ভাড়া কমানোর সুযোগ নেই

বিশ্ববাজারের সঙ্গে ‘সামঞ্জস্য রেখে’ জ্বালানির নতুন দাম নির্ধারণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ দফায় পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ৬ টাকা কমানো হয়েছে। অপরদিকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি কমেছে ১ টাকা ২৫ পয়সা। ফলে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অকটেনের দাম ১৩১ টাকা থেকে কমে ১২৫, পেট্রোলের দাম ১২৭ টাকা থেকে কমে ১২১ এবং ডিজেলের দাম ১০৬ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে কমে ১০৫ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে পরের বছর আগস্ট পর্যন্ত তিন দফা দাম সমন্বয় হয় জ্বালানির। সে সময় রাজধানীসহ সব মহানগরের জন্য ভাড়া বাড়ানো হয় কিলোমিটারে ৩৫ পয়সা। বর্তমানে প্রতি কিলোমিটার বাসে চলাচলের জন্য মহানগরবাসীকে গুনতে হয় আড়াই টাকা। এবার জ্বালানির দাম কমার পরিপ্রেক্ষিতে বাস ভাড়া কমানোর দাবি রয়েছে। যাত্রীদের দাবি, আগেও জ্বালানির দাম কমার পর গণপরিবহনের ভাড়া সমন্বয় করা হয়নি। আগেরবার জ্বালানির দাম কমানোর পর ভাড়া যেটা কমানো হয়েছে সেটা কোনো বাসেই কার্যকর হয়নি। জ্বালানির দাম কমলে গণপরিবহন কিংবা ব্যক্তিগত যানের ভাড়া কমাতে হবে বলে অনেকের ধারণা। তবে এটি একটি সরলীকৃত ধারণা এবং এর পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিকতা নেই। ভাড়া নির্ধারণ একটি বহুমুখী প্রক্রিয়া, যা জ্বালানির দামের ওপর নির্ভরশীল হলেও, এর সঙ্গে আরও অনেক বিষয় জড়িত রয়েছে।

স্বাভাবিক অবস্থায় সবমিলিয়ে আপনার দৈনন্দিন খরচ কত? এই আপনি কিন্তু অবশ্যই একক নন। হতে পারেন কোনো ব্যবসায়ী। যে মানুষ গড়ে ১০০ মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত সেটা হোক পরিবহন, ভোগ্যপণ্য, টেক্সটাইল অথবা অন্য যেকোনো খাত। এখন আপনি কিন্তু নির্ভর করছেন সমাজ এবং সরকারের কিছু দৃশ্য-অদৃশ্য ক্ষমতার ওপর। যদি আপনার ব্যবসাকে নিয়মিত রাখতে চান, তাহলে সেই গোষ্ঠীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে। এর ফলে তাদের সন্তুষ্ট করেই আপনাকে চলতে হবে। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো, যা জ্বালানির দাম কমলেও কেন ভাড়া বা অন্যান্য পণ্যমূল্য কমানো সম্ভব নয় তা কিছুটা হলেও, পরিষ্কার হবে।

১. বর্ধিত খরচ এবং মূল্যস্ফীতি : পরিবহন খাতে জ্বালানির দাম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও এটি একমাত্র উপাদান নয়। যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, চালকদের বেতন, যন্ত্রপাতি পরিবর্তন, বীমা, রোড ট্যাক্স, পার্কিং খরচ, গাড়ির চাকা, লুব্রিকেন্ট ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের ব্যয়সহ নানান বিষয়ে ভাড়ার ওপর প্রভাব ফেলে। জ্বালানির দাম সাময়িকভাবে কমতে পারে, তবে এ ধরনের অন্য খরচগুলো স্থির বা বাড়তে থাকে। জ্বালানির দামের পতনের কারণে ভাড়া কমানো হলে এ ধরনের খরচের যে চাপ থাকে তা পূরণ করা সম্ভব হয় না।  মূল্যস্ফীতি বা বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যাতায়াত খরচও বেড়ে যায়। চালকদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন হয়ে যায়, যন্ত্রাংশের দাম বাড়ে এবং অন্যান্য খরচ বেড়ে যায়। এতে করে পরিবহন সংস্থাগুলো ভাড়া কমানোর পরিবর্তে স্থিতিশীল রাখতে বাধ্য হয়।

২. চাহিদা ও সরবরাহের অর্থনীতি : বাজার অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, চাহিদা ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে ভাড়ার পরিবর্তন ঘটে। জ্বালানির দাম কমলেও যদি কোনো রুটে যাত্রী সংখ্যা বেশি হয়, তবে সেই রুটের ভাড়া কমানো হবে না। উদাহরণস্বরূপ, শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় বা অফিস টাইমে যেখানে যাত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি, সেখানে জ্বালানির দাম কমলেও পরিবহন সংস্থাগুলো ভাড়া কমাবে না। কারণ, সেই সময়ে যাত্রীদের কাছে ভাড়া কমানোর চেয়ে যানবাহনের প্রাপ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৩. কর এবং লাইসেন্স খরচ : প্রতিটি পরিবহন সংস্থার জন্য বিভিন্ন ধরনের কর এবং লাইসেন্স ফি রয়েছে, যা বছরে বা মাসে পরিশোধ করতে হয়। সড়ক কর, যানবাহনের লাইসেন্স ফি, রুট পারমিটের ফি ইত্যাদি খরচ বহন করাও ভাড়ার হিসাবের মধ্যে পড়ে। জ্বালানির দাম কমলেও এই খরচগুলো কমে না। ফলে এসব খরচ পূরণের জন্য ভাড়া একই রাখতে হয়।

