২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর গুমের শিকার হন আবদুল কাদের মাসুম। মোবাইল ফোনে শেষবারের মতো মাসুমের সঙ্গে হওয়া কথা এখনো কানে বাজে মা আয়শা বেগমের। ২৩ সেকেন্ডের ওই কথোপকথনে আয়শা বেগমকে কল করে মাসুম বলেছিলেন, ‘মা আমি মাসুম, আমি ভালো নেই। আমাকে ওরা মারধর করছে।’ এ কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ছেলের শেষবারের মতো বলা কথাগুলো এখনো কাঁদায় আয়শা বেগমকে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশ আবার স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু আমার ছেলে এখনো ঘরে ফেরেনি। আমার ছেলে মাসুমের জন্য কি দেশ স্বাধীন হয়নি?’ এ কথাগুলো বলে অঝোরে কাঁদতে থাকেন আয়শা বেগম। ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে তার দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে।
মানববন্ধন কর্মসূচির একটি অংশে ছেলের ছবি হাতে নিয়ে বসেছিলেন আয়শা বেগম। তিনি জানান, মাসুম ২০১৩ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল। ওই সময় সে সেনাবাহিনীর কমিশন র্যাংকে পরীক্ষা দেয় ও লিখিত পরীক্ষায় পাস করে। কয়েক দিন পরই ভাইভা ছিল। তার মধ্যেই ভাটারা থানা এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়। ১২ দিন পর ১৬ ডিসেম্বর একটি অচেনা নম্বর থেকে কল করে মাসুম। সেই দিনটি ছিল তার জন্মদিন। প্রায় ১১ বছর পার হয়ে যাচ্ছে, এখনো মাসুমের কোনো খবর নেই। শুধু মাসুম নন, ওই সময় তার সঙ্গে থাকা আল-আমিন, রাসেল, আদনান, সুমনসহ ছয়জন গুমের শিকার হন। তাদেরও খোঁজ নেই।
২০১৩ সালে গুমের শিকার হন রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন। তিনি যখন গুম হন তখন বড় মেয়ে হাফসা চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। আর ছোট মেয়ে আরওয়ার বয়স তখন দেড় বছর। হাফসা এখন স্নাতক প্রথম বর্ষের, আরওয়া ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে। হাফসা ও তার ছোট বোন আরওয়া এ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
হাফসা বলেন, ‘বাবার কথা আমার কিছুটা মনে আছে। কিন্তু আমার ছোট বোন আরওয়া (আরওয়া ইসলাম) এখনো বাবার জন্য কাঁদে, বাবার ছবি দেখেই বড় হয়েছে ও। বাবার সঙ্গে কোনো স্মৃতি নেই ওর। আমার বাবা বিএনপি করত বলে তাকে গুম করা হয়েছে। তার কোনো হদিস নেই। বাবার হত্যার বিচার চাই। আমার বাবাকে গুম করার পেছনে যারা জড়িত তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের মাধ্যমে বিচার করতে হবে। এটাই আমাদের চাওয়া।’
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে। হাফসা ও তার ছোট বোন আরওয়া এ কর্মসূচিতে অংশ নেয়। সেখানেই দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা হয় হাফসার। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলা এ কর্মসূচিতে মানবাধিকারকর্মী, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। এতে ৩০ জনেরও বেশি অংশগ্রহণকারী ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার পক্ষে কথা বলেন। তাদের অনেকের হাতে ছিল নিখোঁজ স্বজনের ছবি।
মায়ের ডাক সংগঠনটির সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যান। অবশিষ্ট অপশক্তি এখনো দেশে অবস্থান করছে। কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের তথ্যগুলো এখনো পরিবারের কাছে আসছে না।’
বিভিন্ন সময়ে বিরোধী মতের ব্যক্তিদের গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। নিখোঁজ অনেকেই ফিরে এসে ‘আয়নাঘর’ নামে গোপন কারাগারে বন্দি ছিলেন বলে দাবি করেছেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে এখনো চুপ আছে উল্লেখ করে দ্রুত এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণাসহ শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন অতীতকে স্মরণ করে ভবিষ্যৎ গড়তে হবে। কল্পনাও করা যাবে না, গত সরকারের অধীনে পুলিশ কতটা অমানবিক ছিল। আমি ২৩ ঘণ্টা গুম ছিলাম, দুই মাস জেলে ছিলাম। সে সময় এমন অনেক ঘটনা দেখেছি, সেগুলো লিখলে বিরাট এক বই হয়ে যাবে। গুম নিয়ে মায়ের ডাকসহ অনেকেই তালিকা তৈরি করেছে। তার ৯৫ শতাংশের মতো সঠিক। তবে শতভাগ সঠিক করতে পারবেন কি না জানি না।’
মান্না আরও বলেন, ‘গত জুলাইয়ে কত মানুষ মারা গেছে? হয়তো হাজারেরও বেশি। আমরা বলতে চাই, তাদের হত্যার বিচার করতে হবে। যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের কাছে আমাদের যেতে হবে, সরকারকে যেতে হবে। আমরা যে মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাচ্ছি, সে বাংলাদেশে সব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে দীর্ঘদিন আটকে থাকার পর ফিরে আসা মাইকেল চাকমা বলেন, ‘২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল ঢাকার কল্যাণপুর থেকে আমাকে সাদা পোশাকধারী সাতজন উঠিয়ে নিয়ে যায়। শেখ হাসিনার পতনের পর আমাকে আমার এলাকার একটি জায়গায় ছেড়ে দিয়ে আসে। সেখান থেকে আমি বহু কষ্টে বাড়ি পৌঁছি। শেখ হাসিনা এই গুমের মাধ্যমে আমাদের এ ভয় দেখিয়েছিলেন। সরকার ইচ্ছা করলে মাসের পর মাস গুম করে রাখতে পারে। আমরা সব গুম-খুনের ন্যায়বিচার চাই। এখানে যারা কান্না করছে, তাদের কষ্ট আমি বুঝি। দেশে আয়নাঘর নামে যেসব বন্দিশালা আছে, এগুলো বন্ধ করতে হবে। লেখক-কবি-শিল্পীরাসহ সবাই এসবের বিরুদ্ধে না দাঁড়ালে তা বন্ধ হবে না।’
গুমের শিকার সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান বলেন, ‘২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর আমাকে বন্দুক তাক করে গুম করা হয়েছিল। পরে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে মিটিং করেছি, কীভাবে তাদের সহায়তা করা যায়। আমরা চাই, এই অন্তর্বর্তী সরকার যে কমিশন করেছে, তাদের মাধ্যমে সব গুমের দ্রুত বিচার করতে হবে।’
গুম হওয়া ইসমাইল হোসেনের মেয়ে আনিকা ইসলাম ইশা বলেন, ‘আমার বাবাকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। আমার ছোট ভাই প্রতিদিন আশায় থাকে বাবা ফিরবে বলে। মাঝেমধ্যে সে প্রশ্ন করে, বাবা কেন আসে না? আমরা বাবাকে হারিয়ে অসহায়, আমার বাবাকে ফেরত চাই, আমার ভাইয়ের প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই। আমার বাবার কী হয়েছে জানতে চাই।’
গুমের শিকার কাউসার হোসেনের মেয়ে লামিয়া বলেন, ‘২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর আমার বাবাকে গুম করা হয়েছে। আমি তখন ছোট, আমার বাবার কথা আমার মনে নেই। আজও বাবার আদর পাইনি। বাবাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। বাবাকে আমি ছুঁতে চাই, বাবার আদর কেমন জানতে চাই। আমি ১১ বছর রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাবাকে ফেরত চেয়েছি। আমার একটাই দাবি, আমার বাবাকে ফেরত দেওয়া হোক।’
অনুষ্ঠানে মানবাধিকারকর্মী সাইয়েদ আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের অনেক মানবাধিকার সংগঠন, কিন্তু এগুলো শুধু লিখিত ও নামসর্বস্ব। এখানে এসে যেসব বাচ্চা কান্না করল, তাদের হাসি ফিরিয়ে দিতে না পারলে আমাদের এগুলো ব্যর্থ।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, ‘গুম শব্দ আইনে নেই বলে বিচার করা যাবে না, এটা সঠিক নয়। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের মুখ বন্ধ ছিল। আদালত এ ব্যাপারে নীরবতা পালন করেছে। কোনো হস্তক্ষেপ আমরা দেখিনি।’
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা সাইফুল হক বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদে সই করেছেন, এজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। গুমের সঙ্গে জড়িতদের যেন আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হয়। গুম হওয়া ব্যক্তিদের যেন তাদের পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়।’