দেশ রূপান্তর : অন্তর্বর্তী সরকারকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এখন পর্যন্ত তাদের কর্মকাণ্ডে আপনি সন্তুষ্ট কি?
জিএম কাদের : ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়ে দেশকে উদ্ধার করেছে। তাদের আন্দোলনে শুরু থেকেই আমার সমর্থন ছিল। আমি তাদের অভিবাদন জানাই। এখন পর্যন্ত ছাত্ররা যেসব কাজ করছে, তার প্রশংসা না করে উপায় নেই। তারা যেভাবে রাস্তায় নেমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করেছে, পুলিশ না থাকার পরও তারা নিরাপত্তা রক্ষার কাজ করেছে, তা অন্য যেকোনো দেশের জন্য অনুকরণীয়। শেখ হাসিনার পতনের পর দেশ পরিচালনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে সব সময় আমার সজ্জন মানুষ মনে হয়। তিনি বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আমার বিশ্বাস যেটুকু সংস্কার করা দরকার, তা তিনি পারবেন।
দেশ রূপান্তর : সরকারকে নির্বাচন আয়োজনে জাপা সময়সীমা বেঁধে দেবে কি না?
জিএম কাদের : রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আলাপ-আলোচনা ইতিবাচকভাবে চলছে। এ সরকার যেহেতু একটা বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। যে ধরনের সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, তাতে সরকারের একটু সময় প্রয়োজন হবে, জাপা সরকারকে সেই সময়টুকু দিতে চায়। আমরা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিতে চাই না, কেননা আমার মনে হয় সরকার জনগণের দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তারা সঠিক সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেবে বলে আমার আশা।
দেশ রূপান্তর : সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হচ্ছে। সংবিধান কতটুকু সংশোধন করা দরকার, তার কোনো স্টাডি করেছেন আপনারা?
জিএম কাদের : বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে সব ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত। এটার অবসান হওয়া প্রয়োজন। আমাদের সংবিধানে পরিবর্তনের বিকল্প নেই। এখন সংবিধান পরিবর্তন, নাকি পুরোপুরি বাতিল করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আমরা মনে করি, পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে দিলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বিগত সরকারগুলো নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে, গণতন্ত্র ও নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কুক্ষিগত করেছে, দলীয়করণের ফলে সব প্রতিষ্ঠান ভেঙে গেছে। বর্তমান সংবিধান রেখেই কিন্তু এসব জায়গায় সংস্কার সম্ভব। সংবিধান পুরোপুরি বাতিল করতে হলে কিছু সমস্যা আছে, আমার মনে হয় আরও আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দেশ রূপান্তর : সংখ্যানুপাতিক আসন নিয়ে আপনাদের মত কী?
জিএম কাদের : আমি দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যানুপাতিক আসনবিন্যাস নিয়ে কথা বলছি। দেখুন, আমরা যদি ৯৬, ০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যায়, মোটাদাগে নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও অবাধ ছিল। কিন্তু জনগণের বিপুল রায়ে সিংহভাগ আসন নিয়ে যারা সরকার পরিচালনায় গেল, সেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। বর্তমান অবস্থায় দেশের রাজনীতি দ্বিদলীয় বৃত্তে আটকে গেছে। বিশ্বের খুব কম দেশেই এমন ব্যবস্থা আছে। আমরা যদি সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থায় যাই, তাহলে সব রাজনৈতিক দল প্রাপ্ত ভোট অনুযায়ী সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। জাতীয় সংসদ হয়ে উঠবে সর্বদলীয়।
দেশ রূপান্তর : পরপর দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রিত্ব নয়, নাকি দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রিত্ব নয় জাতীয় পার্টির অবস্থান কোনটা?
জিএম কাদের : আমেরিকা ও ইউরোপের বেশিরভাগ দেশেই একজন ব্যক্তি দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না। আমরা মনে করি, পরপর হোক কিংবা আলাদা আলাদা সময়ে দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা যাবে না।
দেশ রূপান্তর : আপনারা ১৫ বছর আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিভিন্নভাবে ছিলেন। আওয়ামী লীগ পলাতক অথচ আপনারা রাজনীতি করে যাচ্ছেন, এটা কীভাবে সম্ভব হলো?
