বিএনপি নেতা সালাউদ্দিনের বর্ণনা

কবরের মতো নির্জন আয়নাঘরে প্রবেশ করত বিচ্ছু

‘আয়নাঘরে একটা কবরের মতো নির্জন কক্ষে আমাকে রাখা হয়েছিল। যে কক্ষে বিচ্ছুরা প্রবেশ করত। কক্ষে কোনো রকম একটা ছিদ্র ছিল, যেখানে মল-মূত্র করতে হতো। আমাকে লোহার দরজার নিচ দিয়ে খাবার দেওয়া হতো। প্রতিমুহূর্তে গুনেছি মৃত্যুর প্রহর। এভাবে কেটেছে ভয়ানক ৬১ দিন...।’

৯ বছর পর ভারত থেকে দেশে ফিরেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরা থেকে তিনি নিখোঁজ হন। এরপর তাকে রাখা হয় আয়নাঘরে। সেখানে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা না হলেও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। নানাভাবে চেষ্টা করা হয় বিভিন্ন দাবি মানাতে। কিন্তু নিজ অবস্থানে অনড় থাকেন সালাহউদ্দিন। এরপর তাকে সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখানে মানুষিক রোগের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল। দেশে ফিরতে বারবার আকুতি জানালেও আইনের মারপ্যাঁচে আটকে যান। গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১১ আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন তিনি।

সম্প্রতি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে ভয়ংকর সেই দিনগুলোর দুঃসহ স্মৃতিচারণা করেন তিনি। সেই সঙ্গে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান ও অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারসহ নানা বিষয়ে আলাপ হয়। যদিও বেশ কিছু বিষয়ে এখনই আলাপ করতে চান না তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাত সাড়ে ৯টা-১০টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদাপোশাকে এবং অস্ত্রধারীরা উত্তরায় এক বন্ধুর বাসা থেকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে আমাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর আমাকে একটি গোপন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। জায়গাটি ছিল কবরের মতো, একটি কামরা। আমার মনে হয়েছিল এটি কোনো বাড়ির নিচতলা হবে। কামরাটির আয়তন হবে ৫ ফিট বাই ১০ ফিট। টয়লেটের জন্য জায়গাটাতে কোনো রকম একটা ছিদ্র ছিল, সঙ্গে একটা পানির ট্যাপ। আমাকে লোহার দরজার নিচ দিয়ে খাবার দেওয়া হতো। কামরাটির বাইরে একটি স্ট্যান্ডফ্যান চালু থাকত এবং ছাদের সঙ্গে হাই পাওয়ার লাইট ছিল।

তিনি বলেন, এ ঘরটিতে আমাকে ৬১ দিন রাখা হয়; যার মধ্যে কক্ষটা পরিষ্কার করার জন্য মাত্র এক দিন কিছু সময়ের জন্য বাইরে বের করা হয়েছিল, বাকি দিনগুলো কবরের মতো একটা কক্ষে একাকী কাটাতে হয়েছে। দরজায় শব্দ করলে তারা আসত এবং আমার কথা শুনে বাইরে থেকে চলে যেত। কারও মুখ দেখার সুযোগ ছিল না। ভীষণ ইচ্ছে হতো প্রিয় মানুষগুলোকে দেখতে, দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে কিন্তু সুযোগ ছিল না। একাকী নির্জন একটা কক্ষে দিনের পর দিন আমি মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম। শেখ হাসিনার সরকার একটি নয়, অনেকগুলো আয়নাঘর বানিয়েছিল, যার মধ্যে একটিতে আমাকে বন্দি রাখা হয়েছিল।

চাপ দিয়ে কোনো দাবি মানানোর চেষ্টা হয়েছিল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমাকে প্রায়ই চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। নানা প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু আমি তা মানতে রাজি হইনি। তবে এই সময়ে তারা আমাকে শারীরিকভাবে আঘাত করেনি, ভালো আচরণ করেছে এবং নিয়মিত ওষুধপত্র সরবরাহ করেছে।

যেভাবে সীমান্ত দিয়ে ভারত নেওয়া হয় সেই অভিজ্ঞতার কথাও দেশ রূপান্তরকে জানান সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, চোখে কালো কাপড় বেঁধে, হাতে হাতকড়া লাগিয়ে একটা গাড়িতে তোলা হয় এবং ছয়-সাত ঘণ্টা কিংবা তার বেশি ঘোরানো হয়। এরপর একটা জায়গায় গাড়ি থামিয়ে দেয় তারা এবং সেখানে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষামাণ ছিল। সম্ভবত তারা সময়ক্ষেপণ করছিল এবং রাতের অপেক্ষায় ছিল। যেহেতু চোখ বন্ধ ছিল তাই আমি তখন কোন জায়গায় ছিলাম তা বোঝার সুযোগ ছিল না। একপর্যায়ে তারা আমাকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল এবং আবার গাড়ি চালিয়ে একটা জায়গায় গিয়ে থামল। সম্ভবত সেটা সীমান্ত এলাকা ছিল। এরপর সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আরেকটি গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তখনো সূর্য ওঠেনি আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘ইউ আর ফ্রি নাও।’

