ত্রাণ আছে ত্রাণ নেই

সরকারের পাশাপাশি বন্যাদুর্গত এলাকায় বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ও বিভিন্ন সংগঠন। দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হলেও অনেক এলাকায় এখনো পৌঁছায়নি বলে খবর পাওয়া গেছে। ফলে এসব অসহায় মানুষ চরম উদ্বেগ, অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।

যদিও সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণকার্যক্রমে জড়িতরা বলছেন, পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণের সাধ্যমতো চেষ্টা চলছে। আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বন্যার পানির কারণে যেসব এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, সেখানে এই সংকট থাকতে পারে। ধীরে ধীরে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুল হাসান গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শুক্রবার পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭৩৯ জন। বন্যাকবলিত সব এলাকায় এখন পর্যন্ত ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা, ২০ হাজার ১৫০ টন চাল, ১৫ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের সব জেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুদ রয়েছে বলে জানানো হয় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। ১১ জেলার ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য মোট ৬৩৭টি মেডিকেল টিম চালু রয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে সার্বক্ষণিক কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। তথ্য ও সহযোগিতার জন্য ০২৫৫১০১১১৫ নম্বর চালু রয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিল : বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে অনুদান প্রদানের আহ্বান জানিয়েছে সরকার। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেসসচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর বাসসকে বলেন, ‘অনেকে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সরকার তাদের এই মহতী আগ্রহকে স্বাগত জানায়।’

তিনি জানান, আগ্রহী ব্যক্তিরা প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে সোনালী ব্যাংকের (হিসাব নম্বর-০১০৭৩৩৩০০৪০৯৩) মাধ্যমে অনুদান দিতে পারবেন।

পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গতকাল বলেছেন, আকস্মিক এ বন্যা মোকাবিলায় সরকার সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করছে। সরকারের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসায় বন্যাকবলিত মানুষকে দ্রুত উদ্ধার করা যাচ্ছে। এ জন্য শিক্ষার্থীসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

এক দিনের বেতন দিল সেনাবাহিনী : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সব পদবির সেনাসদস্যের এক দিনের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ বন্যার্তদের সহযোগিতায় প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হয়েছে। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। এ ছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের লক্ষ্যে আর্থিক সহায়তা দেওয়া যাবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। ঢাকায় ত্রাণসামগ্রী দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনী ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, লজিস্টিকস এরিয়া ও ঢাকা সেনানিবাসে যোগাযোগের নম্বর- ০১৭৬৯-০৫১৮১৯, ০১৭৬৯-০১৩৮৩২, ০১৭৬৯-০১৩৫৩০ ও ০১৭৬৯-০১৩৬০৪। বিস্কুট, চিঁড়া, গুড়, খেজুর, বান ও পাউরুটি, নুডলস, খাবার স্যালাইন, গুঁড়া দুধ, চিনি ও খাবার পানি এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্য হিসেবে দেশলাই ও মোমবাতি প্রাধান্য দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছে আইএসপিআর।

বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণকার্যক্রম : মসজিদগুলোয় বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের জন্য বিশেষ ত্রাণ তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) গণত্রাণ কর্মসূচি নিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ফেসবুক পোস্টে জানান, গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৩৯ লাখ টাকা ত্রাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।

পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণ কার্যক্রম চলছে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্গতদের সাহায্যে হাত বাড়িয়েছে।

দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের এক দিনের বেতনের সমমানের অর্থ প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

অলাভজনক, অরাজনৈতিক ও মানবকল্যাণে নিবেদিত শিক্ষা, দাওয়াহ ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ বিতরণের কাজ শুরু হয়েছে। গতকাল ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান এই ত্রাণ কার্যক্রম দেখতে গিয়ে সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ।

প্রতিষ্ঠানটি গতকাল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ৭০০ টন ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করেছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,  প্রথম ধাপে ২০ হাজার পরিবারের প্রতিটিকে ২ কেজি খেজুর, ২ কেজি চিঁড়া, ১ কেজি লবণ, ১ কেজি চিনি, বানরুটি, কেক, বোতলজাত পানি, মোমবাতি ও দেশলাই দেওয়া হচ্ছে।

দ্বিতীয় ধাপে ৪০ হাজার পরিবারের প্রতিটিকে ১০ কেজি চাল, ২ লিটার তেল, ২ কেজি ডাল, ১ কেজি লবণ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ৪ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য টিন ও নগদ টাকা দেবে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন।

বিজিবি, র‌্যাব ও কোস্ট গার্ডের ত্রাণ বিতরণ : প্লাবিত হওয়া ৫২০ জন বন্যার্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ করেছে বিজিবি। এ ছাড়া ১১৪ বন্যার্ত পরিবারের অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধসামগ্রী দেওয়া হয়েছে।

ফেনীর বন্যাকবলিত এলাকায় পানিবন্দিদের উদ্ধার ও সার্বিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছে কোস্ট গার্ড। এ ছাড়া পানিবন্দিদের উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিচ্ছে কোস্ট গার্ডের ডুবুরি দল।

হেলিকপ্টার দিয়ে বন্যাদুর্গতদের উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণ করছে পুলিশের এলিট ফোর্স র‌্যাব। র‌্যাব সদর দপ্তরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার সহকারী পরিচালক এএসপি আল আমিন বলেন, র‌্যাব ফোর্সেসের পক্ষ থেকে পাঁচ শতাধিক বন্যার্তদের শুকনো খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করা হয়। ত্রাণ বিতরণ ও চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি দুর্গতদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর কাজ করছে তারা।

বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ না পৌঁছানোর অভিযোগ : স্ত্রী ও এক কন্যাশিশু নিয়ে দুদিন ধরে ভাত না খেয়ে থাকার কথা জানিয়েছেন কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বাংগড্ডা ইউনিয়নের নিমুড়ি গ্রামের সরকারি উদ্যোগে তৈরি গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ গালিব (২৮)।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বুধবার রাতে খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ি। হঠাৎ ঘরে পানি ঢুকতে শুরু করে। তড়িঘড়ি করে পরিবার নিয়ে স্থানীয় একটি মাদ্রাসা ভবনে আশ্রয় নিই। ৪৮ ঘণ্টা ভাত কী জিনিস চোখে দেখিনি। কোমরসমান পানি ভেঙে এক কিলোমিটার দূরে বাংগড্ডা বাজারে গিয়ে শুকনো রুটি এনে খেয়েছি। সরকারি-বেসরকারি কোনো ত্রাণ পাইনি।’ একই অভিযোগ গ্রামটির একাধিক বাসিন্দার।

উপজেলা সীমান্তবর্তী গ্রামের নাম চান্দেরবাগ। যেখানে ২৩০-২৫০ লোকের বসবাস। গ্রামের লোকজন আশপাশে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র না পেয়ে পাশের গ্রামের মসজিদে অবস্থান করছে। আর কিছু লোক বিভিন্ন বাড়ির ছাদে রয়েছে। তারা কেউই সরকারি কোনো সহায়তা এখনো পায়নি।

নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া আক্তার লাকি বলেন, ‘খবরটি মাত্র শুনেছি। দ্রুত সম্ভব চেষ্টা করব ত্রাণ দেওয়ার জন্য।’

কুমিল্লার লাকসাম, মনোহরগঞ্জ ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলার প্রায় সব গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা সরকারিভাবে তেমন কোনো ত্রাণসামগ্রী পায়নি বলে জানিয়েছে। এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক খন্দকার মু. মুশফিকুর রহমানের মোবাইলে ফোন করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মহিষমারা উচ্চবিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মানুষ আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে সেখানে কেউই খাবার ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে যায়নি। যে কারণে ২০ জনের বেশি শিশু ও ১০ জনের বেশি বৃদ্ধকে নিয়ে বিপাকে পড়েছে আশ্রয়গ্রহণকারীরা।

গতকাল সকাল ১০টার দিকে ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রশিদ আহমেদ বলেন, ‘খাবার না থাকার বিষয়টি আমরা আমাদের স্বেচ্ছাসেবীদের জানিয়েছি। কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত, তারাও বিপদে আছে।’

চট্টগ্রামের হাটহাজারীর উপজেলার ১৪ ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৫ টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা। সরকারিভাবে বরাদ্দ খাদ্যশস্য ইতিমধ্যে বন্যাকবলিত ইউনিয়নগুলোর দুর্গতদের মধ্য বিতরণের জন্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম মশিউজ্জামান জানান, জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া ত্রাণসামগ্রী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রয়োজনে আরও বরাদ্দ পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত ৩ লাখ মানুষ। গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে মোবাইল ফোনে কথা হয় স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে। তারা জানান, তীব্র স্রোতের কারণে বেশিরভাগ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারছে না। ঘরের চালে আশ্রয় নেওয়া মানুষ খাবার-পানির অভাবে হাহাকার করছে। প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীদের পক্ষ থেকে উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণ করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।

রাঙ্গামাটিতে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঘাইছড়ি। সেখানে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খাবার সরবরাহ করা হলেও যারা নিজেদের বাড়িতে পানিবন্দি হয়ে আছে, তারা ত্রাণ পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাঘাইছড়ি পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাইন উদ্দিন বলেন, ‘বাসার খাট পর্যন্ত পানি উঠেছে, আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া হয়নি। যারা আশ্রয়কেন্দ্র গেছে, তারা ত্রাণ পেলেও আমরা বাড়িঘরে থাকায় কিছুই পাইনি এখনো। খেয়ে না খেয়ে আমাদের দিন চালাতে হচ্ছে।’

একই এলাকার বাসিন্দা জালাল মিয়া বলেন, যারা বাড়িঘরে ছিল, তাদের কাউকে ত্রাণ দেওয়া হয়নি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিরিন আক্তার বলেন, বন্যার্তদের জন্য ২৫ টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার মজুদ আছে। সবাই ত্রাণ পাবেন।

প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন আঞ্চলিক সংবাদদাতা (কুমিল্লা), রাঙ্গামাটি, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম), সীতাকুন্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি