পরিযায়ী পাখিদের নিয়ে কিছু গবেষণার তথ্য সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে জানা যাচ্ছে নানা তথ্য। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
শুরু হয়েছে পরিযায়ী পাখির মৌসুম। এ সময় অজস্র পাখি এক দেশ থেকে আরেক দেশে যায়। এতদিন যেসব দেশে থাকত তারা, সেখানে শরতের উষ্ণ আবহাওয়া তাদের জন্য কষ্টকর। এ অস্বস্তি থেকে দূরে থাকতে তারা পাড়ি জমায় শীত আছে এমন দেশে। তবে খুব বেশি শীতের দেশে তারা যায় না। বাংলাদেশের মতো কম শীতের দেশে তাদের অভিবাসন ঘটে। যদিও তা সাময়িক। কয়েক মাসের জন্য আসে তারা। আরামদায়ক পরিবেশের খোঁজে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এখন হাজার হাজার মাইল পথ উড়ছে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাবে তারা। এ জন্য তাদের পরিযায়ী পাখি বলা হয়। এসব পাখিকে দেখা যায় দল বেঁধে উড়তে। তবে এই যাত্রায় তাদের শারীরিক অবস্থা কেমন থাকে, পরিবেশ, ভৌগোলিক নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে হয়। খাদ্যসহ তাপমাত্রাজনিত সমস্যায় পড়তে হয়। যা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হয় দীর্ঘকাল। তবে সাম্প্রতিক এক আবিষ্কারে জানা গেছে, এসব পাখি একা একা ওড়ে না। তারা তার সঙ্গীকে নিয়ে যায় দেশ ভ্রমণে বের হলে। নিউ ইয়র্ক টাইমসে বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিবেদক এমিলি এনথেস লিখেছেন, পরিযায়ী পাখিরা শরৎকাল এলে বিপদে পড়ে যায়। সে জন্য শীতকালীন জলবায়ুতে পৌঁছানোর জন্য অনেক পাখিকে শত শত বা হাজার হাজার মাইল উড়তে হয়। যার জন্য প্রচুর পরিমাণে শক্তি ব্যয় করতে হয় এবং ঝড়, আকাশচুম্বী ভবন এবং অন্যান্য সম্ভাব্য হুমকি সফলভাবে এড়াতে হয়। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘকাল ধরে ভেবে আসছিলেন, পরিযায়ী পাখিরা শীতের এলাকায় পৌঁছে গেলেও যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি তাদের শরীরে সঞ্চিত থাকে, যা তাদের উষ্ণ রাখে। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব অ্যানিমেল বিহেভিয়ারের আচরণগত পরিবেশবিদ নিলস লাইনেক বলেন, কিন্তু কেউ কখনো এ বিষয়টি পরীক্ষা করেনি।
শক্তি সঞ্চয়
তবে এ বিষয়ে ডা. লাইনেক এবং তার সহকর্মীরা গবেষণা করেছেন। জার্মান ব্ল্যাকবার্ডের ওপর ভিত্তি করে তাদের অনুসন্ধান প্রচলিত জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করে। বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন, ব্ল্যাকবার্ডরা অভিবাসনের সময় শ্রম ব্যয় করে। বুধবার নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশনে প্রকাশিত এই গবেষণায় আরও জানা গেছে, অভিবাসনে ইচ্ছুক পাখি তাদের যাত্রার জন্য বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। রাতে তারা খুব ধীরে ওড়ে যেন খাবার হজম ধীরে হয় এবং শক্তি সঞ্চিত থাকে। গবেষকরা বলছেন, তাদের ফলাফলে অনেক চমক ছিল। গবেষকরা জানাচ্ছেন, সাধারণ ব্ল্যাকবার্ড গ্রীষ্মকাল দক্ষিণ জার্মানির বনে কাটায়। বেশিরভাগ পাখি শীতের জন্য সেখানেই অপেক্ষায় থাকে। তবে তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অক্টোবর এবং নভেম্বরে দক্ষিণে উড়ে যায়। এই অভিবাসীরা শীতকাল দক্ষিণ ইউরোপ বা উত্তর আফ্রিকায় কাটায়। এপ্রিলের প্রথম দিকে তারা আবার জার্মানিতে ফিরে আসে। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের পক্ষে ছোট ও বুনো পরিযায়ী পাখিদের পর্যবেক্ষণ করা, তাদের শক্তির খরচ হলো কতটা তা জানা ছিল কঠিন। তবে সম্প্রতি ক্ষুদ্র একটি যন্ত্র বা ‘ডেটা লগার’ একে সম্ভব করে তুলে। এটি পাখির শরীরে পরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ওই পাখিকে ‘ফিটনেস স্মার্টওয়াচ’ পরা বলে মনে হয়। এই ‘স্মার্টওয়াচ’ বা যন্ত্রটি পাখির শরীরের তাপমাত্রা মাপতে পারে। যন্ত্রগুলো সেপ্টেম্বর থেকে মে পর্যন্ত প্রায় নয় মাস প্রতি ৩০ মিনিটে প্রতিটি পাখির শরীরের তাপমাত্রা এবং হৃৎস্পন্দন রেকর্ড করেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হৃৎস্পন্দন শক্তি ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত। একটি পাখি যত বেশি শক্তি ব্যবহার করবে, তার হৃৎস্পন্দন তত বেশি হয়। বিজ্ঞানীরা ১১৮টি ব্ল্যাকবার্ডের শরীরে ‘ডেটা লগার’ স্থাপন করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তারা ৮৩টি পাখির তথ্য পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য নিশ্চিত করেছে যে, পরিযায়ী পাখিদের গড়ে অন্তত ৫০০ মাইল উড়তে হয়। এ জন্য পাখিদের অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় করতে হয়। গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, দীর্ঘ ওড়ানোর জন্য পাখিরা আগে থেকেই শরীরে শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করে। তারা দেখেছেন, জার্মানি ছাড়ার চার সপ্তাহ আগে থেকে অভিবাসনে ইচ্ছুক পাখিদের রাতের হৃৎস্পন্দন কমতে শুরু করে। প্রায় দেড় সপ্তাহ পরে রাতে শরীরের তাপমাত্রাও কমে যায়। ডা. লাইনেক বলেন, মনে হচ্ছে তারা তাদের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের অঙ্গ বন্ধ করে দেয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন যারা জার্মানি ছেড়ে অন্য দেশে যাবে না সেসব পাখির মধ্যে ঘটেনি।
গবেষকরা গণনা করে দেখেছেন, নির্দিষ্ট আবহাওয়ায় পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিটি পাখির শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য কত শক্তি প্রয়োজন হবে। তারা বলেছেন, অভিবাসী পাখিরা শীত জুড়ে জার্মান বাসিন্দাদের তুলনায় শরীরের তাপমাত্রা কিছু বেশি বজায় রেখেছিল। তারা এটি করতে অনেক কম শক্তি ব্যয় করে। গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন, শীতকালে জার্মানিতে থাকা একটি ব্ল্যাকবার্ডকে শরীর উষ্ণ রাখার জন্য অতিরিক্ত ১৮,৬০০ কিলোজুল খরচ করতে হয়, যা প্রায় ৪৪০০ ক্যালোরির সমতুল্য। ডা. ইয়ানকো বলেন, মাত্র কয়েক আউন্স ওজনের একটি পাখির জন্য এ পরিমাণ শক্তি ব্যয় অনেক। তারা বলছেন, অভিবাসী পাখিরা যে শক্তি সঞ্চয় করেছিল তা অন্য কিছুতে ব্যয় হয়। আমরা পুরোপুরি জানি না যে, সেই শক্তি কোথায় যাচ্ছে। এটি সমাধান করার জন্য পরবর্তী বড় রহস্যের ধরনের। তারা অনুমান করছেন, অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ‘লুকানো খাতে’ এসব শক্তি খরচ হয়ে থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, হয়তো অপরিচিত অঞ্চলে শীতকাল কাটাচ্ছে বলে অজানা-অচেনা হুমকির বিষয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হয় তাদের। আরেকটি সম্ভাবনা হলো পরিযায়ী পাখিরা সেই অতিরিক্ত শক্তি অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ করতে পারে, যেমন- প্রজনন।
জলবায়ু পরিবর্তন
আরেক দল গবেষক বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন পাখিদের অভিবাসনের ক্ষেত্রে সংকট তৈরি করছে। বসন্তের আগমনে হেরফের ঘটছে। কখনো তা তাড়াতাড়ি আসছে, আবার দেরিতেও আসছে। গবেষকরা বলছেন, কয়েক দশক ধরে অধ্যয়ন করা ডেটা দেখায় যে, উষ্ণ তাপমাত্রা আগে আসছে। ওকলাহোমা রাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ বাস্তুবিদ্যা ও ব্যবস্থাপনার অধ্যাপক এবং রবার্টসনের চার সহ-লেখকের একজন স্কট লস বলেছেন, এ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অংশে বিশেষ করে পূর্বার্ধে, বসন্তের তাপমাত্রা গড় সময় থেকে ১০-১৫ দিন আগে দেখা গেছে। কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির সহ-লেখক কাইল হর্টন বলেছেন, পাখিরা এই পরিবর্তনগুলোতে সাড়া দিচ্ছে।
