পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসতে পারিনি, এখন কিছুই তো নাই। সব পানি নিয়ে গেছে। কেবল আমরাই বেঁচে আসছি। কী কইমু, আমি তো একেবারে নিঃস্ব হইয়া গেছি। ঘর, জিনিসপত্র সব ভাসাইয়া নিছে পানি। ঘরে যা ছিল তা টানা ৫ দিনের পানিতে পচে গেছে। পানিতো কমে গেছে, কিন্তু আমার যে ক্ষতি অইল, তা তো কোনোভাবে পুষাবে না। এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করছিলেন ভয়াবহ বন্যায় সহায়-সম্বল হারানো ফেনীর সোনাগাজীর বগাদানা ইউনিয়নের আলামপুর গ্রামের বাসিন্দা হাসিনা আক্তার।
মঙ্গলবার সোনাগাজীর কয়েকটি সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘরবাড়ি, স্থাপনা বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে আছে। আবার কিছু ঘরের চাল উড়ে গেছে। কিছু ঘরের টিন থাকলেও চারপাশের বেড়া- মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে। পুকুর-মাছের ঘের জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বের হয়ে গেছে চাষের মাছ। মরে গেছে খয়েকমত খামারের মুরগি। চর চান্দিয়ার চরের বাসিন্দারা বিশুদ্ধ খাবার পানি নিয়ে বড় সংকটে পড়েছেন। অনেক টিউবওয়েলই জোয়ারের পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে।
বন্যার পানি নামার খবরে যেমনি আনন্দিত তেমনি আশ্রয়ণ থেকে ঘরে ফিরে গিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি দেখে আঁতকে উঠছেন অনেকে। ভয়াবহ বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে রাস্তা-ঘাট। ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, গবাদিপশু ও পুকুরের মাছ। কারও ঘর নেই, কারও রান্না করার চুলা নেই। এক বেলা খাবে, সে পরিস্থিতিও নেই অনেকের। আবার কারও ঘর জিনিসপত্র জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে। প্রায় পরিবারেরই হাঁস-মুরগি মারা গেছে। ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে গ্রামের মেঠো পথ। এর ফলে মানুষের স্বাভাবিকভাবে চলাচলেও বাধা তৈরি হয়েছে।
দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অনেকেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। আর বর্ণনা দেন তাদের ক্ষয়ক্ষতির কথা।
ফুলগাজী ইউনিয়নের জিএম হাট গ্রামের কৃষক আবু মিয়া বলেন, প্রথম বন্যায় ঘরের ভেতরে দুই ফুট উচ্চতায় পানি ছিল। বারান্দা থেকে নামতে না নামতেই দ্বিতীয় বন্যার পানি ঘরে প্রবেশ করেছে। এখন তৃতীয় দফা বন্যায় সব শেষ করে দিল।
তিনি বলেন, পরিবারের সবাইকে নিয়ে পানিবন্দি দিন পার করেছি। পরে উদ্ধারকর্মীরা আশ্রয়ণে নিয়ে আসে। পানি নামার খবরে বাড়ি গিয়ে দেখি পানির প্রবল ঢেউয়ে বাড়ির পেছনের মাটির দেয়াল ভেঙে গেছে। ধানের জমিতে এখনো দুই ফুট পানি। নিজের সব সহায়-সম্বল হারিয়ে প্রায় পথে বসে যাচ্ছি। কী করে এই অবস্থা থেকে আবার ঘুরে দাঁড়াবো, বুঝতে পারছি না। নিজেকেই নিজের কাছে অসহায় মনে হয়।
পরশুরামের বক্স মাহমুদ ইউনিয়নে সাতকুচিয়া গ্রামের কালু সাহা বলেন, দাদারে আঁই কিয়া খামু, আঙ্গো কিছু নাই সব শেষ। আঙ্গো ঘরের তুলি সহ ডুবে গেছে। ঘরের বেগ্গান নষ্ট অঁই গেছে। পরশুরাম বাজারের বিসমিল্লাহ ফিসারী রফিক চৌধুরী জানান, পরশুরাম উপজেলা আমার ৬০ টি পুকুর ছিল একটি পুকুরও বাদ নেই। বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। ৫ কোটি বেশি ক্ষতি হয়েছে।
মির্জানগর ইউনিয়নে মধুগ্রামে রুবেল জানান, শেষ সম্বল সিএনজি ছিল এটাও ডুবে গেছে এখন নষ্ট, কেমনে ঠিক করমু আল্লাহ জানে। এখনো গাড়ির কিস্তি শেষ হয়নি। চিন্তায় ঘুম নেই। ছেলে মেয়ে মা বাবা সহ ৭ জন। কেমনে চলমু, কেমনে খামু বুঝিয়ের না।
সরেজমিন চর সাহাভিকারী গ্রামের আল মামুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিন কক্ষের ছোট টিনশেড ঘর। ফুটো চাল। কাঠের জানালা ভেঙে পড়েছে। ঘরের ভেতরে হাঁটুপানি। ফ্রিজ, লেপ-তোশক, জামাকাপড় ও আসবাব পড়ে আছে পানিতে। ভাসছে থালা-বাসন। এর মধ্যে তার দুই ছেলেকে নিয়ে সোফাগুলো ঘর থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছিলেন।
তিনি বলেন, চোখের পলকে বিলীন হয়ে গেছে একের পর এক বসতবাড়ি। পাকা ভবন, ভিটে-মাটি, খামার, গাছপালা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো কিছুই বাদ যায়নি আগ্রাসী বন্যার থাবা থেকে। বন্যায় ঘর ভিটেমাটিসহ সব হারিয়ে অসহায় এ মানুষদের ঠাঁই হয়েছিল আশ্রয়ণের ঘরে।
মুরগির খামার করে স্বাবলম্বী হয়েছিলেন আলামপুর গ্রামের দেলোয়ার হোসেন। খামারে তুলছিলেন প্রায় ১১ হাজার মুরগি। ৩০ দিন বয়সী মুরগির ওজন প্রায় এক কেজি হয়েছিল, কয়েক দিন পর বাজারে বিক্রি করার কথা। কিন্তু স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় সব মুরগি পানিতে মারা গেছে। পুঁজি হারিয়ে এখন নিঃস্ব তিনি। তার প্রায় ২৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
এখনও পরশুরাম, সোনাগাজী ও ফুলগাজীতে ঝুঁকিতে রয়েছে এসব এলাকার শত শত ঘর বাড়ি, একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট। তাই আতঙ্কে এখন নির্ঘুম রাত কাটছে নদী তীরের মানুষের।
সবচেয় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সীমান্তবর্তী পরশুরামের বাউরপাথর, সলিয়া, অনন্তপুর, চিথলিয়া, অলকা, নোয়াপুর, ধনিকুন্ডা, দুর্গাপুর, কাউতলী, চম্পকনগর ও সাতকুচিয়া গ্রাম। একইভাবে ফেনী সদর উপজেলার মোটবী লক্ষ্মীপুর, বাঘাইয়া, সাতসতি, ইজ্জতপুর, শিবপুর, বটতলি এলাকার মানুষ।
তবে জেলায় কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এখনো সেই তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি সরকারি বিভিন্ন দপ্তর। জেলা প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর এবং সড়ক ও জনপদ বিভাগ বলছে, তথ্য সংগ্রহ চলছে। অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) শাহীনা আক্তার জানান, টানা বৃষ্টি ও ভারত হতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফেনী জেলায় প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বন্যার কবলে পড়েছেন প্রায় ১১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। বন্যায় দুর্যোগের শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দশ লাখ মানুষ।