সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাসহ নানা স্থানে ছাত্রদের সাড়া জাগানো গণতান্ত্রিক, জলবায়ু সম্পর্কিত এবং করপোরেট বা বিশ্বায়নবিরোধী আন্দোলন সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অনেক ধারণার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। পৃথিবী জুড়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশা প্রতিনিয়ত প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ফলে সমাজে এই মত জন্ম নিয়েছে যে, জনগণের সঙ্গে গণতন্ত্রের নামে বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষার পক্ষে অবস্থান নেয়নি, এমন পরিস্থিতিতে ওই শূন্যতা পূরণের জন