হাতে-পিঠে বুলেট নিয়ে আলতাফের দুঃসহ জীবন 

খুলনার কয়রা উপজেলার মদিনাবাদ গ্রামের আবু মুসা গাজীর ছেলে আলতাফ হোসেন (২৪)। গত ৫ আগস্ট কয়রা উপজেলার জায়গীর মহল এলাকায় আন্দোলনের সময় পুলিশের ছোড়া সিসা বুলেটে তিনি আহত হন। তার পিঠে ও হাতে প্রায় ৫০টি বুলেট বিদ্ধ হয়। তিনি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে বন্ধুরা তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

গুলিবিদ্ধ আলতাফ। ছবি: দেশ রূপান্তর

ওই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পর তার শরীরে থাকা কিছু বুলেট বের করা হয়েছে। তিনি গত ৫ আগস্ট থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত ওই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সেখানে থাকা অবস্থায় তাকে নিজের টাকায় ওষুধ কিনতে হয়েছে। শরীর থেকে কিছু বুলেট বের করার পর তাকে বাড়িতে পাঠায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিছুদিন বাড়িতে থাকার পর তার শরীরে যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। তিনি গত ৮ সেপ্টেম্বর ফের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারেন তার শরীরে গুলি এখনও আছে। সেগুলো অপসারণ না করলে শরীরে ব্যথা বাড়তে থাকবে। পরে চিকিৎসকরা আরও কিছু গুলি বের করার পর গত ১৫ আগস্ট জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) রেফার্ড করেন। সেই রেফার্ড কপি নিয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি পঙ্গু হাসপাতালে যান। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেড নেই জানিয়ে তাকে বাড়িতে ফিরে যেতে বলেন। তা সত্ত্বেও তিনি তিনদিন ধরে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার জন্য চেষ্টা করেন। তবুও তিনি ভর্তি হতে পারেননি।

পরে হতাশ হয়ে বাড়িতে ফিরে যান। বাড়িতে যাওয়ার পর শরীরে থাকা গুলির জন্য তিনি কাতরাতে থাকেন। পরে তার মামা ফের আজকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল) নিয়ে আসেন। সেখানে মডেল বি-ওয়াডের্র ৪৭ নম্বর বেডে ভর্তি হয়েছেন। সেখানে আলতাফের সঙ্গে কথা হয়।

আলতাফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্দোলনের দেড় মাস পার হলেও আমার শরীরের হাতে ও পিঠে এখন পর্যন্ত ১০টির মতো সিসা বুলেট আছে। আমি অসহ্য যন্ত্রণায় রাতে ঘুমাতে পারি না। এমনকি পিঠে ভর দিতে পারি না। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই দফায় চিকিৎসা নেওয়ার পরেও আমার শরীরে গুলি রয়ে গেছে। এগুলো বের করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তাই আজ পঙ্গু হাসপাতালে এসেছি। এখানে এর আগেও একবার এসে ফেরত গিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবা অন্যের বাড়িতে কাজ করে আমাদের সংসার চলান। আমি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়ার মতো টাকা আমাদের নেই। খুলনার ডাক্তাররা বলছেন, ‘এখন যেসব গুলি আমার শরীরে আছে তা বের করতে গেলে নাকি আমার হাত কেটে ফেলতে হবে। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য আমি পঙ্গু হাসপাতালে এসেছি। যাতে আমার চিকিৎসাটা সরকারিভাবে হয়। আমি যেন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারি।’

গুলিবিদ্ধ আলতাফ দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, ‘এতদিন সাহায্য সহযোগিতা না পেলেও আজ হাসপাতালে এসেই সমন্বয়ক সারজিস ভাই আমার খোঁজ খবর নিয়েছেন। তিনি আমাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতাসহ আমার চিকিৎসা যাতে যথাযথভাবে হয় সেই তাগাদা দিয়েছেন।’

এদিকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতালে) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে আহতদের দেখতে যান সমন্বয়ক সারজিস আলম। তিনি হাসপাতালে ভর্তিরতদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন। এছাড়াও আহতদের হাতে আর্থিক  সহযোগিতা তুলে দিয়েছেন।

এসময় সমন্বয়ক সারজিস আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই হাসপাতালে এখনও ৬৫ থেকে ৭০ জন ভর্তি আছেন। আন্দোলনের এতদিন পর্যন্ত তারাই ভর্তি আছেন যাদের মেজর সমস্যা হয়েছিল। আমরা দেখেছি এখানে কারও হাত নেই, কারও পা নেই এমনকি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ওই ক্ষত চিহ্নটি শুকাতে সময় লাগছে এমন আহতরা ভর্তি আছেন। তাদের পাশে থাকা আমাদের দায়িত্ব। তাদের শারীরিকভাবে যে বড় ক্ষতটি হয়েছে সেটি পূরণ করা সামর্থ্য আমাদের কারও নেই। সেই জায়গা থেকে আমাদের উচিত তাদের পাশে থাকা, আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা।’