মঙ্গলবার বেলা দেড়টা। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চতুর্থ তলার আইসিইউয়ের (ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিট) সামনে কেউ নামাজ পড়ছেন, কেউ বা দুই হাত তুলে মোনাজাত করছেন। প্রিয় মানুষকে ফিরে পাওয়ার আশায় কাটছে তাদের প্রতিটি প্রহর। যদিও তাদের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। স্বজন হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন অনেকেই।
একটু পর পর আইসিইউ থেকে বের হয়ে নার্সরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন রোগীর স্বজনদের। আবার নার্স বা চিকিৎসকদের কেউ রোগীর নাম কিংবা সিরিয়াল বললেই সবাই আতঙ্কিত হয়ে সাড়া দিচ্ছেন। ভেতর থেকে কী তথ্য আসে তা জানার ব্যাকুলতা অপেক্ষমাণ স্বজনদের। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এসএন করপোরেশন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণে দগ্ধদের স্বজন তারা।
গত শনিবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকার এসএম করপোরেশন ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে শিপ ইয়ার্ডে আগুন ধরে ১২ জন আহত হন। এর মধ্যে গুরুতর আহত ৮ জনকে ঢাকার বার্ন ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে আহমেদ উল্লাহ্ নামের এক শ্রমিক নিয়ে পথেই মারা যান।
এছাড়া ২১ বছরের খায়রুল নামের আরেক শ্রমিক গত সোমবার রাত ২টার দিকে মারা যান। তার শরীরের ৮০ ভাগের বেশি পুড়ে গিয়েছিল। একই অবস্থা ছিল কারখানার সেফটি ইনচার্জ আল আমিনেরও। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে তিনি মারা যান। আল আমিন ও খায়রুল আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের বাইরে আইসিউতে আরও ৫ শ্রমিক চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. তরিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, আইসিউতে থাকা ৫ শ্রমিকদের কেউ শঙ্কামুক্ত নয়। চিকিৎসকরা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আহতদের মধ্যে জাহাঙ্গীর নামের একজনের শরীর ৭০ ভাগ পুড়ে গেছে।
মঙ্গলবার এই প্রতিবেদক যখন আইসিউর সামনে আহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন আইসিইউতে থাকা বাবাকে দেখে বাইরে বের হচ্ছিলেন নাঈম হাওলাদার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাবা জাহাঙ্গীর হাওলাদার। তার শরীরের ৭০ ভাগ পুড়ে গেছে। আইসিউতে বাবাকে দেখতে ঢুকেছিলাম। তার পুরো শরীর ব্যান্ডেজে মোড়ানো। মুখের প্রায় পুরোটা পুড়ে গেছে। হাত, পা পেট সব পুড়ে গেছে। তাকে আইসিউতে রাখা হয়েছে।’ ‘আমার বাবার খুব কষ্ট হচ্ছে’ বলেই কাঁদতে শুরু করেন নাঈম হাওলাদার।
তিনি জানান, তার বাবা জাহাঙ্গীর হাওলাদার এসএম করপোরেশনের কন্ট্রাকটর ছিলেন। তিনি ২০ বছর ধরেই এই কাজ করছিলেন। আগুন লাগার ঘটনা তিনি অনেক পরে জেনেছেন। দুপুর ২টার দিকে তার বাবার নম্বর থেকে একজন তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেলে যেতে বলেন। এরপর তারা দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান এবং সেখান থেকে চিকিৎসকদের পরামর্শে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। এখন পর্যন্ত চিকিৎসার পেছনে তাদের কোনো খরচ হচ্ছে না, সব খরচ কোম্পানিই বহন করছে।
আইসিউইউ কক্ষের সামনে বিলাপ করছিলেন সাবিনা খাতুন। তার স্বামী হাবিব কাটিং ফোর ম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিতে তিন বছর ধরে কাজ করছিলেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘মানুষটা সুস্থ অবস্থায় কাজে গেল আর বাড়ি ফিরল না। আমার ছোট ছেলে সাদমানের বয়স আড়াই বছর, আর মেয়ে হিয়া মনির বয়স ১০ বছর । ছোট ছোট দুই বাচ্চাকে কীভাবে তাদের বাবার পুড়ে যাওয়ার কথা জানাব। তাদের এখন পর্যন্ত জানানোর সাহস পাইনি। মানুষটা যদি ফিরে আসত, তা না হলে দুই বাচ্চাকে নিয়ে আমি কই যাব। আমার জীবন এলোমেলো হয়ে গেল।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য তার কত দরদ। তাকে উদ্ধার করে চমেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তখনও আমরা কিছুই জানতাম না। এই যে তার শরীরটা পুড়ে গেছে, তবুও তিনি আমাদের কথা ভুলেননি। আমার নম্বরটা মুখস্তই ছিল। হাসপাতালে কারও ফোন থেকে আমাকে নিজেই কল দেন। বাচ্চাদের খোঁজখবর নেন এরপর আমাকে দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলেন। হাসপাতালে গিয়ে দেখি তার হাত, পা, মুখ, বুক সব পুড়ে গেছে। মানুষটার এরকম চেহারা দেখতে হবে কখনো মাথায় আসেনি। এখন একটাই প্রার্থনা মানুষটা যেন প্রাণে বাঁচে। আমাদের কারও ওপর কোনো অভিযোগ নেই। তিনি যেন কেবল ফিরে আসে।’
৩৭ বছরের বরকত উল্লাহ্ এক বছর ধরে শিপ ইনচার্জ হিসেবে কাজ করতেন এসএম করপোরেশনে। শনিবারের বিস্ফোরণে তিনিও দগ্ধ হয়েছেন। তার শরীরের ৫০ ভাগ পুড়ে গেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। আইসিউয়ের সামনে তার স্ত্রী রেখা আকতার ও শ্বশুর আবু বকর অপেক্ষা করছিলেন। রেখা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শনিবার বাসায় কাজ করছিলাম। হঠাৎ এক প্রতিবেশী ফোন দিয়ে বলল ভাই কোথায়, খবর নেন। তার কারখানায় আগুন লাগছে। তখনও বুঝতে পারিনি এই সর্বনাশ হবে। তাকে উদ্ধার করে প্রথম স্থানীয় একটা হাসপাতালে নেওয়া হয়, তারপর চমেকে। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে এখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমার বড় ছেলের বয়স সাড়ে তিন বছর, মেয়েটার বয়স দুই বছর। ছেলেমেয়েদের নিয়ে মানুষটার কত স্বপ্ন ছিল। এখন সেই স্বপ্নের কী হবে? মানুষটার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমরা কোথায় গিয়ে উঠব? বিয়ের ৬ বছর হয়েছে, এই সময়ে আমাকে কোনো কষ্ট দেয়নি, পুরো সংসার নিজেই সামলাত। সর্বনাশা আগুন আমাদের সব শেষ করে দিল ভাই।’
বিস্ফোরণে দগ্ধ আরেক শ্রমিক আবুল কাশেমের শরীরের অর্ধেকের বেশি পুড়ে গেছে। রবিবার থেকে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে বলে জানান স্ত্রী সাবিনা খাতুন। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যখন তখন কিছু একটা হয়ে যেতে পারে।’ এই কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সাবিনা।