দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চলমান বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এক সপ্তাহের বেশি সময় আগে শুরু হওয়া ওই বন্যায় এখনো কয়েক জেলার কয়েক লাখ মানুষ আছে পানিবন্দি। ছড়াচ্ছে রোগব্যাধিও। যাদের বাড়ি থেকে পানি নেমে গেছে, তারা শুরু করেছে সবকিছু নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার লড়াই। তবে খাবার, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় নানা জিনিসপত্রের অভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইটা কঠিন হচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যায় এখন পর্যন্ত ১১ জেলায় ৫৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রায় ১০ লাখ ৯ হাজার ৫২২টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যা আক্রান্ত জেলাগুলো হলোÑ ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার।
সার্বিকভাবে দেশের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ফলে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ নিজ নিজ বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের বন্যায় চারটি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়ন-পৌরসভা ৪৮৬টি। ১১ জেলায় ১০ লাখ ৯ হাজার ৫২২টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে; ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ৫৪ লাখ ৬৪ হাজার ১৬৭ জন।
চলমান বন্যায় মারা যাওয়া ৫৪ জনের মধ্যে পুরুষ ৪১, নারী ৬ ও শিশু ৭। তাদের মধ্যে কুমিল্লায় ১৪, ফেনীতে ১৯, চট্টগ্রামে ৬, খাগড়াছড়িতে ১, নোয়াখালীতে ৮, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১, লক্ষ্মীপুরে ১ ও কক্সবাজারে ৩ ও মৌলভীবাজার ১ জন মারা গেছেন। মৌলভীবাজারে এখনো একজন নিখোঁজ রয়েছে।
জানা গেছে, চলমান বন্যায় পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য ৩ হাজার ২৬৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৭ জন আশ্রয় নিয়েছে। ৩৮ হাজার ১৯২টি গবাদি পশু আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১১ জেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসাসেবার জন্য ৫৬৭টি মেডিকেল টিম চালু রয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনী কর্র্তৃক বন্যাদুর্গত এলাকায় ১ লাখ ৯৪ হাজার ২৮৫ প্যাকেট ত্রাণ, ১৯ হাজার ২৬০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ৪২ হাজার ৭৬৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১৮ হাজার ৩৮৯ জনকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ১৫৩ জনকে উদ্ধার করে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে। সশস্ত্রবাহিনী কর্র্তৃক পরিচালিত ২৪টি ক্যাম্প এবং ১৮টি মেডিকেল টিম বন্যা উপদ্রুত এলাকায় চিকিৎসাসেবা প্রদান করছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, গতকাল দেশের সব নদীর পানি সমতল বিপদসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছিল।
গতকাল ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীতে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার পর ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষতচিহ্ন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে মানুষ ফিরতে শুরু করলেও কাটেনি দুর্ভোগ। রেখে আসা ঘর-বসতির পুরোটাই যেন ধ্বংসস্তূপ। বানভাসি পরিবারগুলো সব হারিয়ে পথে বসার উপক্রম।
ফেনীতে ভয়াবহ বন্যায় ছয়টি উপজেলায় মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, কৃষি, সওজ, এলজিইডি ও দুধ-ডিমের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। ফেনী জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ অধিদপ্তরের বন্যার ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এদিকে বন্যায় পানিতে তলিয়ে শুধু কৃষিতে ক্ষতি হয়েছে ৪৫১ কোটি ২০ লাখ টাকা। এতে হতাশ ও পথে বসেছেন হাজার হাজার কৃষক। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আড়াই হাজার খামারি। তাদের ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তবে সরকারি প্রণোদনা পেলে নতুন উদ্যোগে শুরু করার সংগ্রাম করবেন বলে জানান অনেকে।
চলতি বছরের তৃতীয় দফার এ বন্যায় ফেনীর সবকটি উপজেলার বিভিন্ন জনপদ আক্রান্ত হয়। মাইলের পর মাইল রাস্তা নষ্ট হয়ে যায়। হাঁটার পরিস্থিতি নেই অনেক রাস্তায়। কৃষি, মৎস্য, পোলট্রিসহ সার্বিক ক্ষতি হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। ভয়াবহ বন্যায় এখন পর্যন্ত মারা গেছে ১৯ জন।
জেলা প্রশাসক মুসাম্মৎ শাহীনা আক্তার বলেন, এবারে বন্যায় ফেনীতে ১০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের নির্দেশনা পেলে তারা কাজ শুরু করবেন।
ফেনীর সোনাগাজী প্রতিনিধি জানান, স্মরণকালে নজিরবিহীন আকস্মিক বন্যায় পানিতে ডুবে ফেনীর সোনাগাজীতে ভেঙে পড়েছে বহু পরিবারের ঘরবাড়ি। মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বসতঘর। সহায় সম্বল সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব তারা।
এমনই একজন সোনাগাজীর চরদরবেশ ইউনিয়নের সেনেরখীল গ্রামের বাসিন্দা পঙ্কু রানী। শুক্রবার প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় পঙ্কু রানীর। তিনি জানান, বন্যার পানি বাড়ার পর পরিবারের লোকজন নিয়ে পাশের কালীমন্দিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে পানি কমে যাওয়ায় ৩০ আগস্ট সকালে হাসিমুখে বাড়ি ফিরে দেখেন বসতঘর ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
উপজেলার চরসাহাভিকারী গ্রামের কৃষক নুর ইসলাম। বন্যার তার ঘরটা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে ছিল তার সাজানো-গোছানো একটি বাড়ি। আকস্মিক বন্যায় কোনো কিছু নিয়ে ঘর থেকে বের হতে পারেননি। ক্ষতি পুষিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর দুশ্চিন্তা এখন তার মাথায়।
আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফেরা উপজেলার বগাদানা ইউনিয়নের আলামপুর গ্রামের হাসিনা আক্তার বলেন, ‘হঠাৎ করে যখন বন্যার পানি বাড়তে শুরু করে, পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই নিয়া আসতে পারি নাই। পানি কমার খবর পাইয়া আসছি, এখন দেখি কিছুই আর নাই। পানি সব নিয়া গেছে। কেবল আমরাই বাঁইচা আসছি। কী কইমু, একেবারে নিঃস্ব হইয়া গেছি। ঘর, জিনিসপত্র সব ভাসাইয়া নিছে পানি। ঘরে যা ছিল তা পানিতে পইচা গেছে। পানি তো কমছে, কিন্তু আমার যে ক্ষতি অইল, তা তো কোনোভাবে পুষাইবো না।’
বন্যার আগে খামারে প্রায় ১৫ হাজার মুরগি ছিল আহম্মদপুর গ্রামের মনিরুল ইসলামের। নিজের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে দিশেহারা হয়ে তিনি বলেন, ‘৩০ দিন বয়সী মুরগির ওজন প্রায় এক কেজি করে হয়েছিল, কয়েক দিন পর বাজারে বিক্রি করার কথা। কিন্তু বন্যায় সব মুরগি পানিতে মারা গেছে। পুঁজি হারিয়ে এখন নিঃস্ব।’
কুমিল্লা আঞ্চলিক সংবাদদাতা জানান, জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বন্যায় ১৪টি উপজেলায় কৃষি খাতের পাশাপাশি ৩০৮ কোটি টাকা প্রাণিসম্পদের ক্ষতি হয়। জেলা জুড়ে ৪ হাজার ২১৩টি গবাদি পশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২ লাখ ৯ হাজার ৯১৪টি বিভিন্ন শ্রেণির গবাদি পশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাজার মূল্যে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ কোটি টাকার বেশি। তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত গরুর সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজার ৬২২টি, ১৬টি মহিষ, ৩০ হাজার ৮৯২টি ছাগল, ৬৯৩টি ভেড়া। মারা গেছে ৩৫টি গরু, তিনটি মহিষ, ১৭১টি ছাগল এবং সাতটি ভেড়া।
হাঁস-মুরগির মধ্যে ২ হাজার ২১৮টি খামারে ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ১৪৯টি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাজার মূল্যে যা ৩৯ কোটি টাকা। এসবের মধ্যে ২১ লাখ ৭ হাজার ৩৫৩টি মুরগি, ৩১ হাজার ৬৯৩টি হাঁস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৩৪২টি মুরগি এবং ২ হাজার ১৬০টি হাঁস। প্লাবিত হয়েছে ২ হাজার ১ দশমিক ৫ একর চারণভূমি। খাদ্যের মধ্যে ২ হাজার ৬০৩ টন পশুপাখির দানাদার খাদ্য বিনষ্ট হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা চন্দন কুমার পোদ্দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুমিল্লায় বন্যায় প্রাণিসম্পদে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। আমরা একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছি। বন্যার পানি নেমে গেলে সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে পরে জানানো হবে।’
এদিকে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও পার্শ¦বর্তী কুমিল্লা, ফেনী এবং নোয়াখালী জেলার প্রবাহিত বানের পানিতে পানিবন্দি হয়ে আছে চাঁদপুরের লক্ষাধিক মানুষ। গত এক সপ্তাহের অধিক সময় ধরে পানিবন্দি জীবন কাটছে শাহরাস্তি এবং কচুয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের।
বিশেষ করে শাহরাস্তি উপজেলার সূচিপাড়া উত্তর, সূচিপাড়া দক্ষিণ, চিতৌষী পূর্ব, চিতৌষী পশ্চিম, রায়শ্রী উত্তর-দক্ষিণ ইউনিয়ন এবং কচুয়া উপজেলার আশরাফুর ইউনিয়নের ভবানিপুর, সানন্দকড়া, রসুলপুর, পিপলকরার বাসিন্দারা এখনো পানিবন্দি জীবন কাটাচ্ছে। একই সঙ্গে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি। বিশেষ করে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে লোকজন খুবই বিপাকে রয়েছে।
এসব এলাকায় দুর্গত লোকদের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিছু সহায়তা দিলেও রান্নাবান্না করে খাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। শুরুতে পানিবন্দি লোকজন কিছু শুকনো খাবার পেলেও এখন চলছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।
পিপলকরা গ্রামের দুলাল মিয়া বলেন, ১০ দিন ধরে তাদের গ্রামের বহু বাড়িঘর পানির নিচে। গোয়ালঘর, টয়লেট এবং রান্নাঘরগুলোতে পানি উঠে যাওয়ায় চরম সংকটের মধ্যে রয়েছেন। কেউ কেউ উঁচু জায়গায় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে উঠলেও অনেকেই এখন পর্যন্ত পানির সঙ্গেই বসবাস করছেন।
রাজশ্রী গ্রামের আকলিমা বলেন, এক সপ্তাহ ধরে পানির নিচে তাদের বসতঘরটি। তারা পাশর্^বর্তী প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় নিলেও গবাদি পশু নিয়ে খুব বিপাকে রয়েছেন। খাবার সংকটে অনেকেই পানির দরে বিক্রি করে দিয়েছে গরু-ছাগল।
একই ইউনিয়নের দাদিয়াপাড়ার বাসিন্দা ফারহানা বলেন, বানের পানির কারণে তাদের রাস্তা তলিয়ে গেছে। তারা এখন মূল ইউনিয়নের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। প্রত্যেকটি ঘরে হাঁটুসমান পানি। খাবার রান্না করার পরিস্থিতি নেই। খুবই অসহায় অবস্থায় আছেন বলে জানান তারা।
শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইয়াসির আরাফাত জানান, বানের পানিতে এখন পর্যন্ত পানিবন্দি আছে ৫৫ হাজারের অধিক মানুষ। সাড়ে তিন হাজার লোক আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনও তাদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে।
কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এহসান মুরাদ জানান, পানিবন্দি এলাকায় ইতিমধ্যে কিছু লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। তাদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।