এ বছরের শুরুর দিকে জাতিসংঘের কনভেনশন অন দ্য কনজারভেশন অব মাইগ্রেটরি স্পিসিস অব ওয়াইল্ড অ্যানিমেল দ্বারা প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক রিপোর্টে জলবায়ু পরিবর্তনকে পাখিদের জন্য শীর্ষ তিনটি হুমকির একটি হিসেবে তালিকাভক্ত করা হয়েছে। এটি পরিযায়ী প্রজাতির জন্যও হুমকি। উষ্ণতা কিছু পাখির প্রজাতিকে তাদের মাইগ্রেশন প্যাটার্ন পরিবর্তন করতে এবং তাদের প্রজননস্থলে আগের চেয়ে দিন বা সপ্তাহ আগে পৌঁছাতে প্ররোচিত করে। যা সংকট তৈরি করতে পারে। কারণ পাখির বাচ্চাকে পোকা, গাছের পাতা বা কীট খেয়ে বাঁচতে হয়। কিন্তু যদি প্রকৃতিতে এসবের উপস্থিতি না থাকে তাহলে এসব বাচ্চার টিকে থাকা কষ্টকর হয়। ন্যাশনাল অডুবনের ডিজিটাল সায়েন্স অ্যান্ড ডাটা প্রোডাক্টের ডিরেক্টর মেলানি স্মিথ বলছেন, নির্দিষ্ট সময়ে আগে পাখির বাচ্চা ডিম ফুটে বের হলে প্রয়োজনীয় বড় পোকামাকড় যদি না পায় তাহলে তা জীবনের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দেয়।
সঙ্গী
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মুহূর্তে শীতকালীন স্থানান্তরের অংশ হিসেবে কোটি কোটি পাখি ডানা মেলেছে। এ ঘটনা এত বড় পরিসরে হয় যে মানুষের পক্ষে সম্পূর্ণরূপে বোঝা কঠিন। কিন্তু একটি নতুন গবেষণায় এসব পাখিদের বিষয়ে নতুন তথ্য দিচ্ছে। উত্তর-পূর্ব এবং গ্রেট লেক অঞ্চলের পাঁচটি মাইগ্রেশন সাইট থেকে সংগৃহীত অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি রেকর্ড ব্যবহার করে, বিজ্ঞানীরা জেনেছেন যে, বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরা স্থানান্তরের সময় বন্ধুত্ব পাতায়। গবেষকরা বলছেন, পাখিদের পারস্পরিক এ সম্পর্ক পরিবেশগতভাবে অর্থবহ হতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো মানব-সৃষ্ট ব্যাঘাতের দ্বারা সম্ভাব্য হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। সম্প্রতি প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসে প্রকাশিত হয় এ প্রতিবেদন। পাখির স্থানান্তর অধ্যয়ন করার জন্য, গবেষকরা প্রায়ই জালে পাখি ধরেন এবং সংখ্যাযুক্ত লেগ ব্যান্ড দিয়ে চিহ্নিত করেন। এভাবে পরিচালিত কিছু গবেষণায় পাখিদের সামাজিক সংযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষক জোইলি ডিসিমোন বলেন, চিন্তা করুন লাখ লাখ পাখি একটানা উড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তারা এমন আবাসস্থলে পৌঁছায়, যা তারা আগে কখনো দেখেনি। তখন তারা থাকে ক্ষুধার্ত এবং তাদের শক্তির দরকার হয়, তাদের শরীরে চর্বির সঞ্চয় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন হয়। তখন এক পাখি অন্য পাখিকে প্রতিযোগী হিসেবে ভাবাই স্বভাবিক। তবে এটাও দেখা গেছে যে, তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠছে। ডিসিমোন বলেছেন, দ্রুত খাবার খুঁজে বের করতে অন্যান্য পাখির উপস্থিতি নতুনদের কাছে সংকেত দেয় যে, এ আবাসস্থলটি ভালো। কানাডার পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববিজ্ঞানী জ্যানেট এনজি বলেন, এখানে প্রচুর গবেষণায় দেখা গেছে, পাখিদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।
আনেজি এবং তার কিছু সহকর্মী আগস্ট মাসে ম্যাসাচুসেটসের একটি সৈকতে এক জোড়া সেমিপালমেটেড স্যান্ডপাইপারকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। সেমিপালমেটেড স্যান্ডপাইপার আর্কটিক থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত অভিবাসনের জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করে। এনজি বলেন, যা মন ছুঁয়ে গিয়েছিল তা হলো এই বিশেষ জুটির পায়ের ট্যাগগুলো। যা জানান দিচ্ছিল যে দুই বছর আগে কানাডার নিউ ব্রান্সউইকে তাদের পায়ে এ ব্যান্ড পরানো হয়েছিল। দুবছর পর দেখা গেল, এ পাখিরা আবার একসঙ্গে।