শিবরাম চক্রবর্তীকে বাংলা রম্যসাহিত্যের কিংবদন্তী বললে অত্যুক্তি হবে না। চটুল বাক্য নেই, অপরকে ব্যক্তি আক্রমণ নেই, কিন্তু সমাজ আর প্রতিষ্ঠিত সমস্তপ্রথাকে ধরাশায়ী করেছেন ঋজু বক্তব্য আর বক্রোক্তি দিয়ে। তার লেখার এমন আছর যে, অমন বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তিটির আঁতে ঘা লাগবে বটে কিন্তু তিনি বাধ্য হবেন মুখে একটূ কাষ্টং হাসি ঝুলাতে। হাসিঠাট্টা করার সময় নিজেকেও রেহাই দিতেন না। বরঞ্চ মনে হতে পারে, হাস্যকৌতুকের পাত্রটা এবার যেহেতু তিনিই সে কারণে এবার যেন একটু বেশিমাত্রায় রগড় করা যায়! শিবরাম নিজের নাম লিখতেন, শিব্রাম চক্কোত্তি, বন্ধুদের আড্ডায় শিব্রাম চকরবরতি। থাকতেন কলকাতার মুক্তারাম লেনের একটি মেসে। ছিলেন চিরকুমার, সংসার করেননি। বলতেন, মুক্তারামের তক্তারামে শুক্তোরাম খেয়ে বেশ আরামেই দিন কাটাচ্ছি। শব্দের সঙ্গে শব্দ মিলিয়ে দেওয়ার এই ব্যাপারটা ইংরেজিতে পানিং বলে, এটিকে তার লেখার ও কথার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য গণ্য করা হয়। ঠিকানা হিসেবে মেসের ঠিকানায় সব জায়গায় দেওয়া ছিল। সবাই তার সঙ্গে দেখা করতেও সেখানেই আসতেন। কারো ঠিকানা লিখে রাখার দরকার হলে লিখে রাখতেন মেসের দেয়ালে। বলতেন, কাগজে লিখে রাখলে হারিয়ে যাবে। দেয়াল আর হারাবে কোথায়? এ কারণে দেয়াল রঙও করতে দিতেন না।
জীবনের নানা বাস্তবতা হাস্যরস দিয়ে মোকাবিলা করার মোক্ষম পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন। একবার অফিসে খবর এলো, শিবরাম রাস্তার ফুটপাথে শুয়ে আছেন। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় ছুটলেন কী খবর খোঁজ নিতে। জিজ্ঞেস করলেন, কী হলো, ফুটপাথে শুয়ে আছেন কেন? মুখে বললেন, হঠাৎ মনে হলো মাটিতে শুয়ে আকাশটা কেমন লাগে দেখি তো! তাই শুয়ে আছি। সঞ্জীবের মুখের ভাব দেখে বুঝলেন উত্তরটি মনোঃপুত হয়নি। তখন একটু ঝুঁকে আসতে বললেন। তারপর কানে কানে বললেন, চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গেছি। তা ধেড়ে একটা লোক নামতে গিয়ে পড়ে যাওয়া লজ্জার নাকি ফুটপাথে শুয়ে থাকা লজ্জার? এই হচ্ছেন শিবরাম!
