দেশের ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খাতে বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প খাতের উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে যে অভিযোগ জমা পড়েছে, সেখানে দুই খাতে ৫৬ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের তথ্য রয়েছে। এ অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের জমা পড়া অভিযোগ থেকে জানা গেছে, সালমান এফ রহমান ঋণের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৩৬ হাজার কোটি টাকা নিয়েছেন। তার সিন্ডিকেটের কারণে ধ্বংস হয়েছে পুঁজিবাজার। সেখান থেকেও তার পকেটে গেছে ২০ হাজার কোটি টাকা।
আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনকালে নানা সময় নানা কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় আলোচিত ব্যক্তি ছিলেন ঢাকার দোহার-নবাবগঞ্জ এলাকা থেকে নির্বাচিত সাবেক এ সংসদ সদস্য।
দুদকে জমা পড়া অভিযোগের বাইরে দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে নামে-বেনামে সালমান এফ রহমানের আরও ঋণ থাকতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ধারণা, দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে নামে-বেনামে তার প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সাতটি ব্যাংকে ৩৭ হাজার কোটি টাকার ঋণের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে, ২৫ হাজার কোটি টাকা। ইতিমধ্যেই জনতা ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মধ্যে ১৮ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়েছেন সালমান এফ রহমান।
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুদকের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলমকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একজন পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান কাজ শেষ করা হবে।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, সালমান এফ রহমান বছরের পর বছর ধরে নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়ম, বিভিন্ন ব্যাংকের টাকা লোপাটসহ শেয়ারবাজার জালিয়াতি অব্যাহত ছিল। ব্যাংক ও শেয়ারবাজার থেকে জালিয়াতি, কারসাজি, প্লেসমেন্ট শেয়ার ও প্রতারণার মাধ্যমে সালমান যে পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন, তা কয়েক লাখ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে দুটি বড় শেয়ার কেলেঙ্কারির মূল হোতা সালমান এফ রহমান। তিনি শেয়ারবাজারের সাবেক চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে ব্যাংক ও শেয়ারবাজার থেকে হাজার-হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির নায়ক সালমানের কারণে শেয়ারবাজার তছনছ হয়ে যায়। আর বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাত দেউলিয়ার পর্যায়ে গেছে তার কারণে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার পাশাপাশি পণ্য রপ্তানি করে দেশে টাকা না আনার বহু অভিযোগ রয়েছে তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো গ্রুপের বিরুদ্ধে। তিনি প্রভাব খাটিয়ে দেশের সরকারি ও বেসরকারি সাতটি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। এসব ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো আইন মানা হয়নি। বেশিরভাগ ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানতও নেই। আবার বছরের পর বছর ঋণের অর্থ পরিশোধ না করেই বারবার পুনঃতফসিল করেছেন। তার এসব অপরাধজনক কর্মকাণ্ড জানার পরও চুপ ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নথি অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ২১ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সালমান ও বেক্সিমকো গ্রুপ। তবে এতদিন তার নামে জনতা ব্যাংকে ঋণ ১০ হাজার কোটি টাকা দেখানো হচ্ছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে তার ২৯টি প্রতিষ্ঠানে ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড মিলিয়ে ২১ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির তথ্য বেরিয়ে আসে।
অবশ্য সম্প্রতি জানা গেছে, জনতা ব্যাংকে সালমান এফ রহমানের ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংকটিতে সালমানের দুই প্রতিষ্ঠানে ২৩ হাজার ৭০ কোটি টাকার ঋণ স্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের ফান্ডেড ২০ হাজার ২০৮ কোটি এবং নন-ফান্ডেড ৫৪৪ কোটি টাকাসহ মোট ২০ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। আর বেক্সিমকো লিমিটেডে ফান্ডেড ১ হাজার ৯৯৪ কোটি এবং নন-ফান্ডেড ৩২৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী একক গ্রাহককে মূলধনের ২৫ শতাংশের (ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড) বেশি ঋণ দেওয়ার নিয়ম নেই।
অভিযোগে বলা হয়, সালমানের নিজের মালিকানাধীন আইএফআইসি ব্যাংক থেকে শ্রীপুর টাউনশিপ প্রতিষ্ঠানের নামে নন-ফান্ডেড ১ হাজার ২০ কোটি টাকা, সানস্টার বিজনেসের নামে ৬১৫ কোটি, ফারেস্ট বিজনেসের নামে ৬১৪ কোটি, কসমস কমোডিটিস লিমিটেডের নামে ৬১২ কোটি, অ্যাপোলো ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে ৪৫৫ কোটি, আল্ট্ররন ট্রেডিং লিমিটেডের নামে ৪৪৯ কোটি, নর্থস্টোন কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের নামে ৪২১ কোটি, আলফা এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের নামে ৫৬৯ কোটি টাকা এবং অ্যাবসলিউট কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের নামে ৪৬৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই বেনামি।
এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে বিপুল অর্থ ঋণ নিয়েছেন তিনি। ব্যাংকটি থেকে বহু বছর আগে ঋণ নিয়েও কোনো অর্থ পরিশোধ না করেই নিয়মিত থেকে যাচ্ছেন। ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে ফান্ডেড ৮৩৬ কোটি, বেক্সিমকো গ্রুপের নামে ফান্ডেড ৮২৩ কোটি, বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ ও ২-এর নামে ফান্ডেড ২৩৪ কোটি ও নন-ফান্ডেড ৫৯ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন।
অগ্রণী ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো লিমিটেডের নামে ফান্ডেড ৬৬৩ কোটি, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের নামে ফান্ডেড ৩৭৫ কোটি এবং বেক্সিমকো কমিউনিকেশন লিমিটেডের নামে ফান্ডেড ৩০০ কোটি ও নন-ফান্ডেড ৭১ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন। রূপালী ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো লিমিটেডের নামে ৯৬৫ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন। সোনালী ব্যাংকে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের ১ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকার ঋণ। এসব ঋণ পরিশোধ না করার পরও নিয়মিত রয়েছে।
পুঁজিবাজার থেকে হাতিয়েছেন ২০ হাজার কোটি : ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ভয়াবহ ধসের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান এফ রহমানের নাম উঠে আসে। বেক্সিমকো গ্রুপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কোম্পানি একীভূতকরণ ও বন্ড ইস্যু এবং প্লেসমেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির নায়ক ছিলেন সালমান এফ রহমান। তার ইশারায় শেয়ারবাজারে দর ওঠানামা করে। ওই বছর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার চার মাসের মধ্যে সালমান এফ রহমানের কূটকৌশলে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দর বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় বেক্সিমকো গ্রুপ। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৫টি প্রতিষ্ঠান এবং ৩৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। মামলার পরদিনই প্রতিষ্ঠান দুটির চেয়ারম্যান এএসএফ রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান উচ্চ আদালত থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান। উচ্চ আদালত থেকে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা যাবে না বলে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ কারণে ঘটনার অন্যতম অংশীদার বেক্সিমকো ও শাইনপুকুরের বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে ১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির তদন্ত কমিটি কারসাজিতে সালমান এফ রহমানের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায় এবং তদন্ত প্রতিবেদন ১৯৯৭ সালের ২৭ মার্চ সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে আবারও বড় ধরনের ধস নামে। শেয়ারবাজার কারসাজি নিয়ে ২০১১ সালে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান এফ রহমানের নাম আসে। ওই সময় প্রভাব খাটিয়ে বেক্সিমকো ফার্মার প্রেফারেন্স শেয়ার পাস করিয়ে নেন তিনি। এ শেয়ারের মাধ্যমে প্রিমিয়ামসহ ৪১০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেন। একই সময়ে শাইনপুকুর সিরামিকের মাধ্যমে ২৮৬ কোটি এবং বেক্সিমকো টেক্সটাইলের মাধ্যমে ৬৩৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া জিএমজি এয়ারলাইনসের প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে ৩০০ কোটি টাকা নেন। পরে ওই কোম্পানি উধাও হয়ে যায়। ফলে বিনিয়োগকারীদের আর টাকা ফেরত পাননি। আবার তিনি জিএমজি এয়ারলাইনসের নামে সোনালী ব্যাংক থেকে ২২৮ কোটি টাকা ঋণ নেন। ২০১১ সালে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে আইএফআইসি মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেন। ২০১৩ সালে আইএফআইসি ব্যাংকের টাকায় নেপালের লোকসানি প্রতিষ্ঠানের ১০ টাকার শেয়ার ৭৫ টাকায় কেনেন তিনি। এ প্রক্রিয়ায় সেখানে ১২৫ কোটি টাকা পাচার করেন। এ ছাড়া বন্ড ইস্যু করে আরও সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা পুঁজিবাজার থেকে তুলে নেন তিনি। এর মধ্যে সুকুক আল ইস্তিসনা নামের গ্রিন সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে ৩ হাজার কোটি, আমার বন্ডে ১ হাজার কোটি ও বেক্সিমকো প্রথম জিরো কুপন বন্ড দেড় হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।