সংস্কারের দাবিতে প্রাথমিক শিক্ষা

ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে থার্ড ভয়েস অফ গ্লোবাল সাউথ সামিট-২০২৪ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়ে গেল। উক্ত অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভার্চুয়াল বক্তব্য প্রদান করেছেন। তিনি তার বক্তব্যে সুস্পষ্ট বলেছেন, এখন তাদের কাজ নির্বাচনী ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, অর্থনীতি ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধন করা।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় বিপ্লবের মাধ্যমে সরকার পতনের অভাবনীয় ইতিহাস বিশ্বের দরবারে এক অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার জন্য বাংলাদেশের ছাত্ররা প্রাণ দিয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে একুশে ফেব্রুয়ারির মাধ্যমে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় আসীন করা হয়েছে। ঠিক তেমনি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার এই গণঅভ্যুত্থানের নায়ক আবু সাঈদ যে মহাকাব্য রচনা করেছেন তা বিশ্ব দরবারে বিরল এবং অভাবনীয়। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের তরুণরা গ্রাফিতি এঁকে দেয়াল রাঙিয়েছে, সূচনা করেছে নতুন দিগন্তের।

এই মুহূর্তে শহীদ আবু সাঈদ ও তারুণ্যদীপ্ত হাজার হাজার যুবকের স্বপ্নপূরণে প্রয়োজন ঐক্যের দীর্ঘস্থায়িত্ব। আর ২০২৪ এর তারুণ্য যে ঐক্যের ডাক দিয়ে সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা সবার জন্য অনুকরণীয়। তারুণ্যের ডাকে সাড়া দিয়ে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সকলেরই উচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাষ্ট্র সংস্কারে সহযোগিতা করা। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বলাবাহুল্য প্রাথমিক শিক্ষা সকল শিক্ষার ভিত্তি, সকল শিক্ষার মূল। তাই প্রয়োজন প্রাথমিক শিক্ষায় ঐক্য ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফলপ্রসূ সংস্কার। দীর্ঘদিন যাবত প্রাথমিক শিক্ষায় চলেছে নৈরাজ্য আর বিশৃঙ্খলা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের বদলি, পদোন্নতি, বেতন কাঠামো, অন্যান্য আর্থিক সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদায় বিরাজ করছে সীমাহীন বৈষম্য ও অনিয়ম।

লেখক ইশরাত নাসিমা হাবীব।

প্রাথমিক শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা কাঙ্ক্ষিত মানের নয়। তাদের রয়েছে বেতন বৈষম্য। বর্তমানে অনেক মেধাবী তরুণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে একরাশ স্বপ্নে বিভোর হয়ে চাকরিতে যোগদানের পর হতাশায় নিমজ্জিত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা চরম বেতন বৈষম্যের শিকার। প্রশিক্ষণবিহীন একজন সহকারী শিক্ষক ১৩ তম গ্রেডে যোগদান করে সাকুল্যে ১৮ হাজার টাকা বেতন উত্তোলন করেন। একজন নবনিযুক্ত প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১২ তম গ্রেডে যোগদান করে সাকুল্যে বিশ হাজার টাকা বেতন উত্তোলন করেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ১১ তম গ্রেডে বেতন উত্তোলন করেন। এই প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই আছেন বিসিএস নন ক্যাডার থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত। যাদের চাকরির শর্ত দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদাসহ দশম গ্রেড প্রাপ্তি। অথচ পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির ননক্যাডার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েও তারা দশম গ্রেডে বেতন প্রাপ্ত নন। ২০১৩ সালে জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের অনেকেই প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করলেও প্রধান শিক্ষকের স্কেল বঞ্চিত। তাছাড়া সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যাদের পদোন্নতি হয় তারা একই স্কেলে পদোন্নতি পান। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের এ ধারা বেতন বৈষম্য বিশ্বের আর কোনো দেশে আছে বলে জানা নেই।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষক প্রতিদিন যে পরিমাণ কাজ করে থাকেন তার সাথে এ বেতন কাঠামো অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রতিদিন সাত আটটি শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করার মাধ্যমে এই শিক্ষক যোদ্ধারা প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে রীতিমত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান অর্জিত না হওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করে দূর করতে হবে‌ চিরায়ত এ বৈষম্য। নাইলে প্রাথমিক শিক্ষার মতো জাতি গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান অতীতের মতো অকার্যকর থেকে যাবে।

