন্ধ। আশপাশে যেসব আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। আবার গ্রামে যাবেন, সেই সুযোগ নেই। কারণ বন্যার পানিতে সব তলিয়ে গেছে। প্রতিদিন চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটছে তার।

১০ জেলায় ১৪২৮ মোবাইল টাওয়ার অচল : বন্যার কারণে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ দেশের ১২ জেলায় প্রায় দুই হাজার মোবাইল টাওয়ার অচল হয়ে পড়েছিল। তবে গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত বেশ কিছু টাওয়ার সচল করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

সংস্থাটি জানিয়েছে, সর্বশেষ বিকেল ৫টা নাগাদ বন্যাকবলিত ১০ জেলায় ১৩ হাজার ৪৯১ টাওয়ারের মধ্যে ১ হাজার ৪২৮টি অচল রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা ফেনী জেলার। সেখানে ৬৫৩ টাওয়ারের মধ্যে ৩৭টি সচল করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৬১৬টি অচল হয়ে পড়ে আছে।

এ ছাড়া নোয়াখালীতে ২২৬, লক্ষ্মীপুরে ৫৬, কুমিল্লায় ৩৪৮, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১০, চট্টগ্রামে ৯১, খাগড়াছড়িতে ৩৬, হবিগঞ্জে ১, মৌলভীবাজারে ৩৬ এবং সিলেটে ৮টি টাওয়ার কাজ করছে না।

মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে বিটিআরসি জেনেছে, বন্যাকবলিত অঞ্চলে অপারেটরদের টাওয়ার এলাকা ডুবে গেছে। এসব টাওয়ারে বিদ্যুৎসংযোগও নেই, অন্যদিকে তুমুল স্রোতে অন্যান্য প্রয়োজনীয় যান্ত্রিক সহযোগিতা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে নেটওয়ার্ক পুনরায় চালু করা যাচ্ছে না। স্রোত না কমা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নেটওয়ার্ক পুনঃসংযোগ করা সম্ভব নয়।

বিটিআরসির কর্মকর্তরা জানান, টাওয়ার সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাটারি ব্যাকআপ, ডিজেল জেনারেটর কিংবা পোর্টেবল জেনারেটরের মাধ্যমে টাওয়ার সচল রাখতে সংস্থাটি মোবাইল অপারেটরদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সিলেট, মৌলভীবাজারসহ যেসব এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, সেই সব এলাকায় নতুন করে মোবাইল নেটওয়ার্ক বিঘ্ন হতে পারে বলে জানিয়েছেন মোবাইল অপারেটরা।

এদিকে বন্যার মধ্যে টেলিযোগাযোগ সেবা সচল রাখতে নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করেছে বিটিআরসি। সংস্থাটি বলছে, এই পরিস্থিতিতে ১৫ জনের ইমার্জেন্সি রেসপন্স দল গঠন করা হয়েছে। যারা দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন।

বিটিআরসির ইমার্জেন্সি রেসপন্স দলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে +৮৮০২২২২২১৭১৫২ নম্বরে ফোন করতে হবে। বিটিআরসির কল সেন্টার ১০০ ব্যবহার করেও ওই দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।

বিদ্যুৎহীন অন্তত ১১ লাখ গ্রাহক : বন্যাকবলিত ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলার অনেক স্থানে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে পানি উঠে বৈদ্যুতিক মিটার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এবং খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানান, বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকায় শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে। প্রতি পরিবারে গড়ে চারজন গ্রাহক বিবেচনায় নিলে প্রায় ৪৪ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে চরম এই দুঃসময়ে। বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে আরও এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়তে পারে। এখন পর্যন্ত আরইবির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (ওঅ্যান্ডএম) আকাশ কুসুম বড়ুয়া বলেন, ‘ফেনীতে ভয়াবহ বন্যার কারণে আমাদের ১৩ সাবস্টশনের সব কটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৫৪৬ গ্রাহক বিদ্যুৎহীন অবস্থায় আছেন।’

নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জিএম মো. জাকির হোসেন বলেন, তার বিতরণ এলাকায় প্রায় আড়াই লাখ গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সমিতির অফিসের ভেতরেও কোমরসমান পানি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা হবে।

একইভাবে বন্যাকবলিত এলাকার জেলার অন্যান্য পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারাও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের কথা জানিয়েছেন।

এদিকে বন্যাদুর্গত বেশিরভাগ এলাকাতেই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুৎ বিতরণ করে। তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সিলেট, কুমিল্লাসহ বেশ কিছু শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। তাদেরও বহু গ্রাহক বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু সেই সংখ্যাটা তুলনামূলক কম। কারণ গ্রামের চেয়ে শহরে বন্যা পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো।

পিডিবির সদস্য (বিতরণ) মো. রেজাউল করিম বলেন, বন্যার কারণে পিডিবির কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার একটি উপকেন্দ্রে পানি উঠেছে। সেখানে ট্রান্সফরমার পানি স্পর্শ করেছে। ঝুঁকি এড়াতে ওই উপকেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে সেখানে কিছু গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে। অন্যান্য উপকেন্দ্র সুরক্ষিত আছে এখন পর্যন্ত।