মব জাস্টিস বিচারবহির্ভূত হত্যা

জনাকীর্ণ বাজারের কাউকে চোর বলে ধাওয়া করলে আর রক্ষা নেই। শত শত হাত উঠে আসে। কে কী কারণে কাকে মারছে তার খবর নেই। এমনকি নিতান্ত গোবেচারা লোকও গোপনে দুটি লাথি দিয়ে যেতে পিছপা হন না। শহর কিংবা গ্রামে এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে এ দেশের মানুষ কমবেশি পরিচিত। আমরা যাকে গণপিটুনি বলি। ইদানীংকালে অবশ্য ‘মব’ হিসেবে পরিচিত। মব জাস্টিস বা মব লিঞ্চিং শব্দগুলোর ব্যবহার ইদানীং খুব বেড়েছে। ‘মব’ শব্দটির অর্থ মূলত এমন একটি উত্তাল ক্ষুব্ধ বা হুজুগে জনতা, যারা সহজে হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। আকস্মিকভাবে সৃষ্ট এই ক্ষুব্ধ বা হুজুগে জনতা দ্বারা যখন বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় তখন তাকে ‘মব লিঞ্চিং’ বলে। আর ‘মব জাস্টিস’ বলতে এই ধরনের জনতার দ্বারা সংঘটিত মারপিট বা হত্যাকাণ্ডকে বিচার হিসেবে বুঝায়। শব্দ বা ভাষা প্রয়োগের আধুনিকতায় আমরা ‘মব জাস্টিস’ অথবা ‘মব লিঞ্চিং’ যাই বলি না  কেন আদতে আমরা গণপিটুনির যুগেই আছি। ‘মব লিঞ্চিং’ বা ‘মব জাস্টিস’কে এদেশে গণপিটুনি অথবা গণধোলাই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কোনো কারণে দুর্ঘটনা বা কোনো অপরাধের ঘটনায় প্রতিবাদ চলতে পারে, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিরোধ হতে পারে, কথিত অপরাধীর ওপর চড়াও হওয়াটা অপরাধ। আর তিনি যদি মারাত্মকভাবে আহত হন সেটা ফৌজদারি অপরাধ বা মৃত্যুবরণ করেন তবে তা অবশ্যই বিচারবহির্ভূত হত্যা।

সমাজে অনেক বড় বড় অন্যায় হচ্ছে, অর্থপাচার হচ্ছে তার কোনো বিচার হচ্ছে না। তা নিয়ে মানুষের প্রতিবাদও তেমন নেই। কিন্তু ছোটখাটো অপরাধের অভিযোগে বা অভিযোগ তুলে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে এর কী ব্যাখ্যা হতে পারে। হয়তো অবদমিত মানুষ যেখানে পারছে তার ক্ষোভ প্রকাশ করছে। যেখানে ক্ষোভ উগড়ে দিলেও তার ক্ষতি হবে না সেখানে সে মবের অংশ হচ্ছে। হয়তো মনে করছে অনেক মানুষের মধ্যে তাকে চিহ্নিত করা যাবে না। তবে সবটাই আমাদের মানসিক, সামাজিক, আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার প্রতিফলন।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত একটি গণপিটুনির ঘটনায় বিচারের নজির পাওয়া যায়। ২০১১ সালের ১৭ জুলাই শবেবরাতে ঢাকার পাশেই আমিন বাজারের বড়দেশি গ্রামে ছয় ছাত্রকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। আর ওই হত্যাকাণ্ড নিয়ে তখন সারা দেশে তোলপাড় হয়। সেই হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পর আদালত ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনকে কারাদণ্ডের আদেশ দেয়। কিন্তু এই রায় চূড়ান্ত নয়। এখনো মামলাটি আপিল আদালতে ঝুলে আছে। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ঢাকার উত্তর বাড্ডা এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে তাসলিমা বেগম রেনু নামে এক মাকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। তখন সারা দেশের মানুষ গণপিটুনির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। সেই ঘটনায় মামলা হলেও তার বিচার এখনো শেষ হয়নি।

একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৯ সালেই গণপিটুনির শিকার হয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হন। এর সংখ্যা ছিল ৬৫ জন। এরপর ২০২০ সালে সারা দেশে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৫ জন, ২০২১ সালে ২৮ জন। ২০২২ সালে নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। ২০২৩ সালের প্রথম দুই মাসে নিহত হয়েছেন আট জন। সবমিলিয়ে ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ১৭২ জন। এই তথ্য  মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক)। আর গণপিটুনির সবচেয়ে  বেশি ঘটনা ঘটে ঢাকা বিভাগে। অপর এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গণপিটুনিতে ৮০০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। নিছক ডাকাত, ছেলেধরা বা চোর সন্দেহে তাদের অনেককে পিটিয়ে মারা হয়েছে। এরপর গত সাড়ে ছয় বছরে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে আরও প্রায় ২৮৬ জন। এর মধ্যে ২০২৪ সালে নির্বাচনের পর গত ৭ মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) গণপিটুনিতে নিহত হন ৩২ জন। ঢাকাতেই নিহত হন ১৬ জন। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বেশ কয়েকটি ‘গণপিটুনির’ ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন আদালত প্রাঙ্গণে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গণপিটুনির পেছনে মতলববাজ বা সুযোগসন্ধানীরা কখনো কখনো থাকে। কিন্তু অপরাধের বিচার না হওয়ার কারণেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আছে।