প্রাথমিক শিক্ষার রয়েছে একদল যোগ্য দক্ষ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত জনবল। অথচ দিনের পর দিন বৈষম্যের শিকার এ দক্ষ জনগোষ্ঠী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। প্রাথমিক শিক্ষার উচ্চপর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা প্রশাসন ক্যাডার থেকে প্রেষণে এসে প্রাথমিক শিক্ষাকে অনুশাসন করে থাকেন। প্রাথমিক শিক্ষার উচ্চপর্যায়ের কর্তা ব্যক্তিরা প্রাথমিক শিক্ষার পেডাগোজি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না এবং এ বিষয়ে তারা বিশেষজ্ঞ নন। অথচ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষার নিজস্ব দক্ষ জনবল দিয়েই প্রাথমিক শিক্ষাকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার থেকে শুরু করে উপজেলা শিক্ষা অফিসার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, সহকারী পরিচালক, উপ-পরিচালক পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষার নিজস্ব কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে একই পদে আসীন থাকতে হয় বছরের পর বছর। প্রাথমিক শিক্ষায় পদোন্নতি প্রক্রিয়া এতটাই ধীরগতির আর বৈষম্যপূর্ণ যে শিক্ষক কর্মকর্তারা হতাশায় নিমজ্জিত থাকেন। তাছাড়া বদলি পদায়ন পেতে তাদেরকে বৈষম্যের শিকার হতে হয়, ধরনা দিতে হয় মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সিন্ডিকেটের কাছে। প্রাথমিক শিক্ষার এই অপসংস্কৃতি, অপচয়ের অচলায়তন দূর করতে না পারলে, একটি সুস্থ, সুন্দর সুশৃঙ্খল সিস্টেম প্রাথমিক শিক্ষায় তৈরি করতে না পারলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান অধরাই থেকে যাবে। প্রাথমিক শিক্ষার চলমান ধারার ফলে অনিয়ম-দুর্নীতি অপচয়কে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। ফলে অর্জিত হচ্ছে না প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য, বঞ্চিত হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক কোটি ৩০ লাখ কোমলমতি শিক্ষার্থী, ব্যাহত হচ্ছে তাদের মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন।

প্রাথমিক শিক্ষার একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে শিক্ষক প্রশিক্ষণ। প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইন্সটিটিউট জেলা পর্যায়ে এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা রিসোর্স সেন্টার প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকেন। সেখানেও দেখা যায় হযবরল অবস্থা। জুন মাস এলে নাকে মুখে প্রশিক্ষণের অর্থ ব্যয় করা হয়। ফলে প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ হচ্ছে না। এছাড়া প্রশিক্ষণের নামে অর্থের অপচয় ও বৈষম্যহীনভাবে প্রশিক্ষণ প্রদান করতে না পারার ব্যর্থতা তো রয়েছেই।

সরকারের সব বিভাগের মোট জনবলের প্রায় এক চতুর্থাংশ জনগণ প্রাথমিক শিক্ষায় কাজ করছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষায় নেই স্বতন্ত্র ক্যাডার। এ বৈষম্য দূর করা জরুরি। একসময় প্রাথমিক শিক্ষা একটি বিভাগ হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল। ১৯৯২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগকে (পিএমইডি) নিয়ন্ত্রণ করত। কাজের বিশালতা ও গুরুত্ব বিবেচনায় ২০০৩ সালে পৃথক মন্ত্রণালয় হিসেবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে পূর্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন থেকে মুক্ত হয়ে বর্তমান সময় অব্দি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশাসন ক্যাডার দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় কর্মরত বিশাল জনবলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও পেশাদারিত্বের অভাব সর্বত্র রয়েই গেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কার্যকর করার জন্য ও প্রাথমিক শিক্ষার বৈষম্য নিরসনের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার গঠন আজ সময়ের দাবি ও জরুরি হয়ে পড়েছে। যেখানে সাধারণ শিক্ষার পৃথক ক্যাডার রয়েছে সেখানে প্রাথমিক শিক্ষার পৃথক ক্যাডার না থাকা বিশাল বৈষম্য সৃষ্টি করছে এবং প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান অর্জনে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শিক্ষায় সংস্কারকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে পৃথক ক্যাডার ঘোষণা করার জন্য কিছু সুপারিশ নিচে উল্লেখ করা হলো: 
১. প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডার সর্বাগ্রে ঘোষণা।
২. সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও সহকারী ইন্সট্রাক্টর ইউআরসি পদ নবম গ্রেডে উন্নীত করে এবং পিটিআই ইন্সট্রাক্টর পদকে প্রভাষক পদ (নবম গ্রেড) নামকরণ করে প্রাথমিক শিক্ষা ক্যাডারের এন্ট্রি পদ নির্ধারণ। 
৩. সরকার ঘোষিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড পদমর্যাদা ও দশম গ্রেড প্রাপ্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করে ক্যাডারের এন্ট্রি পদের ৫০% পদে পদোন্নতির সুযোগ।
৪. সহকারী শিক্ষক পদ ১১তম গ্রেডে উন্নীত করে প্রধান শিক্ষক পদে ১০০% পদোন্নতির সুযোগ। 
৫. সরকারি অন্যান্য বিভাগীয় কার্যালয়ের মতো প্রাথমিক শিক্ষায় বিভাগীয় উপ-পরিচালকের কার্যালয়গুলোকে পরিচালকের (তৃতীয় গ্রেড) তত্ত্বাবধানে পরিদপ্তর ঘোষণা করে জনবল বৃদ্ধি করা।  
৬. সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের মত প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইন্সটিটিউট গুলোকে প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে রূপান্তর। 
৭. প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইন্সটিটিউট গুলোর পদনাম পরিবর্তন করে প্রভাষক নবম গ্রেড, সহকারী অধ্যাপক ষষ্ঠ গ্রেড, সহযোগী অধ্যাপক পঞ্চম গ্রেড ও অধ্যক্ষ ৫ম গ্রেড পদ সৃজন।
৮. এনসিটিবি এর প্রাথমিক শিক্ষা উইং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে এনে প্রাথমিক শিক্ষার যোগ্য ও উপযুক্ত জনবল দিয়ে পরিচালনা।

প্রাথমিক শিক্ষাই হতে পারে বিশ্বায়নের অন্যতম হাতিয়ার। প্রাথমিক শিক্ষায় সংস্কার না এলে সমাজ, রাষ্ট্র সংস্কার প্রায় অসম্ভব। প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে শিশু শিক্ষার্থীদের বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধি ও প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন করে প্রাথমিক শিক্ষার একটি সুশৃঙ্খল সিস্টেম চালু না করতে পারলে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা কেবল স্লোগান থেকে যাবে। প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে শিশু অধিকার বাস্তবায়ন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক নম্বর এজেন্ডায় পরিণত করার মাধ্যমে দেশ সংস্কার শুরু করতে হবে। নতুন বাংলাদেশের হাজারো তরুণের স্বপ্ন পূরণে প্রাথমিক শিক্ষার  জনবল তারুণ্যে দীপ্ত ও তাদের সাথে একাত্ম। 

লেখক: সমন্বয়ক, বৈষম্য নিরসনে প্রাথমিক শিক্ষা সমন্বয় পরিষদ ও সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, গাজীপুর।