সন্তান দুই কিন্তু ওয়ারিশ সনদে ৮!

নগরের কুলগাঁও এলাকায় বাস-ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা ৭ শতক জমির ক্ষতিপূরণের ২ কোটি টাকা আত্মসাতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) দুই নম্বর ওয়ার্ডের (জালালাবাদ) কাউন্সিলর মো. সাহেদ ইকবাল বাবুর বিরুদ্ধে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ ইস্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কাউন্সিলর সাহেদ ইকবাল এবং জমিটির কথিত ৮ জন ওয়ারিশসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করা ফৌজদারি অভিযোগের তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) মেট্রো শাখা। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক হুমায়ুন কবীর তদন্তাধীন বিষয়ে মুখ না খুললেও ওয়ারিশ সনদ কারসাজিতে কাউন্সিলর বাবুর সম্পৃক্ততার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। শিগগিরই তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হবে বলে পিবিআইয়ের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে। গত বছরের ১ জানুয়ারি দেলোয়ার হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

বাদীর অভিযোগ, স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে ২০০০ সালে মারা যান তার বাবা কুলগাঁও বালুছড়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন। ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল মোহাম্মদ হোসেনের নামের সঙ্গে আবুল হাশেম নামে অন্য এক ব্যক্তির নাম যুক্ত করে মোহাম্মদ হোসেন ওরফে আবুল হাশেম নাম দিয়ে তার কথিত ৮ ওয়ারিশের নামে সনদ ইস্যু করেন কাউন্সিলর সাহেদ। যদিও ওই ওয়ার্ডের আগের দুজন কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনের স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে ওয়ারিশ আছে মর্মে পৃথক দুটি সনদ দেন। কাউন্সিলর সাহেদ নিজেও বাদীকে দুই দফায় অভিন্ন (প্রয়াত মোহাম্মদ হোসেনের স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে ওয়ারিশ) ওয়ারিশ সনদ দেন।

মামলার তদন্ত তদারক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কের পাশে বাস-ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে কুলগাঁও মৌজায় বাস-ট্রাক টার্মিনাল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর ‘ম্যাচিং ফান্ড’র শর্ত ছাড়াই বাস-ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণসহ সড়ক উন্নয়নে এক হাজার ২২৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়। ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাছে জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের সংস্থা নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ও সিডিএর অনাপত্তিপত্রসহ ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ১৩০ কোটি টাকা জমা দেয় চসিক। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের অনুমোদন দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়।

সূত্রটি আরও জানায়, কাউন্সিলর সাহেদ ইকবাল বাবুর ইস্যু করা ‘ভুয়া’ ওয়ারিশ সনদ ব্যবহার করে মোহাম্মদ হানিফ (আসামি) নামে এক ব্যক্তির কাছে বাদীর মালিকানাধীন ৭ শতক জমি নামজারি (৫৭৪৩) করে দুটি পৃথক ‘ভুয়া’ দলিলে বিক্রি করে দেন কথিত ওয়ারিশ আসামি নুরুল ইসলাম ও তার বোন নূর বেগম। এর মধ্যে সদর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে ১৭০৩৪ নম্বর দলিল নিবন্ধন হয় ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর। আর ৫১৫ নম্বর দলিল নিবন্ধন হয় ২০১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি।

ওই দুটি ‘জাল দলিল’ বাতিলের আদেশ চেয়ে গত মাসে চট্টগ্রাম তৃতীয় যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলা (১৭৭/২৪) করেছেন দেলোয়ার হোসেন। আগামী ১৫ অক্টোবর এই মামলার শুনানির দিন নির্ধারিত আছে বলে জানা গেছে।

বাদী দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘ক্ষতিপূরণের ২ কোটি ১১ লাখ টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে কাউন্সিলর সাহেদ ইকবাল বাবুসহ অন্য আসামিরা পরস্পর যোগসাজশ করে জাল ওয়ারিশ সনদ তৈরি করেছেন। আটজনকে আমার বাবার কথিত ওয়ারিশ দেখানো হয়েছে। অথচ আমার মায়ের নাম অলিজান খাতুন। ২ থেকে ৮ নম্বর আসামির মায়ের নাম মাছুমা খাতুন।’

জানা গেছে, বাস-ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের জন্য এল এ মামলা (২৭/২০২০-২০২১) মূলে কুলগাঁও মৌজার অধীন মোহাম্মদ হোসেনের মালিকানাধীন বিএস ১১৯৮ দাগে ৮ দশমিক ১০ একর ভিটি ভূমি অধিগ্রহণ করে সরকার। জমির ক্ষতিপূরণ এসেছে ২ কোটি ১১ লাখ ২৬ হাজার ৫৫৬ টাকা।

নামজারি খতিয়ানের সূত্র ধরে ২০২৩ সালের ১২ মার্চ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন আসামি মোহাম্মদ হানিফকে ৮ (৩) ধারার নোটিস দেওয়ার পর বিষয়টি জানতে পারেন বাদী দেলোয়ার হোসেন। এরপর আদালতে কাউন্সিলর সাহেদ ইকবাল বাবুসহ ১৬ জনকে আসামি করে ফৌজদারি অভিযাগ দেন। জানা গেছে, কুলগাঁও মৌজার অধীন মূল বিএস খতিয়ানে (১৩৯৪) বিএস ১১৯৮ দাগে ৭ শতক জমি দুলা মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ হোসেনের (বাদীর বাবা) নামে চূড়ান্ত প্রচার আছে। কিন্তু আসামিরা ওয়ারিশ সনদ কারসাজি করে ২০১৯ সালের ১৪ মার্চ এবং ২০২২ সালের ২১ মার্চ হাটহাজারী এসি ল্যান্ড দপ্তরে পৃথক নামজারি জমাভাগ মামলা মূলে ৫৯৫১, ৬৭০১ নামজারি খতিয়ান সৃষ্টি করেন। এনআইডির তথ্য অনুযায়ী, মামলার ২-৮ নম্বর আসামির বাবার নাম মৃত আবুল হাশেম। মায়ের নাম মাছুমা খাতুন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুয়ায়ী আসামির কারও রেকর্ডপত্রে তাদের বাবা মোহাম্মদ হোসেন ওরফে আবুল হাশেম লেখা নেই। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কাউন্সিলর সাহেদ ইকবাল বাবুর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে কল করার কারণ জানিয়ে এই প্রতিবেদক বার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি তিনি।