সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল যেন আলাদীনের চেরাগ। বিল ভাউচার অনিয়মে হরিলুট করা হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এসব লুটের মূল কারিগর হাসপাতালে স্টোরকিপার সুলেমান ও হিসাবরক্ষক ছমিরুল ইসলাম। তারা দু’জনে মিলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সহযোগিতায় জিনিসপত্র ও ঔষধের নামে ভুয়া বিল ভাউচার করে এসব টাকা হাতিয়ে নেন।
তবে বিপত্তি বাধে হাসপাতালের নতুন উপ-পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব নেওয়ার পর। আগের মতো ভুয়া বিল ভাউচার নিয়ে গেলে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হওয়ায় তিনি বিল উত্তোলনের জন্য স্বাক্ষর দেননি। আর এ কারণেই মূলত দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানকে অন্যত্র বদলির জন্য তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন বরাবর ডিও দেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নোমান বখত পলিন। এছাড়াও অপরিচিত ফোন নম্বর থেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানকে।
জানা যায়, যে সকল যন্ত্রপাতি কিনতে ভুয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে হরিলুট করা হয়েছে সেগুলো ২০১৮ সালেই কেনা হয়েছে। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব মেশিনের জন্য রাসায়নিক দ্রব্য ক্রয় দেখিয়ে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বিল তোলা হয়। হাসপাতালের ১৯টি কম্পিউটারের ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতি ক্রয় ও মেরামত দেখিয়ে প্রায় ২৪ লাখ; অনুষ্ঠান, উৎসব, সভা-সেমিনারের ব্যয় ২৪ লাখ, আপ্যায়ন ২১ লাখ, পাপোস কেনায় ১৪ লাখ, সিল ও স্ট্যাম্প প্যাড কেনায় ১১ লাখ টাকার বিল তোলা হয়েছে। কেবল ২০২২-২০২৩ অর্থবছরেই আনুমানিক ১৫ কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে।
হাসপাতালে কেনাকাটাসহ ৩২টি খাতে অর্থ ব্যয়ে ১৮ কোটি টাকার অডিট আপত্তি পড়েছে। এই সকল অর্থ ছাড়ের সময় হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মো. আনিসুর রহমান। বর্তমানে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত হাসপাতালের স্টোরকিপার সুলেমান আহমদ, হিসাবরক্ষক মো. ছমিরুল ইসলাম ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মো. আনিসুর রহমান জড়িত। সুলেমান ও ছমিরুলকে হাসপাতাল থেকে বদলি করা হলেও মো. আনিসুর রহমান তার ক্ষমতা বলে আদেশের মাধ্যমে আবার তাদের এখানে বহাল করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত সময়ে ঔষধ, যন্ত্রপাতি, কেমিক্যাল ও লিলেনসামগ্রী ক্রয়ে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়নি। এতে ৪টি কেনাকাটায় সরকারের দুই কোটি ৫৬ লাখ ৯১ হাজার ৯৬৯ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইউসিএল) থেকে ঔষধ না কেনায় সরকারের ৪৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। কম্পিউটারের ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ, সিল ও স্ট্যাম্প প্যাড ক্রয়, সভা-সেমিনার, অনুষ্ঠান আয়োজন ও আপ্যায়ন বাবদ ৮১ লাখ ৪ হাজার ২১৯ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। প্রয়োজন না থাকা সত্বেও ২২ লাখ টাকার সার্জিকেল সামগ্রী ক্রয় করা হয়েছে। পর্যাপ্ত আউটসোর্সিং জনবল থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া শ্রমিকদের মজুরি দেখিয়ে ৮১ লাখ ৭০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।
এছাড়াও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে অধিকহারে ইউসিএল বহির্ভূত ওষুধ ক্রয় দেখিয়ে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, আসবাবপত্র ও সরঞ্জামাদি সরবরাহ না করে ঠিকাদারকে ১৫ লাখ ২৯ হাজার ৭৫০ টাকা বিল প্রদান, মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন ও ব্যয় মঞ্জুরি ব্যতীত ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ১২৭ টাকা বকেয়া বিল প্রদান, চাহিদা ছাড়া প্রায় ৪৩ লাখ টাকায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত লিলেন সামগ্রী ক্রয়, বর্জ্য সংরক্ষণাগার ও অফিস সরঞ্জাম মেরামত না করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১৩ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। এদিকে হাসপাতালের কেবিনে ভর্তিকৃত রোগীর কেবিন ভাড়া থেকে প্রাপ্ত প্রায় ২১ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি।
হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অফিসিয়াল প্রয়োজনে এ সময়ে তিন হাজার ৭২০ টি সিল ও স্ট্যাম্প ক্রয় করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ১১ লাখ ৫০হাজার হাজার টাকা। সুনামগঞ্জ শহরের শফিক আর্ট, শ্যামল ফটোস্ট্যাট ও পিনাক আর্ট’র নামে বিল ভাউচার করা হয়। এছাড়া মেসার্স সামিহা এন্টারপ্রাইজ নামে সুনামগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৬৭ লাখ টাকার বিল দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মনিহার, অফিস সরঞ্জাম ও অন্যান্যসামগ্রী ক্রয় বাবদ ২২ লাখ ৯১ হাজার, অফিস আসবাব ও সরঞ্জাম ১৫ লাখ ২৯ হাজার টাকা, অনাবাসিক ভবনের বর্জ্য সংরক্ষণাগার ও অফিস সরঞ্জাম মেরামত ১৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকা, আসবাবপত্র মেরামত বাবদ ১৫ লাখ টাকার বিল প্রদান করা হয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নেওয়া হলে তারা এসব সরবরাহ করেনি বলে জানান দেশ রূপান্তরকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেশ রূপান্তরকে জানান, এই প্রতিষ্ঠান মূলত স্টোর কিপার সুলেমান আহমদ ও হিসাবরক্ষক মো. ছমিরুল ইসলামের। তারা আড়ালে থেকে এই প্রতিষ্ঠানের নামে বিল নিতেন। শহরের মেসার্স জননী ক্লথ স্টোর, মেসার্স রায় ট্রেডার্স ও মেসার্স অনিক ট্রেডার্স নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার্য দ্রব্যাদি ক্রয়ের নামে প্রায় ২০ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু পাপোসই আছে ১২ লাখ টাকার।
অভিযুক্ত সুলেমান মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার সঙ্গে উনার দেখা হয়নি এমনকি কিছুই বলিনি। উনি যদি থানায় অভিযোগ দিয়ে থাকেন তা হলে এগুলো মিথ্যা। উনার সঙ্গে আমাদের কোনো হিসাব নেই। আমরা কোনো কাগজপত্র নিয়ে যাইনি উনার কাছে। উল্টো উনি ডায়ালাইসিসের মালামাল ক্রয় করে ঠিকাদারের টাকা আটকে দিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নোমান বখত পলিন কথা বলতে রাজি হননি। এছাড়া অভিযুক্ত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মো. আনিসুর রহমানকে ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক (উপ-পরিচালক) মোহাম্মদ. মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তকে বলেন, সুলেমান ও ছমিরুলই সুনামগঞ্জের এক আওয়ামী লীগ নেতার ছত্রছায়ায় এ সব অপকর্ম করেছে। মূলত এরাই সব অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। আমাকেও তারা নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি দিচ্ছে। আমি প্রশাসন ও পুলিশকে সব অবহিত করেছি। নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়রি করেছি।