রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নামে ব্যাপক লুটপাট করেছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের অবহেলার কারণে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হলেও দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে জোর দেওয়া হয়নি। ব্যবসায়িক স্বার্থে করা অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন দেশের মানুষের গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টেকসই ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্যে জ্বালানিবিষয়ক সর্ববৃহৎ নেটওয়ার্ক ‘জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি)’ এর আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময়সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। দেশে ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরে নাগরিক সমাজের ১৪ দফা দাবিও তুলে ধরা হয় সেখানে।
৭৫টি নাগরিক সংগঠন (সিএসও), জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, স্থানীয় সংগঠন, জ্বালানিখাত বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশবিদদের নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই নেটওয়ার্ক।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. ম তামিম বলেন, গত সরকারের শতভাগ বিদ্যুতায়নের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে বাংলাদেশের হোম সোলার সিস্টেম পুরোপুরিভাবে ধ্বংস হয়ে পড়েছে। অথচ সোলার হোম সিস্টেমে বাংলাদেশ যে সফলতা লাভ করেছিল তা বিশ্বের কোথা নেই।
টেকসই ও সবুজ জ্বালানি নির্ভর খাত নিশ্চিতে সুপরিকল্পিত কর্ম-পরিকল্পনার প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১০ এবং ২০১৬ সালে বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় আলাদাভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বলতে কিছুই ছিল না। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে আমাদের বের হয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
ড. তামিম বলেন, আমাদের যে গ্রিড আছে তা আধুনিক না। পিজিবির এখন যে গ্রিড লাইন রয়েছে তাতে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। এই সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার। রূপটপ সোলার খুবই সম্ভাবনায়। এই সব কিছুর জন্য একটা টেকসই পরিকল্পনা করতে হবে সরকারকে।
তিনি বলেন, যেখানে গ্রিড বিদ্যুৎ ‘ভায়োবেল নয়’ সেখানেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট করার যে উচ্চাবিলাসী পরিকল্পনা সেটা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে একের এর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধুঁকছে। অথচ আমাদের চাহিদা ২০৩০ সালে ২৫ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ খাতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রবণতা থেকে বের হতে হবে।’
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার না করে দেশে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারে বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব বলে উল্লেখ করেন বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের যতটুকু নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ ছিল ততটুকুও আমরা করিনি। এর কারণ হলো সরকারের অবহেলা। ফলে এখন বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। আবার চাহিদামতো জ্বালানি কেনারও সক্ষমতা নেই। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর সময়ও যদি উদ্যোগ নেওয়া যেত তাহলে দেড় থেকে দুই হাজার মেগওয়াট করা যেত। পাশাপাশি নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানেও অবহেলা করা হয়েছে। এভাবে আমরা নিজেদের কোণঠাসা করেছি। ১৫ বছরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের নামে বহু লুটপাট করা হয়েছে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আগামী দিনে কয়লাভিত্তিক নতুন বিদ্যৎকেন্দ্র যাতে না হয় এবং বিদ্যমান প্রকল্পগুলো যাতে দ্রুত অবসরে পাঠানো যায় সে বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। পাশাপাশি মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনোভাবে জীবাশ্মভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ না বাড়িয়ে সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা দরকার। এগুলো সব হতে হবে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে। ইতেমধ্যে নতুন সরকার এ ধরনের তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্যোগ নিয়েছে। এটা ইতিবাচক। স্বল্প খরচে যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করতে পারি সে বিষয়ে নজর দিতে হবে।
একশনএইড বাংলাদেশ-এর জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন (জেট) টিমের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘জেটনেট-বিডি-এর কার্যকরী লক্ষ্য হলো সুশীল সমাজের জোরালো কণ্ঠস্বর তুলে ধরা এবং একটি সবুজ ও টেকসই জ্বালানি নির্ভর ভবিষ্যতের জন্য সকলকে সংগঠিত করা। সহযোগিতামূলক এই নেটওয়ার্ক নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রচার, সদস্য সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং নীতি-নির্ধারকদের প্রভাবিত করার মধ্য দিয়ে দেশে একটি টেকসই জ্বালানি রূপান্তর অর্জনে নিবেদিত থাকবে।’
এই সম্মিলিত উদ্যোগে সাথে সরকারকে পাশে থাকার আহ্বান জানিয়ে একশনএইড বাংলাদেশ’এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, জেটনেট-বিডির এ যাত্রায় সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১০০% নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
বিশ্ব ব্যাংকের সিনিয়র এনার্জি স্পেশালিস্ট এমবুসো গওফিলা বলেন, সৌর বিদ্যুতের একচ্ছত্র প্রভাব থেকে সরে এসে স্থানীয় পর্যায়ে বায়োগ্যাস ও বায়োমাস নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে আরও মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।
পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি. ডি. রহমতউল্লাহ বলেন, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পলিসি নেই। সরকারের প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুতে ১০ থেকে ১২ সেন্ট (প্রায় ১২ থেকে ১৪ টাকা) ব্যয় হচ্ছে। বাস্তবে এটা ৬ থেকে ৭ সেন্ট হওয়া উচিত। প্রতিযোগিতা ছাড়া এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার কারণে ব্যয় বাড়ছে।
তিনি বলেন, প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি সরকারকে একটা সর্বোচ্চ ট্যারিফ বা দর নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। সেটা সাড়ে ৬ বা সাড়ে ৭ সেন্টের মধ্যে থাকবে। তাহলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে। পাশাপাশি ব্যাটারিভিত্তিক অপগ্রিড সোলারের ব্যবহার বাড়াতে সরকারকে ব্যাটারির ট্যাক্স কমাতে হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে গিয়ে যদি পরিবেশের ক্ষতি হয়, মানুষের ক্ষতি হয় তাহলে তো সেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র দরকার নেই। মানুষের প্রয়োজনেই যেহেতু বিদ্যুৎ তাহলে সাশ্রয়ী দামে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মনযোগ দিতে হবে।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. খসরু মোহাম্মদ সেলিম বলেন, বাংলাদেশের স্থানীয় প্রেক্ষাপটে ব্যবহারযোগ্য উদ্ভাবনমূলক প্রযুক্তি, যেমন ইলেকট্রিক রিকশার চার্জিং স্টেশন, সোলার মাইক্রো গ্রিড, সোলার ইনকিউবেটর ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা ও প্রচার বাড়াতে হবে এবং এই কাজে স্থানীয় নারী ও যুবকদের অন্তর্ভূক্ত করার তাগিদ দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিস এর প্রধান বিশ্লেষক (জ্বালানি) শফিকুল আলম, জিআইজেড বাংলাদেশের ক্লাস্টার কো-অর্ডিনেটর স্টোয়াঙ্কা স্টিচ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ-এর এনভায়েরেনমেন্ট অ্যান্ড এনার্জির প্রোগ্রাম ম্যানেজার তানজিনা দিলশাদ, এশিয়ার ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিনিধি মাশিউর রাহমান, সোলারিক গ্রুপের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের পরিচালক নাজনীন আক্তার, জেটনেট-বিডি নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক কমিটির সদস্য সানজিদা সুলতানা প্রমুখ।