দেশ রূপান্তর : আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কেমন বাংলাদেশের প্রত্যাশা আপনাদের। এখনকার পরিস্থিতির মূল্যায়ন কীভাবে করেন?
সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম : ৫ আগস্টের পর আমরা দেখলাম, যে আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে মানুষ রক্ত দিয়েছে জীবন দিয়েছে তার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং জুলুম অত্যাচার, দখলদারিত্ব চাঁদাবাজি, লুটতরাজ হামলা, মিথ্যা মামলা চলছে। এর জন্য আমরা মর্মাহত। আমরা দুর্নীতিমুক্ত একটা দেশ চাই। দুর্নীতিবাজদের দমন করলে পরবর্তী সময়ে দংশন করবে। তাই দুর্নীতি দমন নয়, মূলোৎপাটন করতে চাই।
দেশ রূপান্তর : কারা এই লুটতরাজ, চাঁদাবাজি, হামলা, মিথ্যা মামলা করছে?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : বিগত দিনে যারা ক্ষমতায় ছিল তারা। ১৯৭১ সালের পর থেকে ৫ আগস্টের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত যারা ক্ষমতায় ছিল তারা কেউ জনগণের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। তারা দল ও ব্যক্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত ছিল। আজ তারাই এগুলো করছে।
দেশ রূপান্তর : ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচন কোন দিকে যাচ্ছে?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : নির্বাচনের জন্য যে পরিবেশের প্রয়োজন, জনগণ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আশা করছে। যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতেও পারবে না, হওয়াও উচিত না। এজন্য যে সময় সরকারের প্রয়োজন, ওই পরিমাণ সময় নিয়ে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ করেছি।
দেশ রূপান্তর : পরিবেশ তৈরির জন্য আপনারা কতদিন সময় দিতে চান?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : নির্দিষ্ট করে সেই সময়টা বলা যায় না। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির জন্য এক থেকে দুই বছর লাগতে পারে। এ সময়টা আমরা দিতে চাই। সবকিছু সংস্কার না করে তো আর ভালো নির্বাচন হবে না।
দেশ রূপান্তর : সরকার পতনের আগে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করেছে ইসলামী আন্দোলন। এখন কি বিএনপির সঙ্গে আপনাদের দল সামনের দিনের রাজনীতি করবে?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : নিছক শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ইসলামী আন্দোলন রাজনীতি করে না। আমরা ইসলামের নীতি আদর্শকে ক্ষমতায় নিতে চাই। নীতি আদর্শবিহীন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষমতায় নিলে আবার আন্দোলন করতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে, বিপ্লব করতে হবে। ফায়দাটা কী? মানুষ কত জীবন দেবে? কত রক্ত দেবে? তাই আমরা শুধু নেতার পরিবর্তন নয়, নীতির পরিবর্তন চাই।
দেশ রূপান্তর : বিদায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশন সংস্কারের কিছু প্রস্তাব দিয়ে গেছেন। সেখানে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনের কথা আছে। এ ব্যবস্থা কীভাবে মূল্যায়ন করে আপনার দল?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে, এটা বলতে পারি বাংলাদেশে দুর্নীতিমুক্ত, পেশিশক্তি ও কালো টাকামুক্ত একটি নির্বাচন হবে। যেখানে প্রতীক থাকবে, ব্যক্তি থাকবে না। যদি ব্যক্তি না থাকে তাহলে পেশিশক্তি থাকবে না এবং অবৈধ টাকাও সেখানে খরচ হবে না। যদি আমরা পেশিশক্তি ও অবৈধ টাকামুক্ত নির্বাচন করতে পারি, তাহলে ৮০ শতাংশ সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। সব আদর্শের মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। আমরাও চাই সব আদর্শের অনুসারীদের নিয়েই নির্বাচন হোক।
দেশ রূপান্তর : নেপালের নির্বাচনব্যবস্থাও সংখ্যানুপাতিক, সেখানে বারবার প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হতে দেখা গেছে। স্থিতিশীল অবস্থা রাখা কঠিন। এমন হলে কী করবেন?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : হ্যাঁ, এ পদ্ধতির একটা নেতিবাচক দিক আছে। তবে সেটি কাটানোর পথও আছে। আমরা বাংলাদেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা করতে চাই। তাহলে আর এ সমস্যা হবে না।
