চলমান নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা থেকে গার্মেন্টস শিল্পকে রক্ষায় আশুলিয়ায় শ্রমিক-জনতার সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় আশুলিয়ার পোশাক শ্রমিকদের আগামীকাল শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) থেকে কাজে যোগদানের আহ্বান জানানো হয়।
শুক্রবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকালে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার বিনোদর পার্ক ফ্যান্টাসি কিংডম মাঠে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত এক বছরে নানা সমস্যার কারণে প্রায় ২৭০ টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এরপরও বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকে আছে অন্যান্য কারখানায় উৎপাদন শিথিল ছিলো বলে। তাই আপনারা কারখানা চালু রাখেন। কারখানা চালু থাকলে আপনি বাঁচবেন, আমরা বাঁচবো, দেশ বাঁচবে। শ্রমিকদের দায়িত্ব তাদের শিল্প রক্ষা করা জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের এই ক্লান্তিকালে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সময়ে যারা গার্মেন্টস শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্থ করে দেশকে বাধাগ্রস্ত করতে চাচ্ছে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
তিনি আরো বলেন, আজকে যদি আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে না দাঁড়াই তাহলে পোশাক শিল্পটা ধ্বংস হয়ে যাবে। সম্প্রতি পত্র-পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশ থেকে ১০ থেকে ১৫ পার্সেন্ট অর্ডার শিফট করেছে অন্যান্য দেশে। এই সাময়িক দূর্যোগের সময় ঐক্যবদ্ধভাবে সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। আমরা অতীতেও অনেক সমস্যা অতিক্রম করে বাংলাদেশকে আজকে এখানে এনেছি। এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সময়।
আয়োজিত সমাবেশ থেকে বক্তারা বলেন, গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি গার্মেন্টস শিল্পে অরাজকতা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং মারধরের মতো অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংস হয়ে গেলে দেশের অর্থনীতি এবং দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্বক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের যে সুনাম রয়েছে তা অক্ষুন্ন রাখতে কারো প্ররোচনায় না পড়ে স্বেচ্ছায় স্ব স্ব কর্মস্থলে উপস্থিত হয়ে কাজে যোগদান করবেন। আমরা আশা করবো আপনারা সকল প্রকার অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকান্ড পরিহার করে পোশাক শিল্পকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। আপনাদের হাতেই এদেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতি নির্ভরশীল। সুতরাং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সকল বিভেদ ভুলে দেশের গার্মেন্টস শিল্পকে রক্ষা করতে আগামীকাল শনিবার থেকে নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদান করবেন সেটাই দেশবাসী প্রত্যাশা করে।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে হা—মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একে আজাদ বলেন, ইতিমধ্যে আমরা শ্রমিকদের বেশীরভাগ দাবি মেনে নিয়েছি। শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী হাজিরা বোনার ২২৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে, টিফিন বিল ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, কোন শ্রমিককে যেন ব্লাকলিস্ট করা না হয় এ জন্য কালো আইন বাতিল করা হয়েছে, যোগ্যতার ভিত্তিতে নারী ও পুরুষ শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হবে। এছাড়া কারখানায় যদি কোন কর্মকর্তা শ্রমিকদের সাথে খারাপ আচরন করে থাকে তাহলে অভিযোগ তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকরা কখনও কারখানায় ভাঙচুর করে না। কারন এখান থেকেই তাদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা বাইরে থেকে এসে কারখানায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে, র্যাবের গাড়ি ভাংচুর করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহন ছাড়া কোন উপায় নাই। শনিবার থেকে শিল্পাঞ্চলের ভাঙচুর ও নৈরাজ্য ঠেকাতে এবং দুষ্টের দমন করার জন্য সনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল থেকে আপনারা অন্যরকম সেনাবাহীনি দেখতে পাবেন। গতরাত থেকেই অভিযান শুরু হয়েছে। আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী দুষ্টু লোকের জন্য ভয়ঙ্কর।
ইতিমধ্যে সরকার একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করে দিয়েছেন। এখানে শ্রমিক নেতা আছে, ব্যারিস্টার আছে, মালিকের প্রতিনিধি, বিজিএমইএর প্রতিনিধি আছে। শনিবার সাবাই মিলে শ্রমিক নেতা এবং মালিকদের সাথে বসবে। সেখানে শ্রমিকদের উত্থাপিত দাবির বিষয়ে সরকারকে অবহিত করা হবে।
ঢাকার আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে দুই সপ্তাহের অধিক সময় ধরে শ্রমিকরা হাজিরা বোনাস বৃদ্ধি, শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, টিফিন বিল বৃদ্ধিসহ নানা দাবি আদায়ের আন্দোলন করে আসছে। শ্রমিক আন্দোলনের মুখে গত বৃহস্পতিবার ২১৯ টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ৮৬টি কারখানায় অনির্দিষ্টকালের ছুটি ও ১৩৩টি কারখানা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ। এতে শিল্প পাড়ায় চরম শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। এই অঞ্চলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গতকাল শুক্রবার বিকেলে আশুলিয়ার জামগড়া ফ্যান্টাসি কিংডমের সামনে শ্রমিক জনতার সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।