১০ ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতি ৩১ হাজার ৫৪৪ কোটি

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এর বিপরীতে বাড়ছে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতির পরিমাণও। চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ১০টি ব্যাংক সঞ্চিতি ঘাটতিতে রয়েছে, যেগুলোতে সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। প্রভিশন ঘাটতিতে প্রথমে বেসরকারি ব্যাংক থাকলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। শুধু একা ন্যাশনাল ব্যাংকেরই সঞ্চিতি ঘাটতি ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন এবং ব্যাংকিং ব্যবসার ভিত্তি মজবুত না হওয়ার কারণে এই সংকটের উৎপত্তি হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে ছাড় দিয়েছে। সঞ্চিতির ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর অধিকাংশই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনে হিসাববছর শেষে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিয়ে আসছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক মিলিয়ে মোট ১০টি ব্যাংকের মোট সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ ৩১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা। কয়েকটি ব্যাংক তাদের লক্ষ্যমাত্রার বেশি সঞ্চিতি রেখেছে। যার ফলে ব্যাংক খাতে সার্বিক প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতের সার্বিক প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১৯ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। ছয় মাসে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ৫ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা।

নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে পরিচালন মুনাফার শূন্য দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ সাধারণ ক্যাটাগরির ঋণের বিপরীতে প্রভিশন হিসেবে রাখতে হয়। নি¤œমানের খেলাপি ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ এবং সন্দেহজনক খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ সঞ্চিতি হিসেবে রাখতে হয়। আর মন্দ ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশনিং আলাদা করে রাখার বিধান রয়েছে। প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি অশনি সংকেত, কারণ এটি ব্যাংকগুলোর দুর্বল আর্থিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে, যা মূলত উচ্চ খেলাপি ঋণের ফল।

তথ্য মতে, ২০২৪ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক। সিকদার গ্রুপের নানা দুর্নীতি এবং অনিয়মের কারণে বেশ আলোচিত এই ব্যাংকটি। তাই অন্যদের তুলনায় আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ আদায়ে বেশ পিছিয়ে তারা। ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরেও তাদের সঞ্চিতি ঘাটতি ছিল ১১ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। ছয় মাসের ব্যবধানে তাদের সঞ্চিতি ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।

ঘাটতির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। জুন শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরেও ব্যাংকটির সঞ্চিতে ঘাটতি ছিল ৪ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে আরেক রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। এই সময়ে ব্যাংকটির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। আর রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ৪ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। গত

ডিসেম্বরে ইতিবাচক ধারায় থাকলেও চলতি বছরের জুনে বিডিবিএলের সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৪ কোটি টাকা।

এ ছাড়া বেসরকারি খাতের মধ্যে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৪৪৩ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের ৩২৭ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের ৫০৫ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৩৯১ কোটি ও আরও একটি ব্যাংকের ১৯৮ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে। ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে কমার্স ব্যাংক ছাড়া অন্য ব্যাংকগুলো সঞ্চিতির ঘাটতি থাকার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের নিয়মিত লভ্যাংশ দিয়ে আসছে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ মিশনের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণত প্রভিশন করলে মুনাফা কমে যায়। মুনাফা কমলে লভ্যাংশ দেওয়া যায় না। মালিকদের তো একটা লভ্যাংশের আগ্রহ থাকে। সে কারণেই প্রভিশন ঘাটতিটা হয়। সেটা করে পার পাওয়ার কথা না যদি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা তাদের কাজটা করে। ব্যাংকগুলোর জন্য নিয়ম বেঁধে দেওয়া আছে কোনো ক্যাটাগরির জন্য কত প্রভিশন করতে হবে। সরকারি ব্যাংক হোক আর বেসরকারি হোক, প্রভিশন অবশ্যই রাখতে হবে।

এদিকে চলতি বছরের জুন মাস শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। গত মার্চ শেষে ঋণ স্থিতি ছিল ১৬ লাখ ৪০ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। তখন খেলাপি ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৯ হাজার ৯৬ কোটি টাকা। যেখানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা।