ছোট্ট ক্লিয়ারেন্সই মস্ত চ্যালেঞ্জ পিএসসির

চারদিকে ঘোর অনিশ্চয়তা। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। আজ যারা পদে বসে আছেন, আগামীকাল থাকতে পারবেন কিনা জানা নেই। এই অবস্থা পাবলিক সার্ভিস কমিশনেরও (পিএসসি)। অন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন নিজ থেকেই সরে গেছে। কিন্তু তাদের মতো সরতে চায়না পাবলিক সার্ভিস কমিশন। তাই কান পেতে আছেন ‘ডাক’ শোনার জন্য। এ ডাক কাজ চালিয়ে নেওয়ারও হতে পারে আবার সরে যাওয়ারও হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে হাত গুটিয়ে বসেও থাকতে পারছেন না। রুটিন কাজ চালিয়ে নিতে গিয়েই সরকারের কাছে জানতে চেয়েছে ৪৭ বিসিএসের প্রার্থী সংখ্যা। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ তথ্য পাঠাতে বলেছে কমিশন।

নিদেনপক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে দিয়ে বলাতে হবে যে পিএসসি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কবে পরীক্ষা নেবে সেটা তাদের বিষয়। এ ধরনের ছোট্ট ক্লিয়ারেন্স ছাড়া পিএসসি এগুতে পারছে না। এই ছোট্ট ক্লিয়ারেন্স পাওয়াটাই এখন মস্ত বড় কাজ।

পাবলিক সার্ভিস কমিশনের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিএসসি একটি সাংবিধানিক অর্থাৎ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে। গত ১৫ বছরে মনে হয়েছে এটা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি অধিদপ্তর। সেই জায়গাতেই আটকে গেছে পিএসসি। বদলে যাওয়া পরিস্থিতির কারণে পিএসসি ৪৪তম বিসিএসের মৌখিক ও ৪৬ বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা স্থগিত করেছে। যা জনপ্রশাসনকে জানানো হয়েছে। এখন আবার শুরু করতে গেলে জনপ্রশাসনের সম্মতি লাগবে। নিদেনপক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে দিয়ে বলাতে হবে যে পিএসসি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কবে পরীক্ষা নেবে সেটা তাদের বিষয়। এ ধরনের ছোট্ট ক্লিয়ারেন্স ছাড়া পিএসসি এগুতে পারছে না। এই ছোট্ট ক্লিয়ারেন্স পাওয়াটাই এখন মস্ত বড় কাজ।’

সরকারের পক্ষে কমিশনকে সাচিবিক সহায়তা দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তারা ৪৭তম বিসিএসের শূন্য পদ নির্ধারণের কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু কাজ শুরু করলেও বিষয়টি স্বাভাবিক গতিতে এগুচ্ছে না। পুরো কমিশন নিয়েই যেখানে অনিশ্চয়তা সেখানে একটা বিসিএস নিয়ে এগিয়ে যেতে হলে নীতিনির্ধারকদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দরকার। সেই নির্দেশনা দেওয়ার মতোও অবস্থায় নেই সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু পূর্বনির্ধারিত ৩০ নভেম্বর পরবর্তী বিসিএসের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হলে এখনই শূণ্যপদের সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। কারণ কমিশন আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চের মধ্যে প্রিলিমিনারি শেষ করতে চায়। পরবর্তী আট মাসের মধ্যে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষ করে ৩০ নভেম্বরের আগেই চূড়ান্ত ফল বা সুপারিশ করার রোডম্যাপ রয়েছে পিএসসির।

পিএসসির রোডম্যাপের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের একাধিক উপদেষ্টাও মনে করেন, এক বছরের মধ্যেই একটি বিসিএস শেষ করা সম্ভব। বিশেষ করে উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার এ বিষয়ে বেশ সোচ্চার ছিলেন। তিনি মনে করেন, বিসিএসে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে আমাদের তরুণ প্রজন্মের সোনালী সময় কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে তিনি নিশ্চয়ই চাইবেন এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে এক বছরের মধ্যে একটি বিসিএস শেষ করতে। যদিও এরসাথে অনেক সংস্কারের প্রশ্ন রয়েছে। সরকার বিভিন্ন সেক্টরে সংস্কারের জন্য যে কমিশন করেছে তার মধ্যে প্রশাসন সংস্কারের বিষয়ও রয়েছে। বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মুয়ীদ চৌধুরীকে প্রধান করে প্রস্তাবিত কমিশন নিশ্চয়ই পাবলিক সার্ভিস কমিশন সংস্কারের প্রস্তাবও করবে। সম্ভাব্য সেসব সংস্কারের আলোকে পরবর্তী বিসিএস আয়োজন করা হলে তা নির্ধারিত সময়ে শুরু বা শেষ কোনটাই করা যাবে না। এক্ষেত্রে সরকারকে একটা বড় সিদ্ধান্তে আসতেই হবে। 

তাছাড়া একাধিক বিসিএস বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। ৪৬তম বিসিএস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর প্রিলিমিনারি বাতিল করার দাবী তুলেছেন অনেকে। কিন্তু কমিশন সে দাবী কানে তোলেনি। তারা গত ২৮ আগস্ট থেকে এই বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে লিখিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। গত ৯ সেপ্টেম্বর লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা ছিল। এই বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ১০ হাজার ৬৩৮ জন প্রার্থী। তাদেরই লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা। এ বিসিএসে ৩ হাজার ১৪০টি পদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নেওয়া হবে স্বাস্থ্য ক্যাডারে। এরমধ্যে সহকারী সার্জন ১ হাজার ৬৮২ জন ও সহকারী ডেন্টাল সার্জনের ১৬টি পদ রয়েছে। এরপর সবচেয়ে বেশি ৫২০ জনকে নেওয়া হবে শিক্ষা ক্যাডারে।

এছাড়া ৪৫তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার খাতা দেখা হচ্ছে। ৪৪তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর প্রতিদিন ১২০ জনের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। শেষ দিনে অর্থাৎ ১৯ সেপ্টেম্বর ৭৬ জন প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। এই বিসিএসে বিভিন্ন ক্যাডারে ১ হাজার ৭১০ জন কর্মকর্তা নেওয়া হবে। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে ২৫০ জন, পুলিশ ক্যাডারে ৫০, পররাষ্ট্র ক্যাডারে ১০, আনসার ক্যাডারে ১৪, নিরীক্ষা ও হিসাবে ৩০, কর ক্যাডারে ১১, সমবায়ে ৮, রেলওয়ে পরিবহন ও বাণিজ্যে ৭, তথ্যে ১০, ডাকে ২৩, বাণিজ্যে ৬, পরিবার পরিকল্পনায় ২৭, খাদ্যে ৩, টেকনিক্যাল ক্যাডারে ৪৮৫ ও শিক্ষা ক্যাডারে ৭৭৬ জন নেওয়া হবে।

সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এক দিনের বিজ্ঞপ্তিতে ৪৪ ও ৪৬ বিসিএস স্থগিত করেছে। এক দিনে দুই বিসিএস স্থগিতের ঘটনা বিরল। এসব পরীক্ষা কবে শুরু হবে, সে কথা জানে না পিএসসি। স্থগিত পরীক্ষাগুলো নেওয়ার বিষয়ে সরকারকে অবহিত করা হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত পেলেই পরীক্ষাগুলো শুরু করা হবে। 

রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছাড়াও বিসিএসসহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের কারণেও জটিলতায় রয়েছে পিএসসি। যদিও এ বিষয়ে টানেলের শেষ প্রান্তে আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। কারণ পিএসসির নিজস্ব তদন্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। সেই তদন্ত রিপোর্ট সরকারের কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।  

‘বিসিএস প্রিলি-লিখিতসহ গুরুত্বপূর্ণ ৩০ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস’ শিরোনামে একটি টেলিভিশন কয়েক মাস আগে সংবাদ প্রকাশ করে। যেখানে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) ক্যাডার, নন-ক্যাডার বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ করা হয়। তোলপাড় করা সেই সংবাদের পর প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে কমিশনের দুজন উপপরিচালক, একজন সহকারী পরিচালকসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় গ্রেপ্তারকৃতদের আটকে রাখার আইনীভিত্তি দুর্বল হয়ে গেল। পরবর্তীতে আদালতকে পিএসসির নিজস্ব তদন্তের বিষয়টিও আমলে নিতে হবে।

২ বছর ৯ মাস হয়ে গেল এখনো ভাইভাতেই বসতে পারলাম না। কবে ভাইভা হবে, কবে ফল প্রকাশ হবে আমি কিছু ভাবতে পারছি না।

৪৪তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার অপেক্ষায় থাকা এক প্রার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০২২ সালের ১ জানুয়ারি আমি চাকরির আবেদন করি। একই বছরের ২৭ মে প্রিলিমিনারিতে বসি। এরপর লিখিত শেষে করে ভাইভার জন্য প্রস্তুত হয়েছি। এরমধ্যেই আন্দোলন শুরু হলো। ২ বছর ৯ মাস হয়ে গেল এখনো ভাইভাতেই বসতে পারলাম না। কবে ভাইভা হবে, কবে ফল প্রকাশ হবে আমি কিছু ভাবতে পারছি না। ফল প্রকাশের পর আছে পুলিশ ভেরিফিকেশনের ঝামেলা। সেই কাজে লেগে যায় এক দেড় বছর। সব কিছু মিলে চোখে অন্ধকার দেখছি। সরকারের নীতিনির্ধারকদের উচিত চলমান বিসিএসগুলোর জন্য গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া। কারণ এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলেছে। শিক্ষার্থীরা হলে উঠেছেন। এখন বিসিএসগুলো আটকে রাখার কোন কারণ দেখছি না।’