স্বাধীন চারুশিক্ষা নীতির রূপরেখা প্রস্তাব-২

নতুন বাংলাদেশের শিল্পচর্চা এগিয়ে নিতে শিক্ষার্থীবান্ধব একটি স্বাধীন চারুশিক্ষা নীতির রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন শিল্পী সোহরাব রাব্বি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিল্পকর্মের মাধ্যমে যে ক’জন শিল্পী ডিজিটাল মাধ্যম ও বিদেশের মাটিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। শিল্পী সোহরাব রাব্বির শিক্ষার্থীবান্ধব স্বাধীন চারুশিক্ষা নীতির রূপরেখা প্রস্তাবনার দ্বিতীয় কিস্তি প্রকাশিত হলো আজ।
স্বাধীন চারুশিক্ষা নীতির দ্বিতীয় পর্বে আমরা আলাপ করব চারুশিক্ষা গ্রহণ করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা কী কী উপায়ে বিশ্ববিদ‍্যালয় পর্যায়ে শিক্ষায় প্রবেশ করতে পারে।
 
বিশ্ববিদ‍্যালয় পর্যায়ে শিল্পশিক্ষার্থী বাছাই প্রক্রিয়া
 
এই আলোচনাটি আমাদের দেশের শিক্ষাব‍্যবস্থার প্রেক্ষিতে খুব সহজ কিংবা আরামপ্রদ নয়। এর বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত আমাদের মাধ‍্যমিক ও উচ্চ মাধ‍্যমিক শিক্ষাব‍্যবস্থায় চারুশিক্ষাকে কখনোই কারিকুলামের অন্তর্গত মূলধারা হিসেবে দেখা হয়নি। বরং এটিকে মূলধারার শিক্ষার পাশাপাশি একটি ঐচ্ছিক ও অবসর যাপনের শৌখিনতা হিসেবে দেখা হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির ভেতরে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব‍্যবস্থার প্রভাবকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ এরকম মনোভাব চারুশিক্ষার ব্যাপকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এর মধ্য দিয়ে নানাবিধ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাব ও বিভিন্ন শ্রেণির অংশগ্রহণকে নাকচ করে শুধুমাত্র অভিজাত শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ একটি চর্চারূপে চারুশিল্পকে প্রতিষ্ঠা করে। কৃষিপ্রধান দেশের শিক্ষাব‍্যবস্থায় ‘কৃষি শিক্ষা’কে একইভাবে মূল শিক্ষার উপধারা বা কম মূল‍্যের শিক্ষা হিসেবে অবহেলিত হতে দেখি।
 
দ্বিতীয়ত, সারাবিশ্বে চারুশিক্ষার উচ্চতর শিক্ষার প্রাক্কালে এবং উচ্চমাধ‍্যমিকের শেষে যেসব শিক্ষার্থী চারুশিক্ষায় পড়তে চায়, তাদের জন‍্য ১ বছরের বিশেষ চারুশিক্ষা ডিপ্লোমা বুনিয়াদি শিক্ষা হিসেবে থাকে যা মূল শিক্ষা কার্যক্রমের ভেতরে পরিচালনা করা হয়। এটা কোন কোন বিশ্ববিদ‍্যালয়ে অনার্স কোর্স শুরু হওয়ার আগে পরিচালিত হয় (যেমন ইউনিভার্সিটি অব আর্টস লন্ডন)। আমাদের চারুশিক্ষাক্রমেও নব্বই দশক পর্যন্ত এরকম একটি কার্যক্রম ‘প্রি-ডিগ্রি’ নামে চালু ছিলে যা এখন আর নেই। কিন্তু উচ্চমাধ‍্যমিক থেকে বিশ্ববিদ‍্যালয়ে উন্নীত হওয়ার মাঝখানে যে সুবিশাল কারিকুলামগত শূন্যস্থান তা পূরণের একটি হাস‍্যকর প্রচেষ্টা চালু রয়েছে, তা হলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অস্বীকৃত ‘চারুকলা ভর্তি কোচিং’।
 
চারুকলার বিভিন্ন ব‍্যাচের উদ‍্যোগের এই কার্যক্রমের সাথে কিছুদিন প্রত‍্যক্ষভাবে যুক্ত থাকার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এটি অল্পবিস্তর চারুশিল্পের ব‍্যাকরণ ও শিল্পকলার ইতিহাস বিষয়ে ধারণা দেয় বটে, তবে তা গৎবাঁধা পদ্ধতির বেশি কিছু নয়। এখানে চারুকলায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের রেখাচিত্রের প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়: নিসর্গ চিত্র, ফিগার ড্রইং বা স্টিললাইফের বাস্তবানুগ অঙ্কন শেখানো হয়। এই ‘দক্ষতা’ বিগত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে চারুশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষায় মূল যোগ‍্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, এই গ্রামার নির্ভর ফিগারেটিভ অঙ্কন পদ্ধতি একটি কর্মশালা বা ট্রেইনিংয়ের মাধ‍্যমে যে কাউকেই খুব অল্প সময়ে শেখানো সম্ভব। আর তাই এই দক্ষতা কিছুতেই পরীক্ষার্থীর সৃজনশীলতা নির্ণয়ের প্রক্রিয়া হতে পারে না। এর মধ‍্য দিয়ে সৃজনশীলতার বৈচিত্রের দিকটিও পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়।
 
শুধু তাই নয়, এই ভর্তি প্রক্রিয়াটি টিকিয়ে রেখে আমাদের দেশের যে সকল ব্যক্তি অথবা জনগোষ্ঠীর মধ্যে নন-ফিগারেটিভ সৃজনশীল চর্চার ঝোঁক রয়েছে, তাদের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণকেও দমন করার প্রবণতা দেখতে পান অনেক শিল্পসমালোচক। আশঙ্কার বিষয় হলো এরকম কোচিং শিক্ষার পাঠ ধরেই চারুকলা ভর্তি পদ্ধতি যুগযুগ ধরে চলে আসছে। এখান থেকে উদ্ভূত ঘোরতর সংকটটি হলো প্রত‍্যেক শিক্ষার্থীর এই অভিন্ন স্কিল তার সমগ্র চারুশিক্ষা জীবনকে ভূত হয়ে তাড়িয়ে বেড়ায়। এছাড়া প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজস্ব সৃজনশীলতা এবং বিভিন্নতাও উপেক্ষিত হয় এমন পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনা করার কারণে। একই প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ জারি রাখা হয় বিশ্ববিদ‍্যালয়ের চার বছর জুড়ে যে পাঠ‍্যক্রম সেখানেও।
 
কেন বর্তমান ভর্তি পদ্ধতি অকার্যকর তার প্রেক্ষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নোক্তা না দিয়ে রাখলেই নয়। কারণ এই পদ্ধতিকে জাতিবাদী চর্চা কাঠামো তৈরির একটি প্রকল্প হিসেবেও পাঠ করা যেতে পারে। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো- শিল্পচর্চার এরকম ধারার প্রচলন ঘটেছিল মধ‍্যযুগের চার্চ কেন্দ্রিক ধর্মীয় বাণী প্রচারের জন‍্য। আসমান ও জমিনের বিভিন্ন ধর্মীয় গল্প, প্রোপাগান্ডা ও ‘Larger than life’ ন‍্যারেটিভ তৈরির জন‍্য শিল্পীদের নিয়োগ করে বাস্তবানুগ মুরাল চিত্র তৈরি করা হত চার্চে। মধ‍্যযুগের শেষের দিকে বিভিন্ন সম্রাট-সম্রাজ্ঞী বা মিথলজিক‍্যাল গল্পকে ফুটিয়ে তোলা হত কোর্ট পেইন্টার বা দরবারি ভাস্করদের দিয়ে। রেনেসাঁ যুগে শিল্পীদের দিয়েই তৈরি করা হয়েছিল আদর্শবাদী ন‍্যারেটিভ।
 