তবে দেশ থেকে বিদেশি সীমান্তে ঢুকতে অন্য দেশের ভূমিকা ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

তিনি বলেন, এরপর আমার সামনে দিয়ে একটা সাদা রঙের মাইক্রোবাস চলে যায়। যে জায়গায় আমাকে নামিয়ে ছেড়ে দিয়ে যায়, তার নাম ছিল গলফ লিংক, শ্রিলং। আমি কোনো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। একপর্যায়ে আমি পরিচয় দিয়ে সকালে ভ্রমণকারীদের কাছে পুলিশে খবর দেওয়ার অনুরোধ জানাই। এরপর পুলিশ এসে আমাকে হেফাজতে নেয় এবং আমার কথাবার্তা শুনে বিপর্যস্ত মনে করে একটা মেন্টাল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে পাগলের ওষুধও খাওয়ানো হয়। এরপর নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ৯টি বছর পার করেছি। এই ৯ বছর আমাকে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তা বলে বোঝানো যাবে না, কেবল একজন ভুক্তভোগীই তা উপলব্ধি করতে পারবেন।

সংবিধান সংস্কার করতে একটি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ ১৫ বছরে দেশ শাসন করতে গিয়ে সংবিধানকে নানাভাবে পরিবর্তন করে নিজেদের গঠনতন্ত্রে পরিণত করেছে। একটা কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে সাংবিধানিক সংস্কার প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক দেশে জাতীয় সংসদ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা থাকলেও আওয়ামী লীগ সংসদ অকার্যকর করে গণভবনকে সবকিছুর কেন্দ্রে পরিণত করেছে। ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়ে ফেরাউন সরকারকে পতন ঘটিয়েছে। ফলে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে এই পরিবর্তন প্রয়োজন। এমন একটা আইন করা প্রয়োজন যেন পরপর দুইবারের বেশি সময় কেউ প্রধানমন্ত্রী না হতে পারেন। ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগ সংস্কার করতে হবে। দলীয়করণের ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, এমনকি গণমাধ্যমের ওপরও সরকারের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল। এমন একটা আইন করা দরকার যেন কোনো সরকার চাইলেই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করতে না পারে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার গঠন হয়েছে তাকে বিএনপি কত দিন সময় দেবে নির্বাচন আয়োজনের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কাজ হচ্ছে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা। যেহেতু একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারের পতন হয়েছে, অনেকেই মনে করছেন এই সরকার তিন মাসের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করতে পারবে না। কেননা প্রশাসনে এখনো দানব সরকারের লোকজন বসে আছে। তা ছাড়া আরও কিছু জায়গায় সংস্কার না করলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন সম্ভব নয়। ফলে আমরা মনে করি, এই সরকারকে আরও তিন মাস, অর্থাৎ ছয় মাস দেওয়া যেতে পারে। এই সরকারের উচিত একটা রোডম্যাপ প্রণয়ন করে জাতিকে জানান দেওয়া তারা কত দিনের মধ্যে কীভাবে নির্বাচন দিতে পারবেন।

সাংবিধানিক সংস্কার ও অন্যান্য বড় সংস্কারের জন্য গণতান্ত্রিক সরকারের প্রয়োজনীয় কথা জানান সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার কিছু সংস্কার রাষ্ট্রের প্রয়োজনে করবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করবে। এরপর যে বৃহৎ সংস্কারের প্রয়োজন তা মূলত করবে রাজনৈতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এবং নির্বাচনী ইশতেহারে এই বিষয়গুলো রাখতে হবে। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো সরকার দানবে পরিণত হতে না পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

গ্লোবাল ও রিজিওনাল জিও পলিটিকসে বাংলাদেশের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য। তিনি বলেন, জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া যে সরকার দেশ শাসন করে তারা বিদেশি শক্তির কাছে নতজানু থাকে। আওয়ামী লীগ সরকার জনগণ ও দেশের কথা চিন্তা করেনি। আগামীতে জনগণের ভোটে যারা নির্বাচিত হয়ে দেশ শাসন করবেন, তারা কেবল দেশের স্বার্থ দেখবেন। বৈশি^ক এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো নানা স্বার্থে বিভক্ত। ফলে আমাদের মাথায় রাখতে হবে আমরা যেন তাদের স্বার্থে স্যান্ডউইচে পরিণত না হই। আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থেকে কেবল দেশের স্বার্থ দেখে দেশ শাসন করব।