সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবির আন্দোলন বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সেই আন্দোলন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পরিণত হয়। তারপর থেকে এক মাসের কম সময়ের মধ্যে ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। এই গণ-অভ্যুত্থানের মাসপূর্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার নগরজুড়ে ‘শহীদি মার্চ’ কর্মসূচি পালন করেছে সরকার হটানোর চূড়ান্ত আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ‘শহীদি মার্চ’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু হয়।
লাখো ছাত্র-জনতা এতে অংশ নেন। এরপর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, নগরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই কর্মসূচি।
বিজয়ের মাসপূর্তিতে পালন করা এই ‘শহীদি মার্চের’ মধ্য দিয়ে ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের চেতনা ও স্পিরিটের পুনর্জাগরণ ঘটেছে বলে মনে করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার গণভবনকে ‘জুলাই স্মৃতি’ জাদুঘর ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি আরও চারটি দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো গণহত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে; শহীদ পরিবারগুলোকে আর্থিক ও আইনি সহযোগিতা দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রদান করতে হবে; প্রশাসনে দুর্নীতিবাজ ও ফ্যাসিস্টদের দোসরদের চিহ্নিত করে অনতিবিলম্বে বিচারের আওতায় আনতে হবে; রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রোডম্যাপ দ্রুত ঘোষণা করতে হবে।
এর আগে দুপুর ২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, ‘শহীদি মার্চ’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে দলে দলে হাজারো ছাত্র-জনতা জড়ো হন। রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ মার্চে অংশ নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আসছিলেন। তাদের বেশির ভাগের হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা দেখা গেছে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের মিছিল সহকারে রাজু ভাস্কর্যের দিকে আসতে দেখা যায়।
দুপুর আড়াইটার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নিয়ে ছাত্র-জনতা বিভিন্ন সেøাগান দিতে শুরু করে। এ সময় ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি, বাঙালি’; ‘আবু সাঈদ মুগ্ধর রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’; আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’; ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’; ‘বিচার চাই বিচার চাই’, ‘খুনি হাসিনার বিচার চাই’; ‘আমাদের শহীদেরা,আমাদের শক্তি’; ‘আবু সাঈদ মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ’ইত্যাদি সেøাগান দিতে দিতে ‘শহীদি মার্চে’ অংশ নেন ছাত্র-জনতা।
‘শহীদি মার্চে’ প্রথম সারির দলটিতে থাকেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন তাদের দল নিয়ে ‘শহীদি মার্চে’ যোগ দেয়। মার্চে অংশ নেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও। অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা দিতে মার্চের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিও লক্ষ করা যায়।
‘শহীদি মার্চ’ রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু করে নীলক্ষেত, নিউ মার্কেট, কলাবাগান, মিরপুর রোড ধরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও সংসদ ভবনের সামনে দিয়ে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ ও রাজু ভাস্কর্য হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে এক সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।
শহীদ মিনার সমাবেশে আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, জনতার জনসমুদ্র প্রমাণ করে দিয়েছে ছাত্র -জনতার গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট এই বাংলাদেশে নিশ্চুপ হতে পারে না, এই চেতনা শেষ হওয়ার নয়।
তিনি বলেন, ‘যারা ফ্যাসিস্টের চেতনা বিন্দুমাত্র ধারণ করে তাদের হুঁশিয়ারি করে দিতে চাই, স্বাধীন দেশে নতুন করে ফ্যাসিস্টের দোসর সাজার চেষ্টা করবেন না। যদি কেউ এমন চেষ্টা করে তাহলে এসব ফ্যাসিস্টের ছাত্র-জনতা একসঙ্গে প্রতিহত করবে। কোনো চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটকারীর অবস্থান এই বাংলাদেশে হবে না।’
সারজিস বলেন, ‘আমাদের ভাইয়েরা রক্ত দিয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রাখতে যেকোনোদিন যেকোনো সময় আমরাও রক্ত দিতে প্রস্তুত থাকব।’
সমাবেশে সমন্বয়ক আবদুল কাদের বলেন, ‘বিপ্লব পরবর্তী দেশকে এগিয়ে নেওয়ার লড়াই আমাদের চালিয়ে যেতে হবে। স্পিরিট থেকে আমরা বিচ্যুত হব না। হত্যাকা-ে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
আরেক সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ৫ আগস্টের পুনর্জাগরণ হয়েছে আজকে। যারা বলেছে জাতীয় ঐক্য নষ্ট হয়ে গেছে, ছাত্রদের মধ্যে বিভাজন দেখা গেছে, এ বিভাজন কাজে লাগিয়ে টেন্ডারবাজি, সিন্ডিকেট করতে পারবে, তাদের জন্য আজকের পুনর্জাগরণ নতুন বার্তা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে গত জুলাইয়ের শুরুতে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগসহ তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলা-নির্যাতনের একপর্যায়ে তা সরকারের পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ শপথ নেয়। গতকাল বিজয়ের মাসপূর্তিতে প্রধান উপদেষ্টা বার্তা দিয়েছেন। সেই বার্তায় শহীদদের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি শহীদদের পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘আমরা কখনোই শহীদদের স্বপ্নের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব না।’