মানিকগঞ্জে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৭৫ ঘরের ৬৪টিই এখন গুদাম

সকলের জন্য আবাসন নিশ্চিত করতে বিগত সরকারের নেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নে ৭৫টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বছর পেরিয়ে গেলেও মাত্র ১১টি ঘরে উঠেছে বাসিন্দারা। বাকি ৬৪টির মধ্যে বেশির ভাগ ঘরেই শস্য ও সার মজুত করে রাখা হয়েছে। গৃহ ও ভূমিহীনদের জন্য তৈরি এসব ঘর এখন ব্যবহৃত হচ্ছে গুদাম হিসেবে।

স্থানীয় লোকজন ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, আজিমনগর ইউপি চেয়ারম্যান মো. বিল্লাল হোসেন ঘর দেওয়ার নাম করে বিভিন্নজনের কাছে থেকে ৭০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ করে টাকা নিয়েছেন। টাকার বিনিময়ে তিনি এমন মানুষকে ঘর দিয়েছেন যাদের অন্যত্র বাড়ি রয়েছে। ফলে তারা এ সকল ঘরে না উঠে ঘরগুলোকে শস্য ও মালামাল রাখার গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করছেন।

তবে উপজেলা প্রশাসনের দাবি, এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা এবং সুপেয় পানির জন্য গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় বাসিন্দারা ঘরে উঠছেন না।

স্থানীয়রা জানান, ইউপি চেয়ারম্যান বিল্লালের ছোট ভাই ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মোশাররফ হোসেনসহ তাঁর কর্মীরা আশ্রয়ণ প্রকল্পের এসব ঘর দখল করে সেখানে মালামাল রেখে ব্যবসা করছেন।

সরেজমিনে আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, ৭৫টি ঘরের মধ্যে মাত্র ১১টিতে থাকছে সুবিধাভোগী পরিবার। বাকি ঘরগুলো তালাবদ্ধ রয়েছে। বিদ্যুত সংযোগ আসেনি এখনো; শেষ হয়নি সুপেয় পানির জন্য গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ। পানির ট্যাংকগুলোও ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে। জানালা খোলা থাকায় ৫ নম্বর ঘরে ভুট্টা, একটি ঘরে ধান ও একটি ঘরে বিএডিসির সারভর্তি বস্তার স্তূপ দেখা যায়। এ ছাড়া একটি ঘরে মোটরসাইকেল ও সেচযন্ত্রের যন্ত্রাংশ রাখা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সেগুলো চেয়ারম্যানের ভাই মোশাররফ হোসেনের।

প্রকল্পের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এখানে ঘর বরাদ্দ পেতে দুই শতাধিক পরিবার আবেদন করেছিলেন। তবে যাঁরা চেয়ারম্যানকে টাকা দিয়েছেন, তাঁরাই বরাদ্দ পেয়েছেন। চরে এমনও পরিবার আছে, যারা ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা দিয়েছে। কিন্তু বাকি টাকা দিতে না পারায় তারা ঘরও পায়নি, এমনকি তাদের টাকাও ফেরত দেননি চেয়ারম্যান। এ ছাড়া এমন অনেকে ঘর পেয়েছেন, যাঁদের ঘরের দরকার নেই। তাঁরা মালামাল রাখার জন্য ঘর বরাদ্দ নিয়েছেন। কয়েকটি ঘরে চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন ও তাঁর ভাই যুবলীগের নেতা মোশাররফ ধান, ভুট্টা ও সারের গুদামঘর হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ঘরগুলো বরাদ্দ দেওয়ার সময় চেয়ারম্যানের কাছে একটি ঘর বরাদ্দ চান এনায়েতপুর গ্রামের শুকুর শেখ। তিনি বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যানের কাছের মানুষ হওয়ায় আমার কাছে ৬০ হাজার ট্যাকা চান। পরে চেয়ারম্যানের ভাই মোশাররফের কাছে ৬০ হাজার ট্যাকা দিই। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি ঘরও পাই নাই, টাকাও ফেরত দ্যায় নাই।’

শিকারপুর আদর্শ গ্রামের ওবায়দুল খান বলেন, একটি ঘর বরাদ্দ দেওয়ার জন্য মোশাররফ তাঁর কাছে এক লাখ টাকার দাবি করেন। তিনি ৭০ হাজার টাকা দেন। ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পর বাকি ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। তবে তাঁকে ঘরও দেননি। টাকাও ফেরত দেননি।

এ বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন বলেন, এই প্রকল্পের ঘরগুলো বরাদ্দ দিতে উপজেলা কমিটি রয়েছে। কমিটির সদস্যরা যাচাই-বাছাই করে ঘর দিয়েছেন। তিনি ওই কমিটির একজন সদস্য মাত্র। ঘর বরাদ্দ দিতে টাকা নেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা। প্রকল্পের ঘরগুলোতে মালামাল রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যাঁদের ঘর পেয়েছেন, তাঁরা হয়তো মালামাল রেখেছে। আমি বলতে পারব না।’

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার রহমান বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে আশ্রয়ণ প্রকল্পটিতে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ–সংযোগ দিতে দ্রুত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি কার্যক্রম শুরু করার কথা রয়েছে। সুপেয় পানির অভাব ও বিদ্যুৎ–সংযোগ না থাকায় এখনো অনেক পরিবার ঘরগুলোতে ওঠেনি।