দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয় বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট এ বন্যার পানি যত কমছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। আকস্মিক বন্যায় পানির স্রোতে ভেঙে গেছে ঘড়বাড়ি ও সড়ক। অনেক সড়ক এখনো পানির নিচে। বাড়িঘরও আছে তলিয়ে। দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। ত্রাণও পৌঁছেনি অনেকের ঘরে। পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে এসব এলাকার লাখো মানুষ।
স্মরণকালের ভয়াবহ এ বন্যায় পানিবন্দি এলাকায় শিশুখাদ্য, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও খাদ্যসংকট তীব্র হচ্ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক সেবা এখনো অনেকাংশে বন্ধ। সরকারি উদ্যোগে ত্রাণ সহায়তাও খুবই অপ্রতুল। ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগে সংগ্রহ করা ত্রাণ যেভাবে বণ্টন হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হচ্ছে না।
এমন পরিস্থিতিতে বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে নিত্যপণ্যের চড়া দাম। বন্যাকবলিত এলাকায় চাল, ডাল, চিঁড়া, মোমবাতিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। শুধু তা-ই নয়, সংকটকে পুঁজি করে একশ্রেণির মানুষ নেমেছে ত্রাণের নামে ‘ভিউ ব্যবসায়’ (ত্রাণ বিতরণের দৃশ্য ইন্টারনেটে আপলোড)। এতে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোয় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
এবারের আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফেনীসহ আশপাশের এলাকা। ৫০ বছরেও এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি এই জেলার বাসিন্দাদের।
দেশ রূপান্তরের ফেনী প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, দুই দিনের তুলনায় ফেনীর বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির পথে। জেলার পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও সদর উপজেলার বন্যায় প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে জেলার নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা এখনো পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। ফলে এখনো বিপুল পরিমাণ শুকনা খাবার ও শিশুখাদ্যের প্রয়োজন। এ অবস্থায় বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের জন্য অনেক ব্যক্তি ও সংস্থা শুকনো খাবার কিনছে। আর এ সুযোগে সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চাহিদার তুলনায় জোগান কমের কারণে নয়; বরং বন্যার সুযোগে উৎপাদন ও সরবরাহকারী পর্যায়েই দাম বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ ক্রেতা-বিক্রেতাদের।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ফেনীর বন্যাকবলিত শহরগুলোতে ১০ টাকার মোমবাতি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়, প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার ১৩০০ টাকা হলেও এখন ২৫০০-২৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বন্যার আগে যে চিঁড়ার বস্তা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হতো তা এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। মুড়ি আগে পাইকারি মূল্যে কেজি ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকায়। আর ৯০-১০০ টাকা কেজি দরের গুড় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ফেনী কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. কাউছার বলেন, ‘আমরা আগেই আশঙ্কা করেছিলাম নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের মনিটরিং চলছে। যাতায়াত খরচ বেড়ে যাওয়ায় দাম কিছুটা বেড়েছে। আমরা পাইকারি বাজারে ব্যবসায়ীদের বলছি, দাম সহনশীল রাখতে, যাতে সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায়।’
ফেনীতে বন্যা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাওয়া একাধিক টিম ত্রাণের নামে ভিউ ব্যবসা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফেনীর ৬ উপজেলার প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে থাকলেও ১০ লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি। তারা নিজ বাড়ির ছাদে কিংবা মাচা বানিয়ে অবস্থান করছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করা অনেকে নিজ উদ্যোগেই খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য জোগাড় করছে। এর মধ্যে কোনো কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে সামাজিক সংগঠন ফটোসেশন ছাড়া খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করলে তা সাদরে গ্রহণ করছে বানভাসিরা। তবে অনেক এলাকায় ত্রাণসহায়তার নামে ফটোসেশন করা হচ্ছে। এতে খুবই বিব্রত বানভাসিরা।
ফেনী ফালাহিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের আজিজ উল্লাহ নামে একজন অভিযোগ করেন, সামান্য খাদ্যসামগ্রী দিয়ে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে আত্মীয়স্বজনের কাছে তারা হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছেন। তাই ফটোসেশন এড়িয়ে নিরবচ্ছিন্ন ত্রাণ সরবরাহের অনুরোধ জানান তিনি।
গোমতী নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ওপরে থাকায় কুমিল্লার কয়েকটি উপজেলায় প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। লোকালয়ে হু হু করে ঢুকছে পানি। এতে দিশাহারা হয়ে ঘরবাড়ি ফেলে প্রাণে বাঁচতে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে। বন্যার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অধিকাংশ স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কুমিল্লা অংশে প্রায় ৯০ কিলোমিটার এলাকায় গতকাল তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী খান মো. ওয়ালিউজ্জামান বলেন, ‘গোমতীর বাঁধ ভাঙার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাঁধ ভেজা। পানি কমছে, তবে নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হচ্ছে। উজানের পানি বন্ধ হলে এবং আর বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের বুড়বুড়িয়া এলাকার নদীভাঙনের অংশটি বিস্তৃত হচ্ছে। পানির স্রোত অবিরত প্রবাহের ফলে ভাঙন প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে ২০০ ফুটের মতো প্রসারিত হয়েছে ওই অংশ।’
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া ত্রাণের বিস্কুট ও কলা শিশুদের খাওয়ানো যাচ্ছে না। অভুক্ত শিশুদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো।
চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুরে অবনতি : টানা ভারী বর্ষণ ও মেঘনার অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লক্ষ্মীপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলার ৫ উপজেলার ৮ লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। চারদিকে এখন বানভাসি মানুষের হাহাকার। এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে ত্রাণ ও সুপেয় পানির সংকট। দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যায় সর্বপ্রথম প্লাবিত হয় লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার ৪০টি এলাকা। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য উপজেলা প্লাবিত হতে শুরু করে। দুদিন ধরে ফেনী ও নোয়াখালীর বন্যার পানি রহমতখালী ও ডাকাতিয়া খাল হয়ে লক্ষ্মীপুরে ঢুকে পড়ছে। এতে পাঁচটি উপজেলা এবং চারটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও চার থেকে ছয় ফুট পানিতে ডুবে রয়েছে।
উজানের পানি নেমে দুদিনে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে পাঁচ শতাধিক পরিবার।
পানি উন্নয়ন বোর্ড গতকাল জানায়, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় পূর্বাঞ্চলীয় কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনী জেলা ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং ত্রিপুরা প্রদেশের অভ্যন্তরীণ অববাহিকাগুলোয় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। উজানের নদ-নদীর পানি কমা অব্যাহত রয়েছে। এতে করে বর্তমানে ফেনী ও কুমিল্লার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের নদীগুলোর পানি সমতল বিপদসীমার নিচে নেমে এসেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের গতকালের তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জের মনু, খোয়াই ও ধলাই নদীর পানি সমতলে হ্রাস পেতে পারে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে গত এক সপ্তাহে বন্যায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ জন। আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ লাখ ১ হাজার ২০৪ জনে। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুল হাসান। তিনি বলেন, পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৩ হাজার ৮৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৩ জন মানুষ এবং ২৮ হাজার ৯০৭টি গবাদি পশুকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।
ত্রাণের সংকট নেই, অভাব সমন্বয়ের : বন্যাদুর্গতরা সবচেয়ে বেশি অভাবে রয়েছেন সুপেয় পানি ও খাবারের। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক ত্রাণ নিয়ে দুর্গত এলাকায় গেলেও সেসবের সুষম বণ্টন নিয়ে রয়েছে অভিযোগ ও অসন্তোষ। রয়েছে সমন্বয়হীনতার তথ্য। ফেনীর সোনাগাজী প্রতিনিধি জানান, সোনাগাজীতে প্রবেশের তিনটি সড়ক পথে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প পথে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পাড়ি দিয়ে সোনাগাজীতে প্রবেশ করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বিভিন্ন মানবিক সংস্থা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের তিন শতাধিক ত্রাণবাহী গাড়ি। স্থানীয়দের সহায়তায় উপজেলার দুর্গত এলাকায় বিতরণ করা হচ্ছে ত্রাণসামগ্রী। তবে ত্রাণ বিতরণে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করেছেন দুর্গত এলাকার মানুষ। সমন্বয়হীনতার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।
উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের মানুমিয়ার বাজার এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘সবাই ত্রাণসামগ্রী নিয়ে মূল সড়কের পাশে বিতরণ করছে। যে এলাকা পানিতে তলিয়ে রয়েছে, সেখানে কেউ যায়নি। চার দিন ধরে আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পাশের বাড়ির দোতলায় অবস্থান করছি। শুধু আমি না, আমাদের সঙ্গে আরও ১৮ পরিবার অবস্থান করছে। বাড়ির মালিক প্রথম দিন আমাদের খাইয়েছে, পরে আমাদের খাওয়ানোর মতো তাদের কাছে কিছুই ছিল না। এত দিন পানি ও মুড়ি খেয়ে জীবন পার করেছি।’
সরকারি ত্রাণ সহায়তার বিষয়ে খবর নিতে সোনাগাজী উপজেলা প্রশাসন কার্যালয়ে গিয়ে পাওয়া যায়নি ইউএনওসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাউকে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কক্ষে দেখা মেলে অফিস সহকারীর। তিনি বলেন, সরকারি সহায়তার পরিমাণ সামান্য। চার দিনে দুর্গত মানুষের মধ্যে ২৫০ কেজি চিড়া, মুড়ি ৯০০ কেজি, গুড় ৩০ কেজি, চিনি ৭৫ কেজি, বিস্কুট ২১০ কেজি এবং শুকনা খাবার ৭০ কেজি বিতরণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিরা।