বৈষম্যমূলক নীতি বিবেচনায় ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যদের নিরাপত্তা (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, ২০২৪’-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। এর ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুই মেয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং তাদের সন্তানদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তার সুবিধাটি আর থাকছে না।
সেই সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশোধিত আইনে জাতির পিতার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিধান বাতিল করে প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া কালো টাকা সাদা করার সুযোগও বাতিল হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের চতুর্থ বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা বলেন, ‘আমাদের এ সরকারটা হচ্ছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আউটকাম। নিরাপত্তা সংস্থা একটি পরিবারের জন্য এরকম বিশেষ নিরাপত্তার দরকার আছে বলে মনে করে না। আর এটাকে বৈষম্যমূলক মনে করা হয়েছে, সেটার ভিত্তিতে এটা রহিত করা হয়েছে।’
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিগত সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন, ২০০৯ জারি করা হয়েছিল। পরে ২০১৫ সালে এ আইন অনুসারে বিশেষ নিরাপত্তা এবং সুবিধাদি প্রদানের গেজেট জারি করা হয়। কেবল একটি পরিবারের সদস্যদের রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য আইনটি করা হয়েছিল, যা একটি সুস্পষ্ট বৈষম্য।’
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বর্তমান অন্তর্র্বর্তী সরকার সব বৈষম্য দূর করতে দৃঢ়প্রত্যয় গ্রহণ করেছে। বর্তমানে সংসদ না থাকায় এ আইন রহিত করার জন্য অধ্যাদেশ জারি করা প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে উপদেষ্টা পরিষদ ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা (রহিতকরণ) অধ্যাদেশের’ খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়কবিভাগের আইনি যাচাই (ভেটিং) সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে।
অন্যদিকে ‘বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) আইন, ২০২১’ সংশোধনের ব্যাপারে বলা হয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যগণ’ এবং কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য ‘বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) আইন, ২০২১’ প্রণয়ন করা হয়েছিল।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ আগস্ট অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ আইনের আওতায় প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া বিদ্যমান আইনের আওতায় ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যগণের’ নিরাপত্তা প্রদানসংক্রান্ত বিধানগুলো প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় কার্যকর করা সম্ভব নয়। তাই এ আইনের কিছু বিধান বিলোপসহ অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা বিধানের বিষয়টি সংযোজন করে অধ্যাদেশের খসড়া উপদেষ্টা পরিষদ বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করা হয়।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল : অপ্রদর্শিত অর্থ হিসেবে বিবেচিত কালো টাকা বৈধ বা সাদা করার সুযোগ আর না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে; যা নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে সমালোচনা করা হচ্ছিল।
অতি দ্রুত সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করবে উল্লেখ করে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা বলেন, বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে কালো টাকা সাদা করার যে বিধি ও রীতি বন্ধ করে দেওয়া। এটা (কালো টাকা সাদা করার সুযোগ) থেকে সরকার যেটুকু টাকা আনতে পারে, সেটা খুব বেশি নয়। আগে যেভাবে কলো টাকা সাদা করার ঘোষণা দেওয়া হতো। এবার তার উল্টোটা হতে পারে।
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ, নগদ টাকা এবং শেয়ারসহ যেকোনো বিনিয়োগ নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে ঢালাওভাবে সাদা করার সুযোগ ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।
অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন মহলের সমালোচনার পরও বাজেটে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে তা বৈধ করার প্রস্তাব পাস করে সংসদ। একই সঙ্গে চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রশ্ন ছাড়া জমি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট কিনে থাকলেও এলাকা অনুযায়ী বেঁধে দেওয়া কর অনুযায়ী সেগুলো বৈধ করার কথা বলা হয়। সংসদেও সরকারি ও বিরোধী দলের অনেক সদস্য এর সমালোচনা করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছিলেন। কারণ এতে দুর্নীতি উৎসাহিত হতে পারে বলেও অনেকের মত।
ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিল।
এ ছাড়া বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় বাংলাদেশ ফুটবল টিমকে সংবর্ধনা দেবে সরকার। বন্যার কারণে রপ্তানিমুখী যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত তাদের শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার কার্যক্রমও চালানোর সিদ্ধান্তও হয়েছে বৈঠকে।