সাতটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান বিশ্ব জুড়ে গণতন্ত্রকে খর্ব করছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে সম্প্রতি। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
বিশ্বের বড় সাতটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান মিডিয়া এবং প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু সংকট ত্বরান্বিত করা, জনগণের পণ্য ও পরিষেবাকে বেসরকারিকরণ এবং মানবাধিকার ও শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে বিশ্ব জুড়ে গণতন্ত্রকে খর্ব করছে বলে সোমবার এক প্রতিবেদনে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন সংস্থা (আইটিইউসি) এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা চরম ডানপন্থি রাজনৈতিক আন্দোলনকে আর্থিকভাবে সমর্থন দিচ্ছে। জলবায়ু সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলাসহ এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রকে দুর্বল করছে। এসব প্রতিষ্ঠান হলো আমাজন, টেসলা, মেটা, এক্সনমোবিল, ব্ল্যাকস্টোন, ভ্যানগার্ড এবং গ্লেনকো। আইটিইউসি এই সাত বড় কোম্পানিকে ‘গণতন্ত্র অবনমনকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান জবাবদিহি এড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে লবিং করে আসছে। তারা অতি ধনী ডানপন্থি রাজনৈতিক আন্দোলনকে সমর্থন এবং নেতাদের অর্থায়ন করছে। আইটিইউসির কর্মকর্তা টড ব্রগান গার্ডিয়ানকে বলেন, এটা হলো কার ক্ষমতা আছে এবং কে সম্পর্ক নির্ধারণ করছে সেই সম্পর্ক । আমরা ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী হিসেবে জানি, আমরা যদি সংগঠিত না হই তাহলে বস কর্মক্ষেত্রে এজেন্ডা নির্ধারণ করে দেবেন। আর আমরা আমাদের দেশের নাগরিক হিসেবে জানি যে, আমরা যদি সংগঠিত না হই এবং আমাদের চাহিদা পূরণে সরকারের কাছে দাবি না জানাই, তাহলে করপোরেট শক্তি এসব এজেন্ডা নির্ধারণ করে দেবে। আইটিইউসি এ সাত কোম্পানি বেছে নিয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং গবেষণার ওপর ভিত্তি করে। একই সঙ্গে তারা গ্লোবাল ইউনিয়নের কাউন্সিল এবং সহযোগী আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছে। তারা বলেছে, বাজারে নেতৃস্থানীয় কোম্পানিকেও এ তালিকায় যুক্ত করতে থাকবে। আইটিইউসি বলেছে, এ সাত করপোরেশন গণতন্ত্রের মারাত্মক অবনমনকারী, তারা একা নয়। চীন, রাশিয়া এবং সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থা, বেসরকারি খাতের সামরিক ঠিকাদার, টেক স্টার্টআপসহ গণতন্ত্রের অবনমনকারীদের চিহ্নিত এবং খুঁজতে থাকবে আইটিসিইউ। পাশাপাশি তারা অতি ডানের সঙ্গে তাদের সংযোগ খতিয়ে দেখবে। আইটিইউসি বিশে^র ১৬৯টি দেশ ও অঞ্চলের শ্রম গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে, যারা ১৯১ মিলিয়ন কর্মীর প্রতিনিধিত্ব করে।
পরিবেশ ও মানবাধিকার
আন্তর্জাতিক এসব করপোরেট নিজের মুনাফাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। তাদের কাছে জনস্বার্থ ঠুনকো জিনিস। নিজেদের স্বার্থে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তারা মানব ও শ্রমিক অধিকার, ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা, পরিবেশ বিপর্যয়ের ইস্যুগুলোতে জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করছে। এ জন্য তারা ডানপন্থিদের সমর্থন দিচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে উগ্র ডানপন্থিরা শ্রমিক বা মানবাধিকার, পরিবেশ বিপর্যয়ে মোকাবিলার বিরুদ্ধে কথা বলে। আর তাই করপোরেটদের পছন্দ উগ্র ডান। যেমন ফেসবুক। তারা সক্রিয় ব্যবহারকারী বাড়ানোর জন্য ডানদের সমর্থন দিয়ে আসছে। উদার বা অন্যান্য মতাদর্শের কনটেন্ট তারা মুছে দেয় বলে দেখা গেছে। তবে এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ফেসবুক উগ্র ডানপন্থি মতাদর্শ প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রাখছে। একই ধরনের কাজ করছে আমাজন বা এক্সনমবিল। আর করপোরেটদের এমন গণবিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংস্থা। তারা একটি পিটিশন তৈরি করে সবার স্বাক্ষর সংগ্রহ করছে। তাদের দাবি, বাণিজ্য ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে মানবাধিকারকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘকে বেশি দায়িত্ব গ্রহণের পক্ষে তারা। এ সংস্থার চেয়ে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা। জবাবদিহি এড়াতে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠান সুসম্পর্ক বজায় রাখে। কখনো উৎকোচ প্রদান করে। তাদের লবিস্টরা বসে থাকে সরকারের দোরগোড়ায়। যার মাধ্যমে শ্রমিক স্বার্থ, জনস্বার্থ খর্ব হচ্ছে। করপোরেট মুনাফা দিন দিন বেড়ে চললেও সাধারণ মানুষ অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে। এসব করপোরেট প্রতিষ্ঠান নীতিনির্ধারণী ভূমিকায়ও অংশ নেয় গোপনে এবং কৌশলে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও তারা শ্রমিক অধিকার খর্ব করছে। তাদের কৌশলের কাছে হেরে যাচ্ছে মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। তবে আইটিইউসি মনে করে শুধু এ সাত সংস্থা নয়। বরং আরও এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা বিশ্ব জুড়ে গণতন্ত্রের অবনমনের জন্য দায়ী। যাদের প্ররোচনায় সরকারগুলো জনস্বার্থকে উপেক্ষা করছে। ফলে দেশে দেশে কর্র্তৃত্ববাদী সরকার তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে যা আরও বাড়তে পারে। বিষয়টি মোকাবিলায় আইটিইউসি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যার একটি হচ্ছে পিটিশন তৈরি করে তাতে স্বাক্ষর সংগ্রহ। তারা একটি শক্তিশালী চুক্তি প্রস্তাব করতে চায়। তারা বলছে, মানুষ সক্রিয় না হলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় সুবিধা পেয়ে যাবে। শ্রমিক বা অন্যান্য পেশার মানুষদের তাই নিজেদের দাবিতে সক্রিয় থাকতে হবে।
আমাজন শীর্ষে
আইটিইউসি লিখেছে, একাধিক মহাদেশে ইউনিয়ন ভাঙা এবং কম মজুরি দেওয়া, ই-কমার্সে একচেটিয়া প্রভাব, মারাত্মক কার্বন নিঃসরণ, করপোরেট কর ফাঁকি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে লবিংয়ের কারণে অ্যামাজন তালিকার শীর্ষে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামাজন শ্রম লঙ্ঘনের পক্ষে সক্রিয়। আবার এর প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস উদার মতামত প্রকাশ করলেও, আমাজন ডানপন্থিদের অনুদান দিচ্ছে, যারা নারী এবং ভিন্নমতের অধিকারের বিরুদ্ধে। দ্য গার্ডিয়ান আরও জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে আমাজন ন্যাশনাল লেবার রিলেশনস বোর্ডের (এনএলআরবি) সংবিধানকে চ্যালেঞ্জ করছে, শ্রম আইন বাতিলে কানাডায় প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। শুনানিতে অংশ নিতে অস্বীকার করায় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট থেকে অ্যামাজনের লবিস্টদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে জার্মানিতে ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তারা। আমাজন ঘৃণা ছড়ায় এমন গোষ্ঠীকে অর্থ সংগ্রহ ও পণ্য বিক্রির জন্য ব্যবহার করেছে। আরেইলন মাস্কের টেসলার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং সুইডেনে শ্রমিক ইউনিয়নবিরোধী তৎপরতায় যুক্ত। মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং শ্রমিক ইউনিয়ন ও গণতন্ত্রের প্রতি ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত বিরোধিতার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, আর্জেন্টিনায় হাভিয়ের মিলেই এবং ভারতে নরেন্দ্র মোদির প্রতি তার সমর্থনকে প্রতিবেদনে গণতন্ত্র খর্ব করার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে ফেসবুকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেটা সম্পর্কে বলা হয়, বিশ্বের বৃহত্তম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটি নিজেদের সক্রিয় ব্যবহারকারী বাড়াতে ডানপন্থিদের সহযোগিতা করেছে। অন্যদের কনটেন্ট নিষিদ্ধ করলেও, ডানপন্থিদের পোস্ট তারা মুছে দেয় না। এভাবে তাদের প্রচার ও আন্দোলনে বিশাল ভূমিকা রয়েছে মেটার। এটি কানাডায় তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ন্ত্রণ আইনের বিরুদ্ধে ব্যয়বহুল লবিং প্রচেষ্টা চালিয়েছে। ব্ল্যাকস্টোন বিশ্বের বৃহত্তম বিনিয়োগকারী এবং আবাসন নির্মাণ সংস্থা। এর সিইও স্টিফেন শোয়ার্জম্যান। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন প্রচারক। এটি জীবাশ্ম জ¦ালানি প্রকল্প এবং আমাজন বন ধ্বংসের জন্য অর্থায়ন করে। আবাসন বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ পাপোর্তুর বলেছেন, সংস্থাটি বিপুল সম্পদ এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের মাধ্যমে স্থানীয় আইন এবং নীতিকে দুর্বল করে আবাসন ব্যবসা বাড়িয়ে চলেছে। এক্সন মবিল প্রয়োজনীয় পরিবেশগত বিধিবিধানের বিরুদ্ধে লবিং চালিয়ে আসছে। তাদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ রয়েছে যে তারা, পরিবেশ বিপর্যয় রোধে সাধারণ জনতার যে দাবি তাকে উপেক্ষা করে ডানপন্থিদের সহযোগিতা দিয়ে আসছে। উগ্র ডানরা পরিবেশ বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে কথা বলে না। বরং তাদের অবস্থান পরিবেশ বিপর্যয় রোধে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে। একইভাবে গ্লেনকোর বিশ্বের বৃহত্তম খনি কোম্পানি। যারা আদিবাসী সম্প্রদায় এবং কর্মীদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রচারাভিযানে অর্থায়ন করে আসছে।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্ল্যাকস্টোনের নেটওয়ার্ক তাদের সুবিধার জন্য কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক শক্তির পেছনে। ভ্যানগার্ড গ্রুপও গণতন্ত্র বিরোধীদের অর্থায়নে ভূমিকা রাখার কারণে এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এক্সনমোবিলকে জলবায়ু বিরোধী গবেষণা এবং পরিবেশগত বিধিবিধানের বিরুদ্ধে লবিংয়ের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করেছে।
পিটিশন
আইটিইউসি জানিয়েছে, তারা চায় এমন একটি বিশ্ব, যেখানে অর্থনীতি মানবতার সেবা করে, অধিকার সুরক্ষিত হয় এবং গ্রহটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত হয়। এই নতুন সামাজিক চুক্তিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে এসব সংস্থাকে চিহ্নিত করেছে তারা। জানা গেছে, অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনগুলো এ সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এবং ভবিষ্যতের শীর্ষ সম্মেলন এবং নভেম্বরে আজারবাইজানে কপ-২৯ জলবায়ু সম্মেলনের মতো আন্তর্জাতিক সমাবেশে এ এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। তারা প্রতিবেদনে লিখেছে, একটি শক্তি আছে, যেটি অনির্বাচিত এবং বৈশি^ক বিষয়ে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। এটি বিশ্বে অসমতা বজায় রাখে এবং খারাপদের জন্য দায়মুক্তি বজায় রাখে, উগ্র ডানপন্থি রাজনীতিকদের অর্থায়ন করে ও জনসাধারণের চেয়ে ব্যক্তিগত মুনাফাকে মূল্য দেয়। আর সেই শক্তি হলো করপোরেট শক্তি। ব্রোগান দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, এখন আন্তর্জাতিক এবং বহু ক্ষেত্রে কৌশল নির্ধারণের সময়। কারণ অনেক ক্ষেত্রে বহুজাতিক করপোরেশন রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। সে লক্ষ্যে আইটিইউসি করপোরেট ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটি বৈশি^ক চুক্তির জন্য স্বাক্ষর সংগ্রহ করছে। তাদের পিটিশনে লেখা আছে, গণতান্ত্রিক ইচ্ছা প্রতিফলিত করতে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অবশ্যই করপোরেটদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তাই তারা ব্যবসা এবং মানবাধিকারের সমন্বয়ের প্রয়োজনে বাধ্যতামূলক শক্তিশালী আন্তর্জাতিক চুক্তিকে সমর্থন করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে, যা লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের মানবাধিকারের ওপর আন্তর্জাতিক করপোরেশনের প্রভাব মোকাবিলা করবে।