ছেলে হত্যাকারীদের বিচারের অপেক্ষায় মা

উত্তাল জুলাইতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ ফেনীতেও তীব্র উত্তাপ ছড়ায়। খুনিদের বারুদ-বুলেটের গর্জনে মুহূর্তে ফেনীর মহিপালে হয়ে উঠে রক্তের হোলি। ৫ আগস্ট সরকার পতনের একদিন আগেই ৪ আগস্ট তপ্ত দুপুরে রক্তরাঙা সড়কে পড়ে ছিল ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণের নিথর দেহ। নিহত হয় অরো ৯ জন।

ঢাকার রাজপথে অগণিত শিক্ষার্থীর রক্তস্রোত প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছিল ফেনীতে শহিদ শ্রাবণের হৃদয়ে। মাকে বললেন, আম্মু দেশে অবিচার হচ্ছে। প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। মায়ের ওড়না মাথায় বেঁধে আন্দোলনে চলে যেত সে, কেউ বাধা দিলে বলতো অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ ক্ষমা করবে না।

নিহত শ্রাবণের মা ফাতেমা আক্তার শিউলি বলেন, শ্রাবণ হত্যার বিচার চেয়ে মামলার করলেও আসামিরা সবাই পালিয়েছে। আমি বেঁচে থাকতে হত্যাকারীদের বিচার বাংলার জমিনে দেখে যেতে চাই।

তিনি বলেন, আমার ছেলে বলতো, আম্মু এখনি সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার। আমি বারন করার পরও সে দেশের জন্য প্রতিদিন চলে যেত। আন্দোলনে যাওয়ার সময় আমার একটি ওড়না মাথায় বেঁধে রাখত এবং তার নিজের নাম লেখা একটি জার্সি পরে যেত। তার মামা-বাবা সবাই তাকে বোঝাত কিন্তু সে সবাইকে বলতো, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে আল্লাহর দরবারে জবাব দিতে হবে।

তিনি বলেন, মারা যাওয়ার আগের দিন রাতে (৩ আগস্ট) সে একটু অস্থির আচরণ করছিল। রাত তিনটায় উঠে আমার কক্ষে এসে আমাকে ডাকে, কিছু কথা বলে আবার চলে যায়। সে বলে, তার ভাত খেতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু সে খায়নি। তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে এবং পরবর্তীতে ফজরের নামাজ পড়ে সে ঘুমায়। সেটিই আমার সাথে শেষ কথা ছিল।

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, আমার শ্রাবণের বন্ধু মাহফুজ তার লাশ নিয়ে এসেছিল। স্থানীয় কিছু মানুষরূপী শয়তান তাড়াহুড়ো করে আমার ছেলেকে দাফন করতে চেয়েছিল। আমি আমার শ্রাবণকে একটু আদর করতে চেয়েছি, তার মুখটা আরও কিছু সময় দেখতে চেয়েছি। তারা সেই সুযোগ আমাকে দেয়নি। আমার ছেলেকে আমার কাছে রাখতে দেয়নি তারা।

শ্রাবণের বাবা নেছার আহমেদ বলেন, আমি কীভাবে থাকব। সময় যত যাচ্ছে কষ্ট যেন আমার বুকে পাথর হয়ে আরও বড় হচ্ছে। আমার সন্তানের জন্য গ্রামে না থেকে শহরের ভাড়া বাসায় থেকে তাদের পড়ালেখা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন বুনেছি।

পরিবার সূত্র জানায়, ২০০৪ সালের ১২ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২০২৩ সালে ফেনী সরকারি কলেজ হতে এইচএসসি পাশ করেন। উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভতির্র অপেক্ষায় ছিলেন। তার বাবার নাম নেছার আহমেদ। বাবা মায়ের সাথে শহরের বারাহীপুরে বসবাস করতেন, পৈত্রিক বাড়ি ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নে। তিন ভাইবোনের মধ্যে শ্রাবণ সবার বড় এবং পরিবারের একমাত্র ছেলে। ১৯ বছর ৭ মাস ১৮ দিন বয়সী শ্রাবণ ছিলেন একজন সংগঠক এবং ক্রিকেটার।

সে ন্যাশনাল চিলড্রেন'স টাস্ক ফোর্স (এনসিটিএফ) ফেনী জেলার ২০২১-২২ সালের কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্বপালন করেন বলে জানান সংগঠনটির সাবেক সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান মুরাদ।

মুরাদ জানান, এর আগে সংগঠনটির একাধিক কমিটিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শ্রাবণ। পরবর্তীতে ২০২২ সালের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বপালন করেছেন। এনসিটিএফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করার পর ইয়েস বাংলাদেশ ফেনী জেলার সক্রিয় সদস্য হিসেবে দায়িত্বপালন করেন।

ফেনী ক্রিকেট একাডেমির সদস্য ছিলেন শ্রাবণ। একাডেমির প্রধান এবং কোচ রিয়াজ উদ্দিন রবিন জানান, ফেনীতে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ একাডেমিগুলোর অংশগ্রহণে আয়োজিত দুইটি টুর্নামেন্টে খেলেছিলেন শ্রাবণ। চারিত্রিক দিক থেকে সে ছিল উদাহরণযোগ্য।

শ্রাবণের বন্ধুরা জানান, গত ৪ আগস্ট সরকার পদত্যাগের একদফা আন্দোলনের অবস্থান কর্মসূচিতে মহিপালে অংশ নেন শ্রাবণ। আনুমানিক দুপুর ২টার দিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নির্মমভাবে গুলি চালায় শিক্ষার্থীদের ওপর। এসময় একটি গুলি এসে লাগে শ্রাবণের বুকে। সেখান থেকে বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করে ঘরে নিয়ে যায়। এরপর তাকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।

শ্রাবণে হত্যা ঘটনায় শ্রাবণের মা ফাতেমা আক্তার বাদী হয়ে ফেনী-২ সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীকে প্রধান আসামি করে ১০৫ জনের নামে ফেনী মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। হত্যাকারীদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।