নিজস্ব সিন্ডিকেটে কাজ বাগিয়ে নিতে ঠিকাদারদের লাইসেন্স নবায়ন করেননি জামালপুর পৌরসভার মেয়র মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন ছানু। এতে সরকারের প্রায় ১৮ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। আর এই কাজ করতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব একটি ‘বাহিনী’। কাজ থেকে বঞ্চিত করেছেন ৩৯৫ ঠিকাদারকে। লাইসেন্স নবায়ন না করে পৌর মেয়রের নিজস্ব সিন্ডিকেটের ঠিকাদারদের দিয়ে কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ বঞ্চিত ঠিকাদারদের। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি সচেতন মহলের। বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন পৌরসভার প্রশাসক।
জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) মির্জা আজমের। সাবেক মেয়র ছানু মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠজন ও আত্মীয় হওয়ায় কেউ মুখ খুলতে সাহস করেননি। একক প্রভাব খাটিয়ে লাইসেন্স নবায়ন না করে সরকারি রাজস্ব ক্ষতি করেছেন তিনি।
পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, জামালপুর পৌরসভায় ২০২০-২১ অর্থবছরে ঠিকাদারি লাইসেন্স ছিল ৩৭৬টি। পরে ২০২১ সালে নির্বাচনের পর মেয়র মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন ছানু দায়িত্ব নিয়ে আরও ৩৪টি নতুন লাইসেন্স দেন। এতে লাইসেন্সের সংখ্যা বেড়ে হয় ৪১০। পরে ২০২২-২৩ অর্থবছরে শুধু ২১টি লাইসেন্স নবায়ন করেন তিনি। বাকি ৩৮৯টি লাইসেন্স নবায়ন করেননি। প্রতিটি লাইসেন্স নবায়ন করতে ২ হাজার ৩০০ টাকা সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা দিতে হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করেন ৮ লাখ ৯৪ হাজার ৭০০ টাকা।
পরের (২০২৩-২৪) অর্থবছরে আরও ছয়টি লাইসেন্স কমিয়ে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মেয়রের বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত মাহমুদুল হাসান অমিতের নামে মেসার্স এ এম এন্টারপ্রাইজ, মোফাখখারুল ইসলাম লিখনের এস এল এন্টারপ্রাইজ, মেয়রের দেহরক্ষী হিসেবে পরিচিত নূরে আলম জিকুর এ আর আর এন্টারপ্রাইজ, মেয়রের ঠিকাদারি ব্যবসার অংশীদার আশরাফুল ইসলাম সিদ্দিকী মামীমের মামীম এন্টারপ্রাইজ, ফুরকানুল আলম রিপনের রিপন এন্টারপ্রাইজ, আব্দুল আজিজের জেনি এন্টারপ্রাইজ ও মঞ্জুয়ারা বেগমের সাউথ এন্টারপ্রাইজসহ তার বিশ্বস্ত এবং ব্যবসায়িক অংশীদারদের নামে ১৫টি লাইসেন্স নবায়ন করেন মেয়র। আর এতে ওই অর্থ বছরে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করেছে ৯ লাখ ৬ হাজার ২০০ টাকা। পৌরসভার মেয়র ছানু দায়িত্বে থাকাকালে তার নিজস্ব সিন্ডিকেটকে কাজ দিতেই সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করেছেন ১৮ লাখ ৯০০ টাকা।
এদিকে মেসার্স আর জে এন্টারপ্রাইজ, জেবি এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স তিতাস কন্সট্রাকশন, মেসার্স আলিফ এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স ফিরোজ ট্রেডলিংক, মেসার্স তামান্না এন্টারপ্রাইজসহ ৩৯৫টি লাইসেন্স নবায়ন না করে পৌরসভার কাজ থেকে বঞ্চিত করেছেন ঠিকাদারদের।
বঞ্চিত ঠিকাদাররা অভিযোগ করে জানান, মেয়র ছানুর ‘বাহিনীর’ ভয়ে কেউ লাইসেন্স নিয়ে কথা বলার সাহস করেননি। পৌরসভার সব কাজ তার ওই ‘বাহিনী’ নিয়ন্ত্রণ করত। তাদের দাপটে দলীয় নেতাকর্মীরাও বঞ্চিত হয়েছেন।
মেসার্স জেবি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ঠিকাদার মো. আনিছুর রহমান মুকুল বলেন, ‘পৌরসভার মেয়র ছানু দায়িত্ব নেওয়ার পরে কাগজপত্র ঠিক থাকলেও আমাদের লাইসেন্স নবায়ন করেননি। লাইসেন্স নবায়ন করার জন্য পৌরসভায় গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেও লাভ হয়নি।’
মেসার্স আলিফ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার লাইসেন্সের বয়স ৯ বছর। আমি লাইসেন্স করার পর অনেক টাকার শিডিউল কিনেছি। কিন্তু পৌরসভার একটা কাজও পাইনি। ছানু ক্ষমতায় আসার পর আমার লাইসেন্স নবায়ন করেননি।’
এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও পৌরসভার প্রশাসক শীতেষ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘এ বিষয়টি জানা ছিল না। আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানলাম।’ বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে তিনি জানান।