ইসলামি গানে নজরুলের অবদান

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রাক-কৈশোরে ছিলেন মসজিদের মুয়াজ্জিন। তার শুরুর জীবন কেটেছে ইসলাম চর্চার মাধ্যমে। তার সাহিত্যকর্মেও ইসলামের প্রভাব প্রকট। তিনি প্রায় চার সহস্রাধিক গান রচনা করেছেন। তার মধ্যে ইসলামি গানের সংখ্যা ২৮০টি। যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে। তবে যে কয়টি ইসলামি গান তার থেকে পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতেই বলা যায়, বাংলা ইসলামি গান রচনায় তিনি সর্বাধিক রচয়িতা হিসেবে আজ পর্যন্ত অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার রচিত প্রায় ৮০ ভাগ গানে তিনি নিজেই সুর সংযোজন করেছেন। তিনি সুর সংযোজনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত নান্দনিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

ইসলাম ধর্মের মৌলিক অনুষঙ্গগুলোর প্রায় সব বিষয়েই নজরুল ইসলামি গান লিখেছেন। তাওহিদ, রিসালাত, হামদ-নাত, আজান, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, শবেমেরাজ, শবেবরাত, শবেকদর, রমজান, ঈদ, মহররম, ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, জাগরণী গান, ইসলামের সাম্যের শিক্ষা, অমর ব্যক্তিত্ব, মুসলিম নারীর মর্যাদাসহ এমন কোনো বিষয় নেই, যা নিয়ে তিনি গান রচনা করেননি। নজরুলের এসব গানে বাংলার পাশাপাশি আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দের মিশেল সত্যিকার অর্থেই ইসলামি আবেশ সৃষ্টি করেছে। বহুভাষিকতা নজরুলের অপার সৃষ্টিশীলতার একটি মহত্তম দিক।

নজরুল ইসলামি গান রচনা শুরু করেন ১৯৩১ সালে। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ছিল তার রচিত প্রথম ইসলামি গান। এটি বাঙালি মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় ও আনন্দের উৎসব ঈদুল ফিতর নিয়ে কালজয়ী একটি গান। ঈদের আনন্দ, সৌন্দর্য এবং আধ্যাত্মিক দিক তুলে ধরা হয়েছে এই গানে। গানটি বাঙালি মুসলিম সমাজে ‘ঈদের আবহ গান’ হিসেবে পরিচিত, যা বাঙালির ঈদ আনন্দের এক আবশ্যকীয় অংশ হয়ে উঠেছে। শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের অনুরোধে কবি নজরুল এই গান রচনা ও সুরারোপ করেন।

এই গান রচনার পেছনে একটি ইতিহাস রয়েছে। কবি নজরুল তখন শ্যামাসংগীত লিখতেন। শ্যামাসংগীতের জন্য রীতিমতো খ্যাতির শিখরে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। এক রাতে রেকর্ডিং শেষে নজরুল বাড়ি ফিরছিলেন। পথে তাকে থামান শিল্পী আব্বাসউদ্দীন। কবির কাছে একটা আবদার ছিল তার। না শোনা পর্যন্ত তাকে যেতে দেবেন না। নজরুল বললেন, বলে ফেলো তোমার আবদার। আব্বাসউদ্দীন বললেন, কাজী দা, একটা কথা আপনাকে অনেক দিন ধরেই বলব বলব ভাবছি। দেখুন, পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়ালরা কী সুন্দর উর্দু কাওয়ালি গায়। শুনেছি তাদের গান প্রচুর বিক্রি হয়। বাংলায় ইসলামি গান তো তেমন নেই। বাংলায় ইসলামি গান গাইলে কেমন হয়? আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন, তাহলে মুসলমানদের ঘরে ঘরে আপনার জয়গান বাজবে। বাজারে তখন শ্যামাসংগীতের জয়জয়কার। যে শিল্পীই শ্যামাসংগীত গাইতেন, তিনিই রীতিমতো বিখ্যাত হয়ে যেতেন।

নজরুল নিজেও তখন শ্যামাসংগীত লিখতেন, সুর করতেন। গানের বাজারের যখন এই অবস্থা, তখন আব্বাসউদ্দীনের এমন আবদারে নজরুল কী জবাব দেবেন, বুঝে উঠতে পারেন না। তিনি বলেন, গান রেকর্ড করতে হলে তো বিনিয়োগ করতে হবে, সরঞ্জাম লাগবে। এগুলোর জন্য গ্রামোফোন কোম্পানির ভগবতী বাবুর কাছে যেতে হবে। আগে দেখো ভগবতী বাবুকে রাজি করাতে পারো কি না? আব্বাসউদ্দীন ভগবতী বাবুকে অনেক অনুরোধ করে, অনেকবার বলেকয়ে রাজি করালেন। অতঃপর নজরুলের কাছে এসে বললেন, ভগবতী বাবু রাজি হয়েছে, আপনি গান লিখুন। নজরুল বললেন, ঠিক আছে। এক ডোঙ্গা পান দিয়ে যাও। নজরুল পান মুখে দিয়ে রুমের দরজা লাগিয়ে লিখতে বসে যান। আব্বাসউদ্দীন বাইরে পায়চারি করতে থাকেন। অল্প কিছুক্ষণ পরই নজরুল দরজা খুলে মুখ থেকে পানের পিক ফেলে আব্বাসউদ্দীনকে বললেন, এই নাও তোমার গান। ব্যস, এইটুকু সময়েই একটি কালজয়ী গানের জন্ম হয়ে গেল! অতঃপর এই গান বাজারে এলে খুব হিট হলো। নজরুল আরও ইসলামি গান রচনার তাগাদা পেলেন। একটা সময় পরিস্থিতি এ রকম হলো যে, নজরুল ইসলামি গান লিখলেই বাজারে তা হিট! ফলে অনেক হিন্দু শিল্পীও মুসলিম নামধারণ করে ইসলামি গান গাওয়া শুরু করেন।

ইসলামি গানের বেশ কয়েকটি শাখা আছে। তার মধ্যে সম্ভবত ‘নাতে রাসুল (সা.)’ রচনাতেই নজরুল তার অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে, এই কথা থেকে কোনোক্রমেই এটা ভাবা যাবে না যে, ইসলামি গানের অন্যান্য শাখায় বুঝি তার দখল কিছুটা কম। তিনি ইসলামের মৌলিক সব বিষয়েই গান রচনা করেছেন। ইসলামি গান রচনায় নজরুলের সমকক্ষ বাংলায় তো নয়ই, বিশ্বেও খুঁজে পাওয়া বিরল।

ইসলামি নাতগুলোর যে বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে, সেই অনুযায়ী নজরুল রচিত নাতগুলো অনেক উচ্চমানের। সুর, ভাব ও ভাষার গভীরতা, সবদিক থেকেই তা উচ্চমানের। কয়েকটি নাতের কথা এ রকম ‘দেখ আমেনা মায়ের কোলে/ দোলে শিশু ইসলাম দোলে’, ‘হেরা হতে হেলে দুলে নুরানি তনু ও কে আসে হায়/ সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে খুলে যায়/ সে যে আমার কামলিওয়ালা, কামলিওয়ালা’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে/ মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে।’

নজরুল লিখেছিলেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিয়ো ভাই/ যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।’ নজরুলের কথা রাখা হয়েছে। তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়েছে। এখানে নজরুল ৪৮ বছর যাবৎ শায়িত আছেন। মহান আল্লাহ কবরে তাকে অনেক যত্নে রাখুন, আদরে রাখুন।