রাজনৈতিক ইন্ধনে নৈরাজ্য

সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এ বিষয়ে এখনই কিছু লিখব না। পরিস্থিতি আরেকটু পর্যবেক্ষণ করে তারপর নিজস্ব মতামত প্রকাশ করব। কিন্তু পরিস্থিতি যে গতিতে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে অন্যরকম কিছু মনে হচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলাম, এটা নিতান্তই শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রকাশ। মনে হয়েছিল শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের প্রকাশ হচ্ছে গণতান্ত্রিক পরিবেশে। শ্রমিকদের ওপর দীর্ঘ বছর ধরে যে বৈষম্য চলেছে, এই মুক্ত পরিবেশে তার প্রকাশ ঘটাচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে একটু খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, একেবারেই উল্টো ঘটনা। বেশ কয়েকজন পোশাকশিল্পের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে যে বিষয় শুনতে পেলাম, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। পোশাকশিল্পের সঙ্গে জড়িত বিজিএমইএ, বিকেএমইএতে আওয়ামী ঘরানার যেসব মালিক রয়েছেন তারাই বিভিন্ন উপায়ে এই সেক্টরকে অস্থির করার পাঁয়তারা করছেন। নানা রকম পথ অবলম্বনের মাধ্যমে গার্মেন্টস শ্রমিক নেতাদের উত্তেজিত করে, সাত-পাঁচ বুঝিয়ে বর্তমান অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে।

কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিক

অসন্তোষকে কাজে লাগিয়েছে একটি রাজনৈতিক পক্ষ এমন অভিযোগ করেছেন পোশাকশ্রমিক নেতারা। মালিকরা বলছেন, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে তৃতীয় পক্ষ এখানে শতভাগ সক্রিয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই তৃতীয় পক্ষ কারা? একটি দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে জানা যাচ্ছে বাংলাদেশ পোশাকশিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মোহাম্মদ তৌহিদুর রহমান বলেন, কিছু পোশাক কারখানায়  অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যা আছে। সেটা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। কয়েকটি কারখানায় বেতন বকেয়া, হাজিরা, বোনাস, টিফিন ভাতা ও শ্রমিক ছাঁটাই নিয়ে অসন্তোষ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি যে ৫০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, তার কারণ বলা হয়েছে নিরাপত্তা। তারপরই বহিরাগতরা বিভিন্ন পোশাক কারখানায় হামলা চালালে ওই কারখানাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। পোশাক কারাখানার ওয়েসটেজ ঝুট ব্যবসায় রয়েছে কোটি কোটি টাকা। আর এই ব্যবসা বরাবরই রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা নিয়ন্ত্রণ করেন। যখন যে সরকার আসে, তখন তাদেরই ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসা চলে আসছে।  

অন্যদিকে কয়েক মাস আগেই পোশাক শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। তাদের সব দাবি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তারপরও বিভিন্ন কারখানায় এই ধরনের আন্দোলনের কী কারণ থাকতে পারে সেটা যখন কেউ বিশ্লেষণ করতে বসেন, তখনই সব পরিষ্কার হয়ে যায়। গার্মেন্টস শিল্প, বিশেষ করে শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। এক সময় সেগুলো স্তিমিতও হয়ে আসে। তাদের বিভিন্ন দাবি কিছুটা হলেও কখনো মানা হয়, আবার কখনো পুরোপুরিই মানা হয়। কিন্তু একটা সমাধান আসে। শান্ত হয়ে যায় পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের বিক্ষোভ। এবার একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর মানে হচ্ছে, উৎপাদন বন্ধ। বিদেশি বায়ারদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো পণ্য সরবরাহ সম্ভব হবে না। এটা কতদিনের জন্য সম্ভব হবে না, তাও এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। যে কারণে বিভিন্ন বায়ার তাদের চুক্তি বাতিল করছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হবে? দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকরা বিভিন্ন সময় তাদের দাবি-দাওয়া জানিয়েছে। এখন সেই ক্ষোভকে কাজ লাগিয়ে একটি পরিচিত রাজনৈতিক পক্ষ বর্তমান পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে উঠেপড়ে লেগেছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে।

সম্প্রতি সাভারের পুরাতন ইপিজেড এলাকায় একটি কারখানার কয়েক হাজার সাবেক শ্রমিক একত্র হয়ে মানববন্ধন করেছেন। ওই কারখানা চার বছর আগেই বন্ধ হয়েছে। এত বছর পর একত্র হয়ে এক মাসের পাওনা বেতনের দাবিতে মানববন্ধনের বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে করছেন কেউ কেউ। মালিকপক্ষের কোনো কোনো প্রতিনিধি বলছেন, আগের যে কোনো শ্রমিকের বিক্ষোভের ঘটনায় নির্দিষ্ট দাবি-দাওয়া ছিল। এবার সুনির্দিষ্ট দাবির বদলে ‘অযৌক্তিক’ দাবির দিকে ঝুঁকে একটি পক্ষ পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে।  একেক কারখানার শ্রমিকরা একেক ধরনের দাবি-দাওয়ার কথা জানাচ্ছে। শ্রমিকদের এ রকম পরিকল্পনাহীন, যুক্তিহীন এবং মারমুখী আচরণ তখনই হয় যখন নির্দিষ্ট কোনো দাবি-দাওয়া থাকে না। এর পেছনে অনেকটা পরিষ্কারভাবেই রয়েছে রাজনৈতিক ইন্ধন। দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই খাতকে কোনোভাবেই অস্থিরতার মধ্যে রাখা যাবে না। শ্রমিকদের ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে কোন পক্ষ এই ধরনের অরাজকতা সৃষ্টি করেছে, তা দ্রুত তদন্ত করে বের করতে হবে। একের পর এক গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ করে দিয়ে এই সমস্যার সমাধান আসবে না। আমাদের অর্থনীতিতে ধস নামার আগেই এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে, পরবর্তী সময়ে আফসোস করেও লাভ হবে না। এরই মধ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে দেশের সবকিছু চলছে। তীব্র প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে সেই পরাজিত পক্ষই কি বিভিন্নভাবে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে? এ বিষয়ে এখনই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। শুধু তাই নয়, এই পরিস্থিতি থেকে কীভাবে বের হয়ে এসে আবার গার্মেন্টস খাতকে স্থিতিশীল করে উৎপাদনের দিকে যাওয়া যায়, সেই চিন্তা করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতার মূল চালিকাশক্তি প্রবাসীদের রেমিট্যান্স এবং গার্মেন্টস বা তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে অর্জিত রপ্তানি আয়। বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে শ্রমবাজার সহজলভ্য এবং সস্তা। শুধুমাত্র এই ব্যাপারটার জন্যই আমাদের পোশাকশিল্পের বিশ্ববাজারে এতটা কদর। একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সব সময়ই অর্থনীতির রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ না থাকলে সমাজও এগুতে পারে না। বিশেষ করে, অনিয়মিত বিরতিতে দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সেই সুযোগে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দুষ্ট দুর্নীতিবাজ চক্র। এক সময় তারা আগের সরকার এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় কায়েম করেছে নিজ নিজ রাজত্ব। এই রাজত্বের দীর্ঘসূত্রতা এবং সঞ্চিত অপশক্তিই আজ দেশে সব উন্নয়নকে চ্যালেঞ্জ করছে যা একটি দেশের জন্য, বিশেষ করে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য চরম বিপজ্জনক সংকেত। এরই মধ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে বিদেশি ক্রেতারা। তারা দিচ্ছেন না নতুন অর্ডার। সামগ্রিকভাবে পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েই নানা ধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

দুঃখ হয় এই ভেবে যে, আমরা কী ভয়াবহ প্রতিশোধপরায়ণ গোষ্ঠী নিজের স্বার্থে যারা দেশের গর্ব, দেশের সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক সুনাম ধুলায় মিশিয়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করেন না সেই তাদের মুখেই আবার দেশ উন্নয়নের বুলি শুনতে হয়েছে দীর্ঘসময়। সময় এসেছে এ ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্তে যাওয়ার। আমরা কোনোভাবেই গার্মেন্টস খাত অস্থিতিশীল দেখতে চাই না। কোনোভাবেই চাই না, পোশাক কারখানার অস্থিরতার সুযোগে আবার কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম নিক। কোনো পক্ষই যেন এই অস্থিরতার ফাঁক কাজে লাগাতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করণীয় যা, তাতে যেন কালক্ষেপণ করা না হয়। 

দেশের উন্নয়নের স্বার্থে আমরা সর্বক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা চাই। বাংলাদেশে যেন এক সময় অন্য দেশের কাছে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টান্ত হয় এই প্রত্যাশা করি। রাজনৈতিক বিরোধিতা মানে, দেশের বৃহৎ রপ্তানি খাতকে হুমকির মুখে ফেলে ফায়দা আদায় করা এটা নিতান্তই আত্মঘাতী। আমার বিশ্বাস, এই ধরনের পরিকল্পনা থেকে বের হয়ে আমরা সুস্থ রাজনীতির পথে ফিরে আসব। পোশাক কারখানাসহ সব শিল্প যেন রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকে।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাতীয় প্রেস ক্লাব

eliaskhan71@gmail.com