৪. সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় : গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ একটি চলমান প্রক্রিয়া। জ্বালানির দাম কমলেও, গাড়ির টায়ার পরিবর্তন, ব্রেকের সমস্যা, ব্যাটারি পরিবর্তন, ইঞ্জিন সার্ভিসিং এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশের খরচ একই থেকে যায় বা বাড়ে। উপরন্তু যেহেতু যানবাহনের মাইলেজ বা আয়ুষ্কাল নির্ভর করে রক্ষণাবেক্ষণের ওপর, তাই পরিবহন সংস্থাগুলো এই ধরনের খরচ কমাতে পারে না।

৫. সরকারি ভর্তুকি ও নিয়ন্ত্রণ : অনেক দেশে গণপরিবহন ব্যবস্থায় সরকার বিভিন্ন সময় ভর্তুকি বা ট্যাক্স সুবিধা প্রদান করে। জ্বালানির দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে ভর্তুকির এই সুবিধাগুলোও পরিবর্তিত হতে পারে। এ ছাড়া জ্বালানির দামের নিয়ন্ত্রণও অনেক সময় সরকারের হাতে থাকে, যেখানে মূল্য পরিবর্তন মানেই পরিবহন মালিকদের জন্য অতিরিক্ত মুনাফা নয়। এসব পরিবর্তন পরোক্ষভাবে ভাড়া নির্ধারণের ওপর প্রভাব ফেলে।

৬. ভবিষ্যতের মূল্য বৃদ্ধি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা : জ্বালানির বাজারে দামের ওঠানামা স্বাভাবিক ঘটনা। আজ জ্বালানির দাম কমলেও আগামীতে তা বেড়ে যেতে পারে। পরিবহন সংস্থাগুলো এ ধরনের অস্থিরতার ঝুঁকি এড়াতে চায়। জ্বালানির দাম কমলেও তারা সঙ্গে সঙ্গে ভাড়া কমায় না। কারণ ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম আবার বেড়ে গেলে ভাড়া পুনরায় বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। সুতরাং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য তারা ভাড়া স্থির রাখে।

৭. পরিবহন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা : একটি সুস্থ এবং কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণ করতে হলে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ভাড়া বারবার পরিবর্তন করলে যাত্রীদের জন্যও তা অসুবিধাজনক হতে পারে। পরিবহন মালিকরা একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থা বজায় রাখতে চান, যাতে তারা যাত্রীদের আস্থা অর্জন করতে পারেন এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।

 ৮. মালিকদের লাভের বিষয় : পরিবহন মালিকদের নিজেদের লাভের হিসাবও ভাড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানির দাম কমে গেলে মালিকরা সেটিকে নিজেদের লাভ হিসেবে রাখেন। এটি কোনো নৈতিক বিষয় নয়, বরং তারা তাদের ব্যবসার পরিসর বাড়ানোর জন্য এভাবে খরচ সাশ্রয় করেন।

৯. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব : অনেক সময় পরিবহন খাতের ভাড়া শুধু অর্থনৈতিক কারণে নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণেও স্থির থাকে। কিছু দেশে বা শহরে ভাড়া কমালে মানুষের কাছে তা একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা মনে করতে পারে যে, সেবার মান হয়তো কমেছে।

১০. দূরদর্শী পরিকল্পনা : পরিবহন খাতে অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হয়। এই পরিকল্পনাগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থ বিনিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়। জ্বালানির দাম কমলেও এ ধরনের প্রকল্পগুলোর জন্য অতিরিক্ত তহবিল সংগ্রহ করতে হয়, যা ভাড়া স্থির রাখার একটি কারণ।

পরিশেষে : সার্বিকভাবে বলা যায়, জ্বালানির দাম কমা মানেই ভাড়া কমানো উচিত এই ধারণাটি সরলীকৃত এবং বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। জ্বালানির দাম শুধু একটি উপাদান, যা ভাড়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। কিন্তু অন্যান্য অনেক উপাদান রয়েছে, যা ভাড়া এবং পণ্যমূল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নীতিগত কারণগুলোর আলোকে, গণপরিবহন বা ব্যক্তিগত পরিবহন খাতের ভাড়া নির্ধারণ একটি জটিল প্রক্রিয়া। যা শুধু জ্বালানির দামের ওপর নির্ভরশীল নয়। অতএব, জ্বালানির দাম কমলেও চলমান ভাড়া বা পণ্যমূল্য কমানোর কোনো সরল যুক্তি নেই। যদি সত্যিকার অর্থেই সবকিছুর দাম কমাতে হয়, তাহলে প্রথমেই সর্বস্তরে দুর্নীতি দূর করে প্রশাসনে পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

লেখকঃ টেক্সটাইল ব্যবসায়ী ও কলাম লেখক

 joyiqbal@gmail.com