সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়া উচিত। এর ফলে, একজন সরকারি কর্মচারী তার আয়ের একটি অংশ উদ্যোক্তা হিসেবে বিনিয়োগ করতে পারবেন। এতে একদিকে বৈধভাবে আয় করার প্রবণতা বাড়বে, অন্যদিকে কমবে বিদেশে অর্থ পাচার। ট্যাক্স ফাঁকি না দিয়ে কর দিতে উৎসাহিত হবে। চাকরির প্রতি আন্তরিক হবে এবং জনসেবা বৃদ্ধি পাবে।
কী সংস্কার হবে, কেন হবে এসব নিয়ে এখন প্রশাসন জুড়ে আলোচনা। নানা মুনির নানা মতের মতো সাধারণ কর্মচারীরাও এতে অংশ নিচ্ছেন, মতামত দিচ্ছেন। সেসব আলোচনায়ও বিষয়টি উঠে আসছে। সংসদীয় সরকার চালু হবার পর দেশে কার্যত কোন প্রশাসনিক সংস্কার হয়নি। এরশাদ জামানায় মতিন কমিশনই সব শেষ সংস্কার করে। এরপর দফায় দফায় কমিশন হয়েছে, তারা সুপারিশ করেছেন কিন্তু সংস্কার হয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক সংস্কার হবে এ খবরে সংশ্লিষ্টরা পুলকিত।
সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, অনুমোদন নিয়ে কর্মচারীরা বর্তমানেও ব্যবসা করতে পারেন। কিন্তু তাতে নানা জটিলতা। প্রথমত, অনুমতি নিতে গেলেই নানা তথ্য প্রয়োজন হয়। তবে কী কী তথ্য লাগবে তা জনপ্রশাসন বা কোন দপ্তরের ওয়েবসাইটে নেই। কাউকে জিজ্ঞেস করলেও পাওয়া যায় না। ফলে অনুমতি প্রার্থীদের ইচ্ছামতো ঘুরান কর্তারা। আগ্রহীদের দিকে এমন দৃষ্টিতে দেখা হয় যেন ব্যবসার অনুমতি চাওয়া বা ব্যবসা করা অপরাধ।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য রাষ্ট্রপতির অনুমতি ব্যতীত সব ধরনের ব্যবসা আইনত নিষিদ্ধ। ব্যতিক্রম শুধু লেখালেখির মতো বুদ্ধিবৃত্তিক কিছু কাজ।
কেন সরকারি চাকরিজীবীরা ব্যবসা করতে পারবেন না?— এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়না। এ নিয়ে প্রশাসনজুড়ে নানামত। একাংশের মতে, লেখাপড়ার দেমাগ থেকে। যারা ব্যবসা করে তারা পড়ালেখা করে না। আমলারা নিজেদের আলাদা করতে এ ব্যবস্থা করেছেন। কেউ কেউ মনে করেন, চাকরিজীবীদের ব্যবসায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলে সরকারি কাজ বাদ দিয়ে তারা ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন। সরকারি অর্থ ও সম্পদ তছরুপ করে ব্যবসায় বিনিয়োগ করবেন। সরকারি কেনাকাটায় অংশ নিয়ে ফায়দা নিবেন। কাজের মানের সাথেও আপোষ হবে।
চাকরিজীবীদের ব্যবসা সংক্রান্ত বিধিবিধান অদ্ভুত কিসিমের। চাকরিতে ঢোকার আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর পরিবার ব্যবসা করলে সমস্যা নেই। অর্থাৎ আইনের দ্বিমুখী আচরণ। আইনের ভেতরেই বৈষম্য আছে। বৈষম্য আছে চিকিৎসক-ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে সাধারণ কর্মচারীদেরও। বাংলাদেশে চিকিৎসকরা সকালে সরকারি চাকরি করে বিকালে প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখতে পারেন। ইঞ্জিনিয়াররা সরকারি চাকরির পাশাপাশি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম করতে পারেন। পারেন না কেবল অন্যান্য কর্মচারীরা। অথচ তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানে না কয়জন সরকারি কর্মচারী ব্যবসা করছেন। তাদের কোনো জবাব নেই। কিন্তু এসএমই বা অন্য কোন মেলায় গিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের খোঁজ নিলে দেখা যায়, অনেকের স্বামী বা স্ত্রী বা পিতা সরকারি কর্মচারী। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অনেক কর্মসংস্থান হচ্ছে, সচ্ছলতা আসছে পরিবারে, বাজারে পণ্য ও অর্থের যোগান বাড়ছে। অনেকে তাদের পণ্য রপ্তানিও করেন। আর কোনো কর্মচারী যদি ব্যবসার টাকা দেশে বিনিয়োগ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন তাতে দেশেরই লাভ। কারণ এতে বিদেশে টাকা বা মেধা পাচার হচ্ছে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার তার কর্মচারীদের ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা হবার জন্য ১ বছর ছুটি দেয়। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ, ঋণ বা অন্য যেকোনো সহায়তা লাগলে তাও দেয়। ভারতে চাকরির পাশাপাশি ব্যবসার কোন ধরনের অনুমতি না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এ ব্যবস্থা বেশ জমজমাট। সরকারের অনুমতি ও শর্ত সাপেক্ষে সরকারি চাকরির পাশাপাশি অন্য প্রাইভেট চাকরি ও ব্যবসা করতে পারেন দেশ দুটির সরকারি চাকরিজীবীরা।
প্রশাসনে সংস্কারের পর তার সফল বাস্তবায়ন করতে হলে বাস্তবায়নের আগেই সরকারি কর্মচারীদের নিয়ে একাধিক সেমিনার ওয়ার্কশপ করতে হবে। তাদের ঠিকমত আত্মস্থ করাতে হবে। এরপর বাস্তবায়নে নামতে হবে। ফলোআপ করতে হবে। ভুল ও সমস্যা পেলে সমাধান করতে হবে। এগুলো সংস্কারের পথ। এই পথ সাফল্যের সাথে পেরোনোর পর সেটার উপর ভিত্তি করেই স্বাভাবিক কাজ চলতে থাকবে।
বাস্তবায়ন পর্যায়ে যারা নেতৃত্ব দেবেন তাদের প্রশিক্ষিত করতে সেমিনার ওয়ার্কশপ করতে হবে। প্রশিক্ষণ পর্যায়ে বাস্তবায়নে কী সমস্যা হতে পারে তা নিয়ে অনেকেই মুখ খুলবেন না। কিন্তু বাস্তবায়নে গিয়ে হৈ চৈ করবেন। সংস্কার পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় আছে কিনা সেই প্রশ্নটিও উঠেছে। পাশাপাশি উত্তরও আছে। প্রশিক্ষণে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় লাগবে। সেই প্রশিক্ষণে সবাইকে লাগবে না। কোন একটি মন্ত্রণালয় থেকে ২ জনকে নেওয়া হবে। অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও সংস্থা থেকে ১ জন করে প্রশিক্ষণ দিলেই হবে। পরে তারা বাকীদের প্রশিক্ষিত করবে। তারা বাকীদের বাস্তবায়ন ধারণা ও কৌশল শিখিয়ে দিবে।
বাস্তবায়ন নিবিড়ভাবে দেখভাল করতে হবে। বাস্তবায়নে সমস্যা হলে সেগুলোর সমাধান দিবে পর্যবেক্ষণকারীরা। ভুল পেলে সমাধান করতে হবে। আর্থিক ও লজিস্টিকস প্রয়োজন হলে যোগান দিতে হবে। এভাবে রিপোর্ট দেবার পর থেকে বাস্তবায়ন করা পর্যন্ত কমিশন বহাল রাখতে হবে। এজন্য অতিরিক্ত সর্বোচ্চ একমাস কমিশন বহাল রাখতে হতে পারে।
সংস্কার কমিশন প্রধান যদিও আমলা। কর্মজীবনে তিনি বহু সংস্কার করেছেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাক লাগানোর মতো সংস্কার করার মানসিকতা তাঁর রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কমিশনের অনেক সদস্য ও সাপোর্টিং স্টাফ হবেন আমলা। তাদের কাছ থেকে গতানুগতিকতার বাইরে সংস্কার প্রস্তাব পাওয়া কঠিন হবে। এজন্য সরকারি সাবেক ও বর্তমান চাকুরেদের বাইরে থেকেও কমিশনের সমস্যা করা দরকার। ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সংস্কার করেছিলেন বিল ক্লিনটন ও আলগোর সরকার। তারা সংস্কার করার জন্য কোন আমলাকে নিয়োগ দেননি। নিয়োগ দিয়েছিলেন জেনারেল কোম্পানির জিএমকে। তার সুপারিশে সরকার লালফিতার দৌরাত্ম কমিয়েছে, বাড়তি জনবল ছাটাই করেছে। সবশেষে জনসেবা নিশ্চিত করেছে। সরকারের অনেক সেবা ও দপ্তর প্রাইভেট সেক্টরকে দিয়ে পরিচালনা করছে। ফলে অধিকাংশ পাবলিক সার্ভিস প্রাইভেট সেক্টর করছে।
রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল নেপালে আমলারা পেশাদারিত্বের সাথে দেশ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ২০২৬ সালে এল ডি সি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি বা স্ট্যাটাস আদায় করতে তাদের সমস্যা হবে না। তারা ২০৪৩ সালে উচ্চ আয়ের দেশ হতে কাজ করছে। মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশও। একই টাইম লাইনে থাকা বাংলাদেশ নিয়ে আমলারা কতটা সিরিয়াস? নেপাল বাংলাদেশের থেকে অনেক পরে জনশক্তি রপ্তানি তথা বৈদেশিক কর্মসংস্থান করছে। ইতিমধ্যে তারা ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, ইসরাইল, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান এ কর্মী প্রেরণ করছে। তাদের অভিবাসন ও কর্মী ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের থেকে বেশ এগিয়ে গেছে। অপরদিকে বাংলাদেশ ব্রিটিশ আমল থেকে বিদেশে কর্মী প্রেরণ করলেও কোন বৈচিত্র্য আনতে পারেনি। অভিবাসন ও কর্মী ব্যবস্থাপনায় নেপাল থেকে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।
প্রশাসনিক সংস্কারের কিছু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। সংবিধানে আছে দেশকে কল্যাণ রাষ্ট্র করতে হবে। নাগরিককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থার নীতিও সংবিধানে আছে। সংস্কারে বর্তমান যুগের পরিবর্তন ও চাহিদার মিল রাখা দরকার। এইসব মিলিয়ে একটা দারুণ সংস্কার প্রতিবেদনের অপেক্ষা ।