আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধনী প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। এ প্রস্তাবনার ওপর নিজেদের অভিমত দিয়েছেন আইন ও বিচার সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা। সোমবার বিকেলে রাজধানীর বিচার প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ সংশোধন বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আইন ও বিচার উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
আইনের সংশোধনীর প্রস্তাবে কোনো রাজনৈতিক দল যদি এ আইনের অধীন কোনো অপরাধ করে তাহলে সে দলকে ১০ বছর পর্যন্ত নিষিদ্ব করার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া অভিযুক্ত চাইলে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারবে। সংশোধনীর প্রস্তাবে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি সাপেক্ষে দেশি- বিদেশি পর্যবেক্ষক আদালতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এছাড়া প্রায় সকল রকম ডিজিটাল সাক্ষ্যকে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
আইন ও বিচার উপদেষ্টা বলেন, এখানে জাতীয়ভাবে একটি আবেগের বিষয় আছে। আমরা বিচার প্রক্রিয়ার খুব কাছাকাছি থাকতে চাই। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে কোনো প্রতিশোধ চাওয়া বা প্রতিহিংসা নয়, আমরা সুবিচার চাই। আপনারা নিজের চোখে দেখেছেন কি ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আমরা কখনো বিশ্বাস করতে পারতাম না যে একটা দেশের বৃদ্ধ প্রজন্ম একটা তরুণ প্রজন্মকে উন্মত্তভাবে খুনের নেশায় মেতেছিল। আমাদের চোখের সামনে আমরা দেখেছি।’
আসিফ নজরুল বলেন, ‘যত বেদনা ও ক্ষোভ বুকের ভিতর থাক, আমরা এই চ্যালেঞ্জটা (বিচার প্রক্রিয়া) সম্পর্কে সম্পুর্ণ সচেতন আছি যে এই বিচারটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, ‘এই বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক কোনো বিচারক রাখা উচিত এই কারণে যে, আমার সবাই একমত ভূক্তভোগীদের বিচার পেতেই হবে। আমরা জানি কি অন্যায় হয়েছে। এখন আমাদের মধ্যে একেবারে নিরপেক্ষ সবকিছু পাওয়া একটু অসম্ভবই বলব। সেই আস্থাটা আনতে একজন অন্তত আন্তর্জাতিক বিচারক বসাতে হবে।’
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘খসড়া সংশোধনী দেখে মনে হয়েছে আসামিদের ইন্টারেস্ট ও রাইটস প্রটেক্টকে বেশি ফোকাস করা হয়েছে। সেখানে আসামিদের পাশাপাশি প্রসিকিউশন যেন বিদেশ থেকে আইনজীবী আনতে পারে সেরকম বিধান থাকা উচিত।’
একই সঙ্গে ভূক্তভোগীদের পরিবারের পক্ষে আইনজীবী রাখা যায় কি না সে বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘সকলের মতামতের ভিত্তিতে এই আইনকে এমনভাবে তৈরি করা হোক যাতে ভুক্তভোগী এবং আসামি উভয়েই ন্যায়বিচার পায়।’
আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর খসড়াটি তুলে ধরেন আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. আশফাকুর রহমান। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীর কারণে জেন্ডার ও কালচারাল গ্রাউন্ডেও যদি কোনো সিভিলিয়ানের ওপর ব্যাপক সিস্টেমেটিক আক্রমণ হয় তাহলে তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে যা পূর্বের আইনে ছিল না।
আইনের ৩ (৩) ধারা সংক্রান্ত সংশোধনীর প্রস্তাবে বলা হয়, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ, ইত্যাদি অপরাধের দায় বা লায়াবিলিটি নির্ধারণ করতে ট্রাইব্যুনাল রোম স্ট্যাটিউটের ধারা ৯ অনুযায়ী গৃহীত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বিবেচনা করার সুযোগ পাবে। আইনের ৪ (২) ধারার সংশোধনীর প্রস্তাব অনুযায়ী, এ আইনের অধীনে অপরাধ হতে পারে এটি জানা সত্ত্বেও যদি কোনো সংস্থা, সংগঠন, দল, সংঘবদ্ধ চক্র বা সত্ত্বার নেতৃত্বে থাকা ব্যাক্তি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয় তাকেও বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হবে, যা বর্তমান আইনে নেই।
এছাড়া ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যের ভিডিও স্ট্রিমিং বা অডিও ভিজ্যুয়াল রেকর্ডিং এর সুযোগ রাখা হয়েছে। এ সংশোধনীর বুনিয়াদে বিচাকার্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ট্রাইব্যুনাল চাইলে শুনানি সরাসরি সম্প্রচার করতে পারবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য ও মতামত প্রদান করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন, সমবায় উপদেষ্টা ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না, নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. বদিউল আলম মজুমদার, শিল্প, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম রব্বানী, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ইকতেদার আহমেদ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ও অধ্যাপক নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বেগম আসমা সিদ্দীকা, ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী অফিসের কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন, সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট ড. জাহেদ উর রহমান, সাঈদ আব্দুল্লাহ, সানজিদা ইসলাম, শরিফ ভূঁইয়া প্রমুখ।