জিএম কাদের : আওয়ামী লীগ সীমাহীন দুঃশাসন করেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। তারা দেশটাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, ফলে পতন নিশ্চিত ছিল। কিন্তু জাতীয় পার্টি জনগণের বিপক্ষে দাঁড়ায়নি, দেশের টাকা লুট করেনি, যতটা পেরেছে দেশ ও জনগণের পক্ষে কথা বলেছে। যার যে কর্মফল, তাকে তা ভোগ করতে হয়।
দেশ রূপান্তর : ১৫ বছরে জাতীয় পার্টি যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি। সবশেষ সংসদ নির্বাচনে জাপা অংশ না নিলে আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচন করা কঠিন হতো। মাত্র আট মাসে সংসদ ভেঙে গেল, এ নিয়ে কোনো দুঃখবোধ আছে কি?
জিএম কাদের : আমি দীর্ঘদিন ধরেই নানাভাবে নানা জায়গায় নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে কথা বলেছিলাম। ফলে আওয়ামী লীগ সরকার আমাকে ও জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে নিয়ে যেতে নানা ফন্দি আঁটে। তারা জাপার চেয়ারম্যান পদে অন্য কাউকে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। দলের ভেতর থেকে একটা অংশ নির্বাচনে যেতে উদগ্রীব ছিল। আমি নির্বাচনে না গেলেও জাপার নামে অন্য কাউকে নির্বাচনে নিয়ে যেত। দল রক্ষার স্বার্থে আমাকে নিজের সঙ্গে আপস করে নির্বাচনে যেতে হয়েছে। ২০১৪ সালে জাপা নির্বাচনে যেতে চায়নি, আমাদের চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে জিম্মি করে রাখা হয়। সেই নির্বাচনে আমি অংশ নিইনি। ক্ষমতার লোভ আমার নেই। সংসদ ভেঙে যাওয়ায় আমাদের মনে কোনো দুঃখবোধ নেই, বরং আমরা খুশি হয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতির একটা পরিবর্তনের কথা আমরা বলছিলাম, এবার সত্যিকারের সে পরিবর্তন এসেছে।
দেশ রূপান্তর : জাপাকে জোর করে নির্বাচনে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ আপনারা করে আসছেন। খোলাসা করে বলবেন কি, কী পরিস্থিতিতে আপনারা নির্বাচনে গিয়েছিলেন?
জিএম কাদের : ১৭ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। আগের রাতে আমি আমার বিশ্বস্ত দুই নেতার কাছে নির্বাচন থেকে প্রত্যাহারের চিঠি প্রস্তুত করে দিয়েছিলাম। তারা যেন আমার নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই চিঠি নির্বাচন কমিশনে দাখিল করে। কিন্তু পরদিন সকাল থেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয় গোয়েন্দা সংস্থা, র্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘিরে ফেলে। তারা আমাকে নানাভাবে প্রেসারাইজড করে নির্বাচনে নিয়ে যায়। তখন এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, আমি নির্বাচনের বাইরে থাকলে নানা সমস্যা হবে, অনেকটা জোর করেই আমাকে নির্বাচনে নিয়ে যাওয়া হয়।
দেশ রূপান্তর : শেখ হাসিনা স্বৈরাচার তকমা নিয়ে দেশ ছেড়ে পালালেন। ফলে এখন মানুষ আর জাপা প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে স্বৈরাচার বলবে না। এটা কি জাপাকে স্বস্তি দেয়?
জিএম কাদের : এরশাদ সাহেব স্বৈরাচার ছিলেন না। এর বড় প্রমাণ ক্ষমতা থেকে নামার পরও তাকে কখনো নির্বাচনে হারতে হয়নি। ক্ষমতা থেকে নামার পর যে নির্বাচন হয়, সেখানে তিনি পাঁচটি আসনে লড়াই করে বাজিমাত করেন, যা প্রমাণ দেয় মানুষ এরশাদ সাহেবকে ভালোবাসত। এরশাদ সাহেব যত দিন বেঁচে ছিলেন, জনগণ তাকে ভালোবাসা দিয়েছে, সমর্থন দিয়েছে। তার মৃত্যুর পর জানাজায় লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে, যা শুধু সত্যিকারের রাজনীতিকের বেলায় ঘটে। মৃত্যুর পরও তার প্রতি মানুষের আবেগ শেষ হয়ে যায়নি। এখন তো মানুষ প্রকাশ্যেই বলে, এরশাদ জমানায় ভালো ছিলাম। দেখুন, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন আর এরশাদ সাহেব দেশে থেকে লড়াই করেছেন। এটা শুধু নৈতিক ভিত্তি থাকলেই সম্ভব। তবে এটা সত্য, তিনি দেশ ছেড়ে আমাদের স্বৈরাচারের তকমা থেকে মুক্তি দিয়েছেন।
দেশ রূপান্তর : শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন?
জিএম কাদের : জুলাই-আগস্ট মাসে একটি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতা টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনীতিতে ইতি টেনেছেন বলেই আমার অভিমত। তিনি পালিয়ে যাওয়ার কারণে নিজ দলেই গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ একসময় জনগণের দল থাকলেও, ক্ষমতার মোহে তারা অন্ধ হয়ে জনশত্রুতে পরিণত হয়েছে। তবে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়াবে, যদিও সময় লাগবে।
দেশ রূপান্তর : রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের কারণে সজ্জন ব্যক্তিরা বেকায়দায় পড়েছেন। দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির অবসান হবে কি?
জিএম কাদের : ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলে এখন একটা পরিবর্তন এসেছে। অপরাজনীতি বন্ধ করে সু-রাজনীতি চালু করার এটা ভালো সময়। দেখুন আমাদের দেশে যেকোনো নেতাকে একটা প্রশ্ন শুনতে হয়, আপনি কতবার জেল খেটেছেন? এমন একটা ধারণা দেশে চলছে যে, যত বেশি জেল খাটেন, তিনি তত বড় নেতা। দুনিয়ার কোথাও রাজনীতি করার কারণে জেল খাটতে হয় না। অথচ আমাদের দেশে কোনো অপরাধ না করে শুধু রাজনীতি করার কারণে দিনের পর দিন জেল খাটতে হয়। দেশে রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যে দুর্বৃত্তায়ন চলে আসছিল, আমি মনে করি, এখন সেই রাজনীতি বন্ধ হবে। পেশিশক্তি ও ব্যবসায়িক শক্তির বাইরে যারা সত্যিকারের রাজনীতিক, যারা শুধু দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে চান, জনগণের কথা চিন্তা করেন, এখন তাদের জন্য রাজনীতি করার একটা উপযুক্ত সময়।
দেশ রূপান্তর : জাপা কখনো স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার সুযোগ পায়নি। চলমান পরিবর্তন কি সেই সুযোগ করে দিল?
জিএম কাদের : আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সব সময় জাপাকে জিম্মি করার রাজনীতি করেছে। মিথ্যা মামলা, হয়রানি ও হস্তক্ষেপের কারণে আমরা কখনো নিজেদের মতো পরিচালিত হতে পারিনি। এবার আল্লাহ আমাদের সামনে একটা সুযোগ দিয়েছেন স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার।
দেশ রূপান্তর : জাপা ইসলামপন্থি রাজনীতি করে, তাহলে বিএনপিও জামায়াতের সঙ্গে না গিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কেন জোট করল?
জিএম কাদের : বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ধর্মীয় পরিচয় কাজে লাগিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা করে। ধর্মীয় যে ভোটব্যাংক তা তাদের দখলে রাখার চেষ্টা করে। আমাদের দল ক্ষমতায় থাকার সময় অন্য কোনো দলের প্রতি বৈষম্য করেনি। আমরা ইসলামের পক্ষে অনেক কাজ করেছিলাম, যা আজও মানুষ মনে রেখেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সেক্যুলার রাজনীতির কথা মুখে মুখে বলে। বিএনপি ও জামায়াতের বিপক্ষে যে ধর্মীয় ভোটব্যাংক আছে, তা জাপার দিকে ঝুঁকবে বলেই আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গেই জোট করি।