দেশ রূপান্তর : বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসলামিক দলগুলোর এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। তবে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন ভাবনায় দুটি ধারার মধ্যে মিল আছে। এমন কীভাবে হলো?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : ক্ষুধার্তের ক্ষুধা নিবারণ করব, অসুস্থকে সুস্থ করব সে ক্ষেত্রে ঐকমত্য থাকতেই পারে। মৌলিক ভালো কাজে সবারই ঐকমত্য থাকে। চুরি, ডাকাতি ধর্ষণ না হোক এটা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ডান, বাম সবাই চায়। আর সেখানে যদি কারও ঐক্য হয়ে যায়, তাহলে তো সেটা ভালো। এ নির্বাচন পদ্ধতির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : এ সময়ে সংবিধান নিয়ে আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে কি না?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : অবশ্যই রয়েছে। এ সংবিধান বাংলাদেশের সংবিধান নয়। এটা দলীয় একটা নীতিমালা। যখন যেই দল আসছে তখন তারা নিজেদের মতো করে সাজিয়েছে। এ সংবিধান দমন, নিপীড়ন, অত্যাচার, অবিচার, জুলুম, ক্ষমতায় থাকার পরিবেশ কীভাবে করা যায় তার পথ দেখিয়েছে। তাই এ সংবিধান পরিবর্তন ব্যতীত বাংলাদেশে কোনোভাবেই কল্যাণ আসবে না।
দেশ রূপান্তর : জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের এক ধরনের মতভিন্নতা ছিল। এ সময়ে দুই দল কোনো জোটে আসছে কি না কিংবা আগামী নির্বাচনে একসঙ্গে মাঠে নামবে কি না?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : দেশের কল্যাণে কোনো এক জায়গায় মেলা মানে কিন্তু নিজ নিজ আদর্শ থেকে সরে আসা বা বিচ্যুত হওয়া নয়। জামায়াতের সঙ্গে ওলামায়ে কেরামের যে আদর্শিক ও নৈতিক অমিল ছিল, তা আজও সেখানেই আছে। এখান থেকে একচুল পরিমাণ পরিবর্তন হয়নি। আমরা জামায়াতকে প্রস্তাব দিয়েছি ওলামায়ে কেরামদের সঙ্গে বসে একটা স্থায়ী সমাধান করতে। তবে জামায়াতের অবস্থান অপরিবর্তনীয়।
দেশ রূপান্তর : জামায়াত দীর্ঘদিন পর সক্রিয় রাজনীতি করছে। ভবিষ্যতে তারা কি সরকার গঠন করতে পারবে বলে মনে করেন?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : ইসলামি শক্তি যেতে পারে। জামায়াতের বিষয়ে বেশ কিছু বাধা আছে। সেগুলো অতিক্রম করে ক্ষমতায় যাওয়া খুবই কঠিন। তাদের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে, ওলামায়ে কেরামের আদর্শগত প্রশ্ন থাকবে, পীর-মুরিদ, তবলিগ যারা করেন, তাদের প্রশ্ন থাকবে। আর এগুলো তাদের জন্য বড় বাধা। সামনে এগোতে চাইলেই এ বাধাগুলো আসবে।
দেশ রূপান্তর : আগামী দিনে ক্ষমতায় কারা আসতে পারে বলে মনে করছেন?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : আদর্শবান, নীতিবান, চরিত্রবান ও যারা ইসলামকে যারা পছন্দ করেন তারাই ক্ষমতায় যাবে। ইসলামিক দলগুলো মিলে একটা বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যেতে পারে। তবে যাদের নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তাদের সঙ্গে নিয়ে নয়।
দেশ রূপান্তর : সবাই বলছে দেশ স্বাধীন। এখন কি আসলেই আমরা নিজেদের মুক্ত বলতে পারি?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : বিগত আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল। চৌকিদার থেকে রাষ্ট্রপতি দলের বাইরে কাউকে তারা নিয়োগ দেয়নি। তাই মুক্ত হয়ে গেছেন বলে যারা ভাবছেন, বলতে হবে তারা মরীচিকার মধ্যে পানি খুঁজছেন।
দেশ রূপান্তর : এ সময়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান কীভাবে দেখেন?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : আওয়ামী লীগ হেরেছে। তারা তো জেতার চেষ্টা করবে, এটা তো স্বাভাবিক। কেউ যদি চিন্তা করেন আওয়ামী লীগ শেষ হয়ে গেছে, তারা বোকা। এগুলো যারা চিন্তা করে তারা স্বপ্নের রাজ্যে আছে, বাস্তবতায় নেই। আওয়ামী লীগ এসির মধ্যে বসে ভুল করেছে। ভারত আর পাশ্চাত্যের বুদ্ধিতে তাদের পতন হয়েছে। আমরা চাই তারাও রাজনীতি করুক। নির্দোষ কেউ শাস্তি না পাক, সেই সঙ্গে দোষীদেরও বিচার হোক।
দেশ রূপান্তর : আবারও এক-এগারোর মতো কোনো কিছু ঘটার সম্ভাবনা দেখেন?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : সবকিছুই হতে পারে। এটা অসম্ভব নয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন হবে, দেশ ছাড়বে, সংসদের সবাই পালিয়ে বেড়াবে এটা কেউ চিন্তাও করেনি। আমি কোনো কিছুকে অসম্ভব মনে করি না। তবে বিশ্বাস করি, এ দেশের মানুষ অনৈতিক কাউকে ক্ষমতায় বসানোর আগে চিন্তা করবে।
দেশ রূপান্তর : ইসলামিক দলগুলো কি রাজনৈতিক প্রশ্নে আসলেই ভারতবিরোধী?
সৈয়দ ফয়জুল করীম : ভারত আমাদের প্রতিবেশী। তাদের সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক কেন থাকবে? তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই কিন্তু কর্তৃত্ব চাই না। ভারত সুসম্পর্কের পরিবর্তে কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছে। এগুলো ঠিক নয়। ভারতের চারপাশের কোনো দেশই তাদের বন্ধু নয়। বাংলাদেশকেও যদি সেই তালিকায় নেয়, তাহলে সেটা তাদের ভুল হবে।