স্বাধীন চারুশিক্ষা নীতির প্রস্তাবিত রূপরেখা
 
একই ধারাবাহিকতায় উনিশ ও বিশ শতকে আমরা বিভিন্ন শাসকদের আবক্ষ মূর্তি, আইকন বা মনুমেন্ট তৈরি করে একটি নির্দিষ্ট ন‍্যারেটিভ বা কাল্ট-ফিগার তৈরির প্রচেষ্টা দেখতে পাই। এই আইকন বা মনুমেন্টগুলো শাষক শ্রেণির সাথে শোষিত শ্রেণির ব‍্যবধানকে বারবার মনে করিয়ে দেয় এবং তাদের মধ‍্যে আর্থ-সামাজিক বিভেদ জারি রাখতে ভূমিকা পালন করে বলে এই শতাব্দীর গোড়া থেকে সমকালীন শিল্পকলায় মনুমেন্ট বা আইকন তৈরির বিষয়টিকে কঠোর সমালোচনার মধ‍্য দিয়ে শিল্প তাত্ত্বিকরা দেখেন। তাই প্রশ্ন থেকে যায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং পাবলিক পরিসরে এ সকল ছবি ও ভাস্কর্যের পুনঃ পুনঃ উৎপাদনই আমাদের চারুশিক্ষার মূল উদ্দেশ‍্য কিনা; কিংবা সমকালীন উত্তর-আধুনিকতার যে বৈচিত্র‍্যবাদী চিন্তা বা আমাদের অঞ্চলে লালন-সুফি-চাণক‍্য-নাগার্জুনের যে বহুত্ববাদী দর্শন রয়েছে তাকে প্রতিহত করতেই এই ঔপনিবেশী শিক্ষাকাঠামো প্রচল আছে কিনা। সর্বোপরি পূর্বতন শিক্ষকদের অসৃজনশীল চর্চার তল্পিবাহকে পরিণত করার চক্রান্ত ব‍্যতীত যুগোপযোগী চারুশিক্ষার সাথে একেবারেই বেমানান এই প্রাচীন বাছাই পদ্ধতিটি কেন টিকে আছে তার কোন যৌক্তিক জবাব পাওয়া যায় না।
 
ইউরোপিয়ান শিক্ষাব‍্যবস্থায় (জার্মানি ও ফ্রান্স) আরেকটি ধারা চালু আছে যেখানে শিল্পশিক্ষায় আগ্রহীদের জন‍্য মাধ‍্যমিক ও উচ্চমাধ‍্যমিক পর্যায়ে চারুকলা বিষয়টিকে বাধ‍্যতামূলক করা হয়েছে। এখানে আশানুরূপ ফলাফলের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ‍্যালয় পর্যায়ে অংশ নিতে পারে শিক্ষার্থীরা। তবে এসব ক্ষেত্রে সেকেন্ডারি পর্যায়ে অন‍্যান‍্য বিষয়ের মতো সমান গুরুত্ব দিয়ে চারুশিক্ষা কার্যক্রম তৈরি করার বন্দোবস্ত তৈরি থাকতে হবে।
 
এই দুটি ব‍্যবস্থা ছাড়াও বিশ্ববিদ‍্যালয় পর্যায়ে চারুকলা শিক্ষায় অংশ নিতে সমকালীন বিশ্বে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব নিয়ে যে বিষয়টি বিবেচনা করা হয় তা হলো সৃজনশীল পোর্টফোলিও পদ্ধতি। বাংলাদেশের বর্তমান চারুশিক্ষাব‍্যবস্থার আলোক এই প্রক্রিয়াটি কার্যকর করবার অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নেওয়া সব থেকে দ্রুততার সাথে সম্ভব বলে অনেক অংশীজন মনে করেন। 
 
পোর্টফোলিও পদ্ধতির সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলো হলো
 
● একজন শিক্ষার্থী কতটুকু সৃজনশীল তা নিরুপন সম্ভব হয়;
● চারুশিক্ষায় তার ডেডিকেশন বা নিষ্ঠার জায়গাটি চিহ্নিত করা যায়;
● যেহেতু এটি একটি চর্চা, তাই তার একটি ধারাবাহিক বিবর্তন উঠে আসে পোর্টফোলিওর মধ‍্য দিয়ে;
● এতে করে শিক্ষার্থীর সৃজনশীল চর্চায় যে সকল শক্তিমত্তা শিক্ষার শুরুতেই উপস্থিত থাকে, সেগুলোকে পরিচর্যার মধ্য দিয়ে সহজেই উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়;
● এই পদ্ধতিতে বাছাইয়ে সৃজনশীল বৈচিত্র‍্য এবং বহুবিধ চর্চার মান রক্ষা করা যায়;
● যারা সুবিধাবঞ্চিত অথচ সৃজনশীল চর্চায় জড়িত আছেন কিংবা অনেকে স্বশিক্ষিত শিল্পী, বংশপরম্পরায় দক্ষ কারিগর রয়েছেন যারা একাডেমিক পরিসরের বাইরে অবস্থান করছেন তাদের জন‍্যও চারুশিক্ষার দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে যায়।
 
এমন নন-একাডেমিক সৃজনশীলদের অনন্য সাধারণ মেধাবী ক‍্যাটাগরিতে বিশ্ববিদ‍্যালয়ের সৃজনশীল চর্চায় স্থান দেওয়ার চল পশ্চিমের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিগত শতাব্দীর গোড়া থেকে চালু হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশে বহুমুখী শিক্ষাব‍্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা থাকার দরুন ও প্রত‍্যন্ত অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত বা পিছিয়ে থাকার কারণে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এই ব‍্যবস্থা চালু করা অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 
নির্বাচন পদ্ধতিসমূহ
 
আমাদের দেশের মতো সমন্বয়হীন সেকেন্ডারি শিক্ষাব‍্যবস্থা থেকে টারশিয়ারি চারুশিক্ষায় ফলদায়ক বৈচিত্র‍্য আনতে হলে এই বহুমূখী নির্বাচন পদ্ধতিকে উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং ভবিষ‍্যতে এসব পদ্ধতির ফলাফল বিবেচনা করে সমন্বয় সাধন করতে হবে। তবে অন্তত ৫-৭ বছর ধরে এর প্রভাব লক্ষ‍্য করতে হবে। ওপরের আলোচনা থেকে আমরা চারুশিক্ষায় প্রবেশের ৩টি পদ্ধতির ধারণা পেলাম। এগুলো হলো:
 
● উচ্চ মাধ‍্যমিকের পর চারু ও কারুকলায় বুনিয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স বা প্রিডিগ্রিতে ৬০% নম্বরের ভিত্তিতে;
● মাধ‍্যমিক ও উচ্চমাধ‍্যমিক পর্যায়ে চারুশিক্ষাকে বাধ‍্যতামূলক বিষয় নির্বাচন করে অন্তত ৭০% নম্বর ও প্রয়োজনীয় Aptitude Test-এর সমন্বয়ে বিবেচনা করা এবং
● পোর্টফোলিও ও Personal Statement বা প্রয়োজনীয় Aptitude Test-এর মাধ‍্যমে  A, B, C তিনটি ক‍্যাটাগরিতে মূল‍্যায়ন করে বিবেচনা করা
 
এছাড়াও এসব স্ট‍্যান্ডার্ড ভর্তি যোগ‍্যতা পূরণ না করেও একজন শিক্ষার্থী চারুশিক্ষায় ভর্তি হতে পারে যদি—
 
● চারুশিক্ষাভিত্তিক একাডেমিক জ্ঞান বা কাজের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা থাকে;
● শক্তিশালী চারুশিক্ষাকেন্দ্রিক পার্সোনাল স্টেইমেন্ট থাকে এবং
● যদি যাচাই স্বাপেক্ষে শক্তিশালী একাডেমিক ও প্রফেশনাল রেফারেন্স থাকে
 
উল্লেখিত তিনটি বৈশিষ্ট্যের যেকোনো একটি অথবা তিনটিরই সমন্বিত রূপ শিক্ষার্থীর মধ্যে উপস্থিত থাকবে। তবে এরকম ক্ষেত্রবিশেষে ভর্তি কমিশন বা জুরির সকলের অথবা বেশিরভাগের হ্যাঁ সূচক মতামত থাকতে হবে। এ বিষয়গুলো ছাড়াও বাংলা-ইংরেজী ভাষার দক্ষতা যাচাই করতে হবে। একাডেমিক পর্যায়ে তুলনামূলক আলাপচারিতা ও বিশ্লেষণমূলক শিক্ষণ চালাতে এই দুই ভাষায় দক্ষতা প্রয়োজন। ভাষায় অন্তত ৬০%-৭০% নম্বর থাকা উচিৎ একজন শিল্পশিক্ষার্থীর। তবে তার Visual Language-এর শক্তিমত্তার সাথে একে মিলিয়ে সমতাবিধান করা যেতে পারে।
 
যেসব বিষয় বিবেচনা করে শিল্পশিক্ষার্থী নির্বাচন করতে হবে
 
চারুশিল্প শিক্ষা যেহেতু শিল্পভাষার শিক্ষা তাই শিল্পভাষার প্রায়োগিক দক্ষতা কিভাবে এসেস বা মান নির্ধারণ করা যেতে পারে তার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দাবি করে। অন্তত বিশ্ববিদ‍্যালয় পর্যায়ে শিক্ষায় প্রবেশের দোরগোড়ায় এটি প্রয়োজনীয়। তাই উপরে উল্লেখিত সকল ক‍্যাটাগরিতেই যে সকল বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার্থীদের মান নির্ধারণ ও বিশ্ববিদ‍্যালয় পর্যায়ে চারুকলা শিক্ষার উপযুক্ত বলে বিবেচনা করা যাবে সেগুলো হলো:
 
● দৃশ‍্যমাধ‍্যমের কতটুকু কল্পনাপ্রসূত ও সৃজনশীল ব্যবহার করতে পারল তার অন্তত দুটি বৈশিষ্ট‍্য উপস্থিত থাকা:
- নিরীক্ষা ও উদ্ভাবনের সাথে যুক্ত হবার ঝোঁক 
- কল্পনাশক্তি প্রদর্শন ও দৃশ‍্যশিল্পটি নিয়ে তার আকাঙ্ক্ষা। 
● নানাবিধ স্কিল ও টেকনিক্যাল দক্ষতার প্রতি ঝোঁক প্রদর্শন করা, যেখানে:
- দক্ষতা অর্জনের আগ্রহ ও প্রতিশ্রুতি থাকবে, 
- বিভিন্ন উপকরণ ও প্রক্রিয়ার প্রচেষ্টা থাকবে।
● বুদ্ধিবৃত্তিক নিরীক্ষার প্রমাণ থাকবে:
- শিক্ষার্থী যেসব বিষয় ও চর্চার প্রতি আগ্রহী সেসব থিমগুলো নিয়ে গবেষণা করতে ইচ্ছুক কিনা,
- যা শিখছে তার ওপর তত্ত্বজ্ঞানের রিফ্লেকশন করছে কিনা।
● চর্চায় সাংস্কৃতিক সচেতনতা ও প্রেক্ষাপটগুলো বিবেচনার প্রমান করবে:
- শিল্পের ঐতিহাসিক ও সমকালীন চর্চাগুলো সম্পর্কে ধারণা আছে কিনা,
- কাজে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবগুলো লক্ষ‍্য করা যায় কিনা।
● ভাবনা ও অনুভূতিকে সুস্পষ্ট ভাষায় রূপ দিয়ে নিজের উদ্দেশ‍্যগুলো চিহ্নিত করবে:
- উপযুক্ত এবং কার্যকরভাবে উপস্থাপনা ও দর্শকের সাথে যোগাযোগ তৈরি করতে পারছে কিনা,
● তুলনামূলক আলোচনার মাধ‍্যমে নিজের ব‍িকাশের পাশাপাশি চারুশিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা নির্দেশ করবে: 
- নির্ধারিত প্রকল্প বিবরণীর বাইরে শিক্ষার্থীর নিজস্ব চিন্তা উপস্থিত আছে কিনা;
- শিক্ষার্থী এককভাবে এবং যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী কিনা;
- এই কোর্স সম্পর্কে শিক্ষার্থীর যথাযথ ধারণা আছে কিনা।
 
সর্বোপরি এমন শিক্ষার্থীদের বেছে নেওয়া- যারা প্রচলিত চিন্তাকাঠামোকে প্রশ্ন করতে প্রস্তুত, যারা যে কোন বিষয়ে বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে আগ্রহী এবং একজন সৃজনশীল শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সম্ভাবনা রাখে।
 
উপরের আলোচনা থেকে এটুকু স্পষ্ট যে মানসম্মত শিক্ষার্থী পেতে উল্লেখিত দক্ষতাগুলো যাচাই করতে হবে। কিন্তু এ ধরনের মান বা দক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে অবশ‍্যই মানসম্পন্ন শিক্ষক চারু শিক্ষায় নিয়োগ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীবান্ধব স্বাধীন শিল্পশিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একে অন‍্যের পরিপূরক এবং সহযাত্রী। দুইপক্ষের প্রস্তুতি এবং মানের ওপরই এই শিক্ষাব‍্যবস্থার সাফল‍্য নির্ভর করবে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব‍্যক্তিসত্ত্বার সাথে সম্পর্কিত নানা প্রশ্নে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর যৌথ নিরীক্ষা এবং উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টাই এই শিক্ষামডেলকে সমকালীন সফল ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চারুশিক্ষার সমমানে উন্নীত করবে। আগামী পর্বে তাই চারুশিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কি ধরনের যোগ্যতা ও গুণাবলী বিবেচনা করা হয় তা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
 
লেখক: শিল্পী সোহরাব রাব্বির শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে দেশ ও পাশ্চাত্যের গুরুত্বপূর্ণ মিউজিয়াম ও প্রদর্শনশালায়। তিনি গোল্ডস্মিথস, ইউনিভার্সিটি অব আর্টস লন্ডন (যুক্তরাজ্য) এবং ইউনিভার্সিটি অব ফাইন আর্টস, হামবুর্গে (জার্মানি) শিল্পকলা ও প্রতিবেশ বিষয়ক গবেষণা করছেন, অংশগ্রহণ করেছেন একাডেমিক কারিকুলাম তৈরি ও শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রমেও।  sohorabrabbey@gmail.com