শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

প্রভাবশালী প্রার্থীদের পেছনে ফেলে দেওয়া সাধারণ এক রাজনীতিবিদ

গতকাল শনিবার দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপ দেশ শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ২০২২ সালের চরম অর্থনৈতিক সংকট ও প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাচ্যুতের পর এটাই প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেশটিতে। আর তাই এই নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক সংস্কারের গণভোট হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে, আশা করা হচ্ছে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের।

গতকাল অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে এগিয়ে রয়েছেন দেশটির বামপন্থী ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) অ্যালায়েন্সের প্রার্থী অনুরা কুমারা দিশানায়েকে।

শ্রীলঙ্কার নির্বাচন কমিশনের বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রোববার সকাল পর্যন্ত গণনা শেষ হওয়া দশ লাখ ভোটের মধ্যে দিসানায়েকে প্রায় ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন।

প্রাথমিক ফলাফলে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন শ্রীলঙ্কার বর্তমান বিরোধী দলের নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা। দশ লাখ ভোটের মধ্যে তিনি পেয়েছেন প্রায় ২২ শতাংশ। আর এর পরেই রয়েছেন স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বর্তমান প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে।

শ্রীলঙ্কায় এবারের নির্বাচনের আলোচিত প্রার্থীরা হলেন দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির রনিল বিক্রমাসিংহে, ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার পার্টির নেতা অনুড়া কুমার দিসানায়েক এবং বিরোধী দল সঙ্গী জন বালাওয়েগার (এসজেবি) নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা। এছাড়া রাজাপাকসে পরিবারের প্রার্থী নামাল রাজাপাকসেও রয়েছেন।

মূলত শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বিশিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারগুলোর পরিচিত মুখ দিয়ে পরিপূর্ণ এবারের নির্বাচন। আর তাদেরকে টপকে সামনে এগিয়ে রয়েছেন সাধারণ রাজনীতিবিদ অনুরা কুমারা দিশানায়েকে।

বামপন্থী জোটের প্রার্থী অনুরা কুমারা দিসানায়েকে মূলত একজন মার্ক্সবাদী নেতা হিসেবে পরিচিত। তার দল বিমুক্তি পেরেমুনা (জেভিপি), ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) জোটের বড় শরিক দল।

৫৫ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কান এই রাজনীতিবিদ মূলত বেশ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী দিচ্ছেন এবারের নির্বাচনে। তার দল সরকারে নেই। তিনি যেই রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্ব দেন (ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার) সেই দলটি প্রধান বিরোধী দলও নয়। তারপরও প্রভাবশালী সব প্রার্থীকে পেছনে ফেলে এবারের নির্বাচনে বড় একটি ভোট নিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি।

নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে সঙ্গী জন বালাওয়েগার (এসজেবি) নেতা সাজিথ প্রেমাদাসাকে। প্রেমাদাসা শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রমাদাসার ছেলে। দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলাকালে ১৯৯৩ সালে সাবেক ওই প্রেসিডেন্ট আততায়ীর হাতে নিহত হন।

এছাড়া শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহেও। রাজাপাকসে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভোটাভুটির মাধ্যমে তাকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দেয় শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্ট। শ্রীলঙ্কার প্রথম নির্বাহী প্রেসিডেন্ট জে আর জয়বর্ধনের ভাগ্নে তিনি।

২০২২ সালে অর্থনীতি ভেঙে পড়ার পর নিত্যপণ্যের ব্যাপক ঘাটতি এবং আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় শ্রীলঙ্কাতে। মূলত সে সময়ই তার দল এনপিপির জন্য টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব উপস্থিতি দিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি।

রাজাপাকসে ভাইদের পদত্যাগে তৈরি হওয়া ক্ষমতার শূন্যতা দিসানায়েকে এবং তার দলের জন্য বৃহত্তর পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করে দেয়। প্রতিনিয়ত সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান দেশটির জনগণকে আকৃষ্ট করে।

এছাড়া নিজের নির্বাচনীয় প্রচারণায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছান তিনি।

শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে ১৭৭ কিমি দূরে অনুরাধাপুরা জেলার থামবুটেগামা গ্রামে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯৬৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন দিশানায়েকে। কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ডিগ্রি নিয়ে স্নাতক হন তিনি। ২০০০ সালে প্রথম সংসদ সদস্য হন দিসানায়েকে।

২০১৪ সালে দিশানায়েককে দল বিমুক্তি পেরেমুনাতে (জেভিপি) নেতা হিসেবে নিযুক্ত পাওয়ার পর থেকে তিনি দলের ভাবমূর্তিটিকে উন্নত করার লক্ষ্যে এবং সহিংস অতীত থেকে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।