গত রবিবার, ১ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় লালারচক সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বাংলাদেশের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া কিশোরী স্বর্ণা দাশ নিহত হন। ৭ সেপ্টেম্বর (শনিবার) স্বর্ণার লাশ বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেছে বিএসএফ। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে পৃথিবীর কোনো সীমান্তে এভাবে গুলি করে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুকে হত্যা করা যায়? অনেক চিন্তাভাবনা করে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সীমান্তগুলোর পরিস্থিতির ওপর নজর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো থেকে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া ঘুরে ইউরোপের সার্বিয়া-কসোভো ও আর্মেনিয়া-আজারবাইজানের সীমান্ত পর্যন্ত যাবতীয় ইতিহাস পর্যালোচনা করেও প্রাণহরণের এমন নজির পাওয়া গেল না।
দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ-ভারতের মতো এত প্রাণঘাতী সীমানা আদতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডেই নেই। পরিহাসের ব্যাপার হলো এই, চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমানারেখাটি নাকি দুটি বন্ধু রাষ্ট্রের! সীমান্তরক্ষা আর নিরাপত্তার অজুহাত তুলে বিনা বিচারে মানুষ খুনের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে বিশ্বে একটি দেশকেই খুঁজে পাওয়া যাবে এবং সেটি ইসরায়েল। এ লেখা যখন লিখছি তখন ইসরায়েলের মানবতাবিরোধী এ ধরনের একটি অপরাধের জেরে আরও একবার বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে (৭ সেপ্টেম্বর) শনিবার ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে তুর্কি-আমেরিকান নারী আইসিনুর এজগি এয়িগি নিহত হয়েছেন, যিনি সেখানে গিয়েছিলেন অবৈধ ইহুদি বসতির বিরুদ্ধে একজন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে প্রতিবাদ জানাতে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বিএসএফের হাতে সংঘটিত হত্যাকান্ডগুলো ইসরায়েলের সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের থেকে খুব বেশি আলাদা নয়। হয়তো ভূমধ্যসাগরের তীরে জায়নবাদীরা অন্যের ভূমিকে করায়ত্ত করতে রক্তপাত ঘটাচ্ছে, আর ভূভারতের শাসকরা তাদেরই এক প্রতিবেশী দেশের মানুষকে সীমান্ত সুরক্ষার অজুহাতে হত্যা করছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষকর্তারা প্রায়ই বলে থাকেন, সীমান্তে যারা মারা যায় তারা চোরাকারবারি। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রম হতে চলল, ভারতীয় কোনো আদালতে একজন বাংলাদেশি চোরাকারবারিকে সঠিক বিচারের আওতায় আনার নজির পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি এ পর্যন্ত ভারত এসব হত্যাকান্ডের একটিরও কার্যকর তদন্ত, বিচার ও ফলপ্রসূ ব্যাখ্যা দেয়নি। সম্ভবত গত ১৫ বছর ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র বিন্দু পরিমাণ দ্বিধা ছাড়া শত শত মানুষকে হতাহত করেছে। আওয়ামী তাঁবেদাররা একবারও দৃঢ় আওয়াজ তোলেনি। গত তিন দশকেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশের দেড় হাজারেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক বিএসএফের গুলিতে প্রাণ দেওয়ার তালিকায় লিপিবদ্ধ হয়েছেন। আহত এর থেকে ঢের বেশি। এই ভূখন্ডের মানুষগুলোর ওপর দিনের পর দিন ঘটে যাওয়া এই অন্যায়গুলোর দিকে আন্তর্জাতিক কোনো পক্ষ কখনোই শক্তপোক্ত নজর দেয়নি। অথচ এসব ঘটনার সবই সুস্পষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধ। এখানেই শেষ না, ভারতীয় শাসকরা ভবিষ্যতে যে সীমান্তে আরও কোনো স্বর্ণার লাশ ফেলবে, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। ভারতের এখনকার হিন্দুত্ববাদী শাসকরা জাত্যাভিমানী মোহে এতই অন্ধ যে, প্রতিবেশীদের কাউকেই আর মিত্র মনে করতে পারছে না। বিশেষত, বিজেপি-আরএসএস মুসলমান-বিদ্বেষী রাজনীতির মধ্য দিয়ে ভারতের মানুষের কাছ থেকে সীমান্ত হত্যার সম্মতি তৈরি করছে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের নিজেদের মতাদর্শ বিস্তারে বিজেপি বাংলাদেশ সীমান্তের হত্যাকান্ডগুলোকে সন্ত্রাস দমন হিসেবে তুলে ধরছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও বিএসএফের গুন্ডাগিরি এবং সীমান্ত ইস্যুটি ব্যাপক আলোচিত। সেখানে রাজনৈতিক অবস্থান তৈরিতে গরু পাচার ইস্যুটি ব্যবহার করছে বিজেপি। মুসলিম সম্প্রদায়কে এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে আগ্রাসী প্রচার চালাচ্ছে বিজেপি, আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ।
এমনও শোনা যায়, অর্থ-কড়ির ভাগবাটোয়ারা না মিললেই বিএসএফ গুলি চালায়। প্রশ্ন ওঠে, সারা ভারত থেকে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্তে চোরাই মালামাল জড়ো হয় কীভাবে। মোটামুটিভাবে সারা ভারত থেকে সীমান্তে গরু জড়ো করতে কারবারিরা বাধাহীন, যত বদনাম সীমান্তের এপারের বাংলাদেশিদদের।
পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েলি দখলদাররা যেমন নিজেদের নিরাপত্তার সবচেয়ে ঠুনকো অভিযোগটি তুলে ফিলিস্তিনি শিশু-কিশোরদেরও রেহাই দেন না; ভারত-বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত জুড়ে সেভাবেই কখনো ফেলানীর মতো তরুণী কাঁটাতারে ঝুলে থাকে, কখনো কৃষকের বুক লক্ষ্য করে তাজা বুলেট বিদ্ধ হয়; কখনো-বা বুলেটবিদ্ধ দেহটিকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। তথাকথিত দুই বন্ধুরাষ্ট্রের মধ্যে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম বেড়া দেখা যায়; অথচ একই পাহাড়বেষ্টিত, অভিন্ন নদীর মোহনায় অবস্থিত ও ভাগাভাগি করা উপত্যকায় আমাদের যুগ যুগান্তরের নাড়ি পোঁতা। কাঁটাতার পেরোলেই যেখানে স্বজন-পড়শিদের উঠান, সেই জনপদকে এভাবে বুলেটের ভয় দেখিয়ে মানুষের চিরন্তন যোগাযোগ নস্যাৎ করে দেওয়া হচ্ছে।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার নিরোদ বিহারী স্কুলের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া কিশোরী স্বর্ণা দাশের মরদেহ এতক্ষণে নিজ দেশে দাহ করা হয়েছে। রাষ্ট্রবাদী শকুনদের কাছে স্বর্ণাদের বুক ঝাঁজরা করা ‘পবিত্রতম’ দায়িত্ব। তাই নিরাপত্তা শঙ্কার হেস্তনেস্ত শেষে চাটাইয়ে মুড়িয়ে বস্তাবন্দি ভুসিমালের মতো স্বর্ণাকে পাঠানো হয়েছে নিজ দেশে। শিশুটির এই মাটির আলো-বাতাসে দীর্ঘকাল বেঁচে আনন্দে কাটানোর কথা ছিল, কিন্তু ঘাতকের নিশানায় সে এরই মধ্যে অতীত। হত্যাকাণ্ডের পর লাশ ফেরত দেওয়া নিয়ে তালবাহানা আর সময়ক্ষেপণ নিয়মিত ঘটনা। স্বর্ণার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
বুলেটবিদ্ধ হয়ে নিহত স্বর্ণার অপরাধ কী ছিল? অপরাধটুকু এই, তিনি ত্রিপুরায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে মায়ের সঙ্গী হয়েছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, একই আকাশ, একই বাতাস। কাঁটাতার হয়তো নস্যি। কিন্তু সীমানারেখা আর তথাকথিত সার্বভৌম শাসকের অস্তিত্ব যে মানুষের জীবনেরও ঊর্ধ্বে, তা কিশোরী ও তার পরিবার জানতেন না। জানার কথাও নয়। ভারত আর বাংলাদেশের মাঝে এঁকে দেওয়া বিভাজনরেখা কিংবা মাইলের পর মাইল জুড়ে থাকা কাঁটাতার স্বর্ণা আর ওর ভাইয়ের বন্ধনকে মেনে নিতে পারেনি। দেশ মানে মানুষ, এই মিথ্যাটুকু অনুধাবন করতে না পারার খেসারত দিতে হলো পরিবারটিকে। স্বর্ণার জীবনসংহারী এই বুলেটই ভারত রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা, প্রবল শক্তির প্রতিমূর্তি এবং নব্য পরাশক্তিসুলভ দৃষ্টিতে ছোট পড়শিকে দেখার দুর্বিনীত ও চরম আকাক্সিক্ষত অভিলাষ। এক শ্রেণির জাতিবাদী উন্মাদদের চোখে এই মৃত্যু জায়েজ, কারণ সীমানার গরিমাকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে তাদের। সম্ভবত, দিল্লির মসনদে আসীন হিন্দুত্ববাদী শাসক ও তার সমর্থককুলের জন্য সীমান্তের বুলেটগুলো জাত্যাভিমান চরিতার্থের বাটিকা। মনে হয়, বাংলাদেশিরা সীমান্তে দিল্লির অস্ত্রধারীদের নিশানা পরীক্ষার (টার্গেট প্র্যাকটিস) উপলক্ষ।
স্বর্ণার মৃত্যু আমাদের আরেকজন তরুণীর অন্তিম পরিণতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, যিনি ভারত রাষ্ট্রের সীমান্ত হত্যার ভুক্তভোগীদের ভগিনী এবং তাবত বাংলাদেশে ভারতীয় আগ্রাসনবিরোধিতার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। সেই ফেলানী, যাকে গুলি খেয়ে কাঁটাতারে ঝুলে থাকা পাখির মতো মনে হয়েছিল। জীবিকার্জনে যুক্ত বাবার সঙ্গে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে থাকতেন ফেলানী। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সভ্য-ভব্য নিয়মকানুন, পাসপোর্ট কিংবা ভিসার মাধ্যমে ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম ভারত যাননি। পূর্বপুরুষদের কাউকে দেখেননি পড়শির উঠানে যেতে কাগজপত্র লাগে। তাই কাঁটাতার বা সীমানাকে ব্যবধান মনে করেননি তিনি। তা ছাড়া এরা এতই প্রান্তজন যে, কাগজের হিসাব করলে ক্ষুধা নিবারণ হবে না। নুরুল ইসলাম দিল্লিতে কাজ ফেলে মেয়েকে বিয়ে দিতে কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী বাড়িতে ফিরে আসছিলেন। কিন্তু ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি বাবা নুরুল ইসলাম সীমান্তরেখা পার হতে পারলেও পেছনে তাকিয়ে দেখেন কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলছে বুলেটবিদ্ধ অর্ধমৃত কন্যা ফেলানীর দেহ। মাথাটা নিচ দিকে আর ওপরের দিকে পা, অর্ধমৃত হয়ে পানির জন্য গোঙাচ্ছিলেন ফেলানী, এর চেয়েও নির্মম কিছু হতে পারে! বিএসএফের গুলির ভয়ে কেউ এগিয়ে যাননি। সেভাবেই মারা যান ফেলানী। অথচ কী নিদারুণ দ্বিচারিতা, যেসব দালাল ফেলানী ও তার বাবাকে সীমান্ত পার করে দিতে অর্থ নিয়েছিলেন, ফেলানী যখন কাঁটাতারে ঝুলছিলেন, তখন অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন দালাল চক্রের সদস্যরা। বিএসএফ তাদের গ্রেপ্তার পর্যন্ত করেনি। নুরুল ইসলাম যথার্থই বলছিলেন, ‘বিএসএফ বাংলাদেশিদের ঘৃণা করেন।’ এই ঘৃণা বর্ণবাদী, জাতিবাদী অস্পৃশ্যতা মোড়ানো। এ ঘটনায় যে প্রহসনের বিচার করা হয়েছিল তাতে অভিযুক্ত বিএসএফ জওয়ান খালাস পেয়েছেন। ফেলানীর মৃত্যু গোটা দুনিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ভারত নামক রাষ্ট্র তাতে টলেনি। একটি পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ থেকে ২০২০ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি বেসামরিক মানুষ বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। গত সাড়ে ১৫ বছরে বাংলাদশে ভারতের আজ্ঞাবহ শাসক শেখ হাসিনার সরকার এসব হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেনি। এক্ষেত্রে স্বর্ণা ভাগ্যবান, তার দেশের বর্তমান শাসকরা ভারত সরকারকে এ ঘটনায় শক্ত প্রতিবাদ জানিয়েছে।
ভারতের রাজনীতিতে প্রবল শক্তি নিয়ে গত দশকের শুরুতে আবির্ভূত হিন্দিভাষী মধ্য ভারতীয় মনুবাদী-ব্রাহ্মণবাদী দর্শনের ধ্বজাধারীরা বস্তুত অন্ত্যজ শ্রেণি, দলিত, মুসলমানকে তৃতীয় দৃষ্টিতে দেখে; তা অজানা নয় কারও। স্বর্ণার মতো অ-ব্রাহ্মণ কিংবা বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলিমদের মতো অস্পৃশ্যদের প্রতি মধ্যভারতীয় মনুবাদীদের দৃষ্টি যেমন হতে পারে, সেটাই দেখা যাচ্ছে। ভারত রাষ্ট্র এখন প্রতিবেশী এবং ভারতের প্রান্তগুলোতে, বিশেষত উত্তর-পূর্বে ও উত্তরে, সেই ঘৃণাজীবী দর্শনের বে-আব্রু প্রকাশ ঘটছে। সীমান্ত হত্যা প্রশ্নে ভারতের বর্তমান শাসকদের মনোভাব সেই দর্শনের প্রতিধ্বনি। বাংলাদেশসহ প্রতিবেশীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তাদের সেই প্রতিক্রিয়ার দর্শনেই নিহিত। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর আহ্বান সত্ত্বেও সীমান্তে মারণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার থেকে এক চুল সরছে না তারা।
এই যে স্বর্ণা থেকে ফেলানী কিংবা ইসরায়েলি গুলিতে নিহত আইসিনুর; রাষ্ট্রব্যবস্থা কি কোনোদিনই এসব প্রান্তজনকে দরদ করেছে? নাহ, একদমই করেনি। এতটুকু দরদ করলে মৃত্যুগুলো ঠেকানো যেত। উর্দিধারীদের অর্থহীন আস্ফালন কিংবা রাষ্ট্রীয় সীমানার এত বাড়াবাড়ি নিয়ন্ত্রণটুকু না থাকলে দেশ হতো মানুষের। এই বিভাজনের দেওয়াল কাল্পনিক। রাষ্ট্র নামের কাল্পনিক সত্তার বাধার ওপর দাঁড়িয়ে এই অবাধ বিচরণের ইচ্ছাগুলো। অথচ যুগ যুগ ধরে প্রান্তজনকে একপাশে সরিয়ে রাষ্ট্র নিয়ে শাসকদের দরবার করতে দেখা গেছে। সেসব অভিজ্ঞতা বলছে, রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতে শাসকই নিরঙ্কুশ হয়েছে, গণমানুষ ক্ষমতার তল্লাটে পা রাখতে পারেননি।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে স্বর্ণা দাশ নামের কিশোরীটি আমাদের ভূখ-গত বিভাজন, বৃহৎ প্রতিবেশীর দম্ভ আর জাতিবাদী বড়াইয়ের বলি হলো। একবার ভাবুন তো, এই কিশোরীকে কে খুন করল? স্পষ্টত একটি ব্যবস্থা, যার ওপর ভর করে রয়েছে অন্যের প্রতি প্রচণ্ড মাত্রার ঘৃণা, সাম্প্রদায়িক আস্ফালন আর প্রাচীন সনাতনী শ্রেষ্ঠত্ববাদ; সে সঙ্গে উঠতি সামরিক বিকাশ। খোদ ভারতের উত্তর-পূর্ব এবং জম্মু-কাশ্মীর বা লাদাখ পর্যন্ত জনগোষ্ঠীর দিল্লির শাসনকাঠামোয় পরিপূর্ণ অন্তর্ভুক্তি নেই। মণিপুর, আসাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা; সর্বত্রই আধিপত্যের দাপাদাপি। কেন্দ্র থেকে প্রান্তকে এভাবে চেপে ধরে শাসন করার এক ও একমাত্র উপায় ক্ষমতা আর জুলুম। নিজ দেশের প্রান্তগুলো থেকে জঙ্গলাকীর্ণ জনপদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শাসনের থাবা ছোট প্রতিবেশীদের ওপরেও চড়াও হচ্ছে। আর ভারতের প্রতিবেশীগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ যেন তার সব খবরদারি ফলানোর প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। এসবের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে থাকা জনগণের সম্পর্ক নেহায়েত শূন্য।
আজ থেকে ১৩ বছর আগে কুড়িগ্রামে সীমান্তে কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানী থেকে কুলাউড়ার স্বর্ণা এরা ব্রাত্য ও সাধারণ। এরা কেউ কাঁটাতারের ওপারের স্বজনকে ভুলতে পারে না, জীবিকারে এড়াতে পারে না। এসব ব্রাত্যজনরা সাদাত হোসেন মান্টোর ‘ঠান্ডা গোশত’ গল্পের শেষভাগের সেই পরিচয়হীন মেয়েটির মতো, যাকে কালবন্ত কাউরের স্বামী ইশের সিং দাঙ্গাকালে মৃত অবস্থায় ধর্ষণ করেছিলেন। নতুন সীমানা, ধর্ম আর রাষ্ট্রের বেড়াজাল তখন যেমন প্রান্তজনের ওপর সবচেয়ে খড়গহস্ত হয়েছিল, আমাদের ফেলানী-স্বর্ণাদের কথা ভাবলে এখনো তা অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়। ধরুন, ফেলানী-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের যত নাগরিক ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে প্রাণ দিয়েছেন, তারা কি নিজ রাষ্ট্রের শাসকদের সহমর্মিতাটুকু পেয়েছেন? উত্তর হলো, না। কারণ শেখ হাসিনার শাসন আর ভারতের কেন্দ্রের বিজেপি শাসন এসব হত্যাকাণ্ডকে অগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে করেছে। একদিকের শাসক জীবনের চেয়ে সীমানার মূল্যটা বেশি দিয়েছে, আরেক দিকে ক্ষমতার প্রশ্নকে মানুষের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। মান্টোর গল্পের সেই মেয়েটি আমাদের ফেলানী-স্বর্ণার শ্রেণি গোত্রীয়।
লেখক: অনুবাদক ও লেখক
musfikur.muzahid1993@gmail.com