শিশুদের জন্যে তিনি লিখেছেন বিস্তর। তার শিশুদের জন্য লেখাও বড়রা উপভোগ করতে পারেন অনায়াসে। তার ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ কিশোর উপন্যাসটি তো কিংবদন্তী হয়ে উঠেছিল জীব্বদশাতেই। শিবরামের বাবা শিবপ্রসাদ চক্রবর্তী সংসারে থেকেও ছিলেন সন্ন্যাসী। প্রায়ই বাড়ি থেকে বের হয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন। বাবার এই স্বভাবটি ছোটবেলাতেই রক্তের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। তিনিও খুব বাড়ি থেকে পালাতেন। কয়েকদিন ঘুরেফিরে বাড়ি ফিরে আসতেন। তার মাও আধ্যাত্মিক সাধনায় রত থাকতেন। ইশ্বরে ছিল অটল ভক্তি। বিশ্বাস করতেন তারাই তার খোকাকে দেখে রাখবেন। তাই দুঃশ্চিন্তা করতেন না। বাড়ি থেকে পালিয়ে থাকার সত্য অভিজ্ঞতাই লিপিবদ্ধ করেছিলেন ওই বইয়ে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটক ওই বইয়ের কাহিনী অবলম্বনে একই নামে একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছিলেন। সেটিও ভীষণ সুখ্যাত হয়েছিল।
তার লেখার আরেকটু গুণ হলো, তা কখনও পুরোনো হয় না। চার দশকেরও বেশি হলো দেহত্যাগ করেছেন (তার ভাষায় ট্যাক্সি ডেকে বিদায় নিয়েছেন) তবু আজকের পাঠকের হাতে যদি কোনোমতে তার লেখা একটি পড়ে সেটি না শেষ করে তো তারা উঠতে পারে না। কিন্তু নিজেকে সাহিত্যিক হিসেবে পরিচয়ই দিতেন না।
বলতেন, আমি আবার সাহিত্যিক হলাম কবে? প্রেমেন, অচিন্ত্য, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভুষণ এরা হলেন সাহিত্যিক। কত ভাল ভাল লেখেন! তাদের পাশে আমি! নিজের সম্পর্কে বলতেন, সার্কাসের ক্লাউন যেমন। সব খেলাই সে পারে, কিন্তু পারতে গিয়ে কোথায় যে কী হয়ে যায় খেলাটা হাসিল হয় না। হাসির হয়ে ওঠে। আর হাসির হলেই তার খেলা হাসিল হয়। বিশেষ বিশেষ দিনে শিবরাম কিন্তু হালের মিমের উপাদান বা সামাজিক যোগাযগ মাধ্যমের ট্রেন্ড হয়ে ওঠেন। যেমন, বাংলা বা ইংরেজি নববর্ষের দিনে অবধারিতভাবে শিবরামের ছোট্ট একটি চুটকি ট্রেন্ড হয়ে উঠতে দেখা যায়। ওই যে, যেখানে শিবরাম বলেছেন, বহু বছরের কঠিন পরিশ্রমের পর আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, ‘নতুন-বছর’ ‘নতুন-বছর’ বলে খুব হইচই করার কিচ্ছু নেই। যখনই কোনো নতুন বছর এসেছে, এক বছরের বেশি টেকেনি। ধর্ম নিয়ে হানাহানি আর টানাটানির এই যুগে আরেকটি লেখাও খুব ট্রেন্ড হতে দেখা যায়। একটা লেখায় তিনি লিখেছিলেন, 'প্রথমে ভেবেছিলাম যে মন্দির বানাবো। ...তারপর ভেবে দেখলাম... সেখানে কেবল হিন্দুরাই আসবে, মুসলমান, ক্রিশ্চান এরা কেউ ছায়া মাড়াবে না তার। মসজিদ গড়লেও ...মুসলমান ছাড়া আর কেউ ঘেঁষবে না তার দরজায়। গির্জা হলেও তাই। যাই করতে যাই, সর্বধর্মসমন্বয় আর হয় না। তা ছাড়া পাশাপাশি মন্দির মসজিদ গির্জা গড়লে একদিন হয়তো মারামারি লাঠালাঠিও বেধে যেতে পারে। তাই অনেক ভেবেচিন্তে এই পায়খানাই বানিয়েছি। সবাই আসছে এখানে। আসবে চিরদিন।’
বলা হয় এখন আর সাহিত্যের পাঠক নেই, লাইক-শেয়ার-কমেন্ট, ভ্লগ আর রিলে ভেসে গেছে চিরায়ত সাহিত্যের কদর, তারপরও শিবরাম যে বহাল তবিয়তে টিকে আছেন তাতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার মুহুর্মুহ ট্রেন্ড হওয়াটাই প্রমাণ করে, তাই নয় কি?