জনতুষ্টিবাদ ও বুদ্ধিজীবিতার মধ্যে সংঘাত

গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের শাসন। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা শাসনব্যবস্থায় ফুটে উঠবে সেটাই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। গণতন্ত্রের শত-সহস্র ইতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও একে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র’ বলে থাকেন। এ ধরনের সমালোচনার যে কোনো ভিত্তি নেই তা সহজেই বলা যাবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমরা দেখি, গণতন্ত্রের নামে মানবাধিকারের মৌলিক বিষয়গুলোকে অবজ্ঞা করা হয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে নিগৃহীত করা হয়। আজকের যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আমরা সবচেয়ে কাক্সিক্ষত শাসনব্যবস্থা হিসেবে দেখি, তার সূচনার একটা প্রেক্ষাপট আছে। সেটা হচ্ছে, ঔপনিবেশিক প্রভু ও সামন্তবাদের বিপরীতে গিয়ে একটি ন্যায্য ও সাম্য শাসনব্যবস্থা কায়েম করার জন-আকাক্সক্ষা। ঔপনিবেশিক ও সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল বিষয়ই ছিল নিপীড়ন, শোষণ, নিষ্পেষণ, ভয়ের সংস্কৃতি, রাষ্ট্রযন্ত্রের একচ্ছত্র ক্ষমতা ও বল প্রয়োগ। যেটা আবার করা হয় জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের নামে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে এর প্রতিষ্ঠানগুলো। আর এগুলো শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যখন তার গণতান্ত্রিক চরিত্র হারায় তখন এগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে এই চিত্র আমরা দেখতে পাই দশকের পর দশক ধরেই। এখনকার প্রতিষ্ঠানগুলোই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ও শ্রেণির পাল্লায় পরে ধীরে ধীরে তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র হারিয়ে শুধু সুবিধাভোগী শ্রেণির ব্যবহারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। 

ঔপনিবেশিক ও সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার পোশাকি পতনের মাধ্যমে আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উত্তরণ হলেও, অগণতান্ত্রিক আচরণের মূল কারণগুলো দূর হয়নি। যার মধ্যে সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থার পাশাপাশি, বাজার ব্যবস্থা ও পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার, অন্যায্য বণ্টন নেতিবাচক রীতিনীতিতে বাদ দেওয়া যায়নি। সন্দেহ নেই, ঔপনিবেশিক আমলের তুলনায় বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে রাজনীতিতে নাগরিকদের অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। নাগরিকরা এখন আগের তুলনায় রাজনীতিতে অনেক বেশি সক্রিয় থাকতে চায়, সরাসরি অংশগ্রহণ করতে চায়। বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সংকটে নাগরিকের যেকোনো ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে শতগুণ। ক্রমবর্ধমান ভোগের সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির বিশৃঙ্খলা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। শুধু ভোগবাদী ব্যবস্থাই নয়, প্রযুক্তির উন্নয়ন বিশ্ব সমাজ ও সংস্কৃতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করছে। তথ্য ও প্রযুক্তি খাত এখন আমাদের সংস্কৃতির অংশ। প্রকৃতি ও ভাববাদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার প্রযুক্তি যুক্ত করছে সংস্কৃতির নতুন নতুন অনুষঙ্গ। আর এ সময় গণতান্ত্রিক চর্চা ও রীতি সবচেয়ে বড় যে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে তা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত জনতুষ্টিবাদ।

তথ্য ও প্রযুক্তির প্রসারের মাধ্যমে জনতুষ্টিবাদ নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। আর এটা এমন এক সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করছে, যেখানে ভিন্ন মতের তো কোনো অবস্থানই হচ্ছে না, বরং জনতুষ্টিবাদকে কাজে লাগিয়ে ভিন্ন মতের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে। গণমতের প্রবল প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে সহজেই কেউ একজন যেমন ‘নায়ক’ বনে যাচ্ছেন, অন্যদিকে খলনায়ক বনে যেতেও সময় লাগছে না। অন্য এখনকার এই আলো ঝলমলে সংস্কৃতিতে যেন সবাই নায়ক হতে চান, কেউ আর খলনায়ক হওয়ার ঝুঁকি চান না। তথ্য ও প্রযুক্তি শুধু তথ্য বিনিময়েরই মাধ্যম না, এটি এখন জনমত ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোও বড় মাধ্যম। প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর চেষ্টা সবসময়ই ছিল। তবে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তৃতি তথ্য বিনিময়ের পাশাপাশি প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর হাতিয়ারও একই সঙ্গে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে ভুল তথ্য ও অপতথ্য ছড়ানোতে শুধু মানুষই যুক্ত থাকে না, এক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হরহামেশাই ব্যবহার করা হচ্ছে।

আমাদের সমাজে বুদ্ধিজীবিতার ভূমিকা কী, তা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের বিতর্ক আছে। বুদ্ধিজীবীরা সমাজের সংস্কৃতি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বুদ্ধিজীবীরা সমাজের প্রচলিত জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন সময়ের আলোকে সমাজে নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক বিন্যাসের প্রস্তাবনা নিয়ে হাজির হন। কিন্তু সমাজে বুদ্ধিজীবিতার কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাকে না যখন তারা নির্দিষ্ট কোনো মতাদর্শ ও  জনতুষ্টিবাদের পাল্লায় পড়েন, সবসময় জনপ্রিয় থাকতে চান, সমাজে ক্রিটিক্যাল আলোচনা উত্থাপনের তুলনায় জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চান।

এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বুদ্ধিজীবিতার সঙ্গে অ্যাক্টিভিজমকে পার্থক্য করা কঠিন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ও কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা পালন করা একজন অ্যাক্টিভিস্টের কাজ। সে বুদ্ধিজীবী অন্যায়ের প্রতিবাদ করার পাশাপাশি পক্ষ-বিপক্ষ নির্বিশেষে সত্য অন্বেষণে থাকেন, যা নতুন মানব সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে বর্তমান জনতুষ্টিবাদের যুগে বুদ্ধিজীবিতাও হুমকির সম্মুখীন, জনতুষ্টিবাদের বিপরীতে কোনো কিছুই যেন পাত্তা পায় না, কী অনলাইন, সামাজিক মাধ্যম বা মূলধারার গণমাধ্যম।

অনলাইন সামাজিক মাধ্যম এখন মূলধারার গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করে ব্যাপকভাবে। নতুন বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মব জাস্টিস দেখতে পাওয়া যায়। এর পেছনে জনতুষ্টিবাদের ভূমিকাকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই।  

অন্যদিকে সমাজে বুদ্ধিজীবী পরিচয় ও বুদ্ধিজীবিতা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। একজন পরিচিত বুদ্ধিজীবী তার বুদ্ধিজীবী পরিচয় হারিয়ে ফেলেন, যখন তিনি তার বুদ্ধিজীবিতা হারিয়ে ফেলেন। সেই বিবেচনায় বুদ্ধিজীবী কোনো স্থায়ী পরিচয় না বরং একজন বুদ্ধিজীবী সহজেই প্রতিক্রিয়াশীল হতে পারেন। মূলত যখন তিনি প্রগতিশীল আচরণ করতে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে কোনো একজন সাধারণ মানুষও বুদ্ধিজীবী হতে পারেন যদি তিনি সময়ের আলোকে প্রগতিশীলতা ধারণ করতে পারেন। যদিও প্রত্যেকটি মানুষই বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনযাপন করেন এবং প্রত্যেক মানুষই বুদ্ধিজীবী। তবে জনতুষ্টিবাদ যদি ন্যায়বিচার, ন্যায্যতা ও সর্বজনীন মানবাধিকারের জন্য সহায়ক হয় তাহলে অবশ্যই তা একটি কাম্য সামাজিক অবস্থা।

জনতুষ্টিবাদের এই পক্ষ থেকে সমাজকে মুক্ত রাখার জন্য সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা দরকার। এ সময় আমাদের দেশ তারুণ্যের জয়গান উদযাপনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মাধ্যমে নতুন সংস্কৃতি বিনির্মাণের মাধ্যমে এক নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনার সূচনা হয়েছে। তবে নতুন এই রূপান্তরকে বাস্তবে রূপ দেওয়া তখনই সম্ভব হবে, যখন এখানে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করবে। সমাজের সব শ্রেণির মানুষ নিজেদের সামাজিক গতিশীলতার অংশ হিসেবে মনে করবে। আর এ জন্য রাষ্ট্র ও সমাজে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে, সমাজকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি ভিন্নমত ও বৈচিত্র্যময়তাকে স্থান করে দিতে হবে আর এসবের সম্মিলিত চেষ্টায় একটি নতুন বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার কথা। আর শুরুটা হতে হবে এখনই।

সব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, সমাজের মধ্যে যারা বিভাজন ও সহিংসতা তৈরি করছে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে কোনো ধরনের সুযোগ দেওয়া যাবে না। আইনের শাসনের বাইরে যেকোনো দৃষ্টান্ত নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। নতুন এই বাংলাদেশের জন্য যে বিস্তৃত পরিসরে সংস্কার প্রয়োজন, তা বলাই বাহুল্য। তবে সংস্কার শুধু ওপর থেকে সম্ভব নয়, সংস্কার হতে হবে ভেতর থেকে। কথা ও প্রতিশ্রুতির ফ্রেম থেকে বের হয়ে বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমেই তা সম্ভব।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

psmiraz@yahoo.com