আমাদের এখানে গণপিটুনি বা গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় দণ্ডবিধিতে মামলা হয়। দুই-চারজন মিলে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করলে নির্ণয় করা সম্ভব কার পিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু শত শত লোক যখন গণপিটুনিতে অংশ নেয় তখন তা নির্ণয় করা কঠিন।  সেক্ষেত্রে সবাই সমানভাবে দায়ী। কিন্তু সাক্ষ্য আইনে আবার হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল তা আদালতে সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করতে হয়। আবার সাক্ষী পাওয়াও কঠিন হয়। এসব কারণে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত গণপিটুনির ঘটনায় কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত মামলা করা, আলামত সংরক্ষণ করা, এএসপির নিচে নয় এমন পুলিশ কর্মকর্তাকে দিয়ে মামলার তদন্ত করা। কিন্তু তা অনুসরণ করা হচ্ছে না।

মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে গণপিটুনি রোধে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল (প্রিভেনশন অব লিঞ্চিং) বিল-২০১৯’ নামের বিলটি পাস করা হয়েছে। আমাদের এখানেও  সেটা ভেবে দেখা যায়। আমাদের সাক্ষ্য আইনে এখন ভিডিও, ফটো, অডিও গ্রহণ করার বিধান আছে। তাই এখন অপরাধীদের শনাক্ত করা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। সাক্ষী না পাওয়া গেলেও ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে বিচার করা যায়। গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করা উচিত।

জনতা দ্বারা সংঘটিত এই ক্রাইমের মূল কারণ হিসেবে রাষ্ট্রীয় ‘বিচারহীনতাকেই’ দায়ী করা যায়। মানুষ যখন ক্রমাগত অন্যায়ে আর বিচারহীনতায় অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে তখনই ‘মব জাস্টিস’-এর নামে ‘লিঞ্চিং মবে’র  প্রেক্ষাপট  তৈরি হয়। বলা যায়, ‘মব জাস্টিস’ অসহিষ্ণু সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। এই পরিপ্রেক্ষিতে গত কদিনে ঘটে যাওয়া ‘গণপিটুনি’কে অনেকেই বিগত সরকারের অত্যধিক দুর্নীতি, বিচারহীনতা, নির্যাতন, দলীয়করণের ফল হিসেবে দেখছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের অতিথি কক্ষে তোফাজ্জল হোসেনকে (৩২) ‘চুরি’র অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে ছাত্রদের ছয়টি মুঠোফোন ও মানিব্যাগ চুরি হয়েছিল। তোফাজ্জল সেদিন রাত ৮টার দিকে হলের ফটক দিয়ে মাঠের ভেতরে যান। তখন কয়েকজন শিক্ষার্থী চোর সন্দেহে তাকে আটক করে হলের অতিথিকক্ষে নিয়ে যান। পরে জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাকে স্টাম্প দিয়ে মারধর করা হয়। এরপর তাকে হলের ক্যান্টিনে নিয়ে রাতের খাবার খাওয়ানো হয়। খাওয়া শেষে আবার তাকে হলের অতিথিকক্ষে এনে ব্যাপক মারধর করেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। মারধরের পর রাত ১২টার দিকে হলের কয়েকজন আবাসিক শিক্ষক  তোফাজ্জলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে তারা জানতে পারেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় তোফাজ্জল মারা গেছেন। তার মৃত্যুতে দাগ কেটেছে এদেশের বেশিরভাগ মানুষে মনে।

বুয়েটে ছাত্র আবরারকেও নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। তখন রাজনৈতিক দলের আধিপত্য ছিল। পুরান ঢাকার বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যাকারীরা ছিল রাজনৈতিক দলের সদস্য। কিন্তু বর্তমানে যারা গণপিটুনিতে অংশ নিচ্ছে তারা আসলে কারা। রাজনীতিকরা ক্ষমতার দম্ভে আইন নিজের হাতে তুলে নিতেন। এখনো যদি আইন হাতে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে, তবে সাধারণ মানুষের আইনি ভরসার স্থান কোথায়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

zakpol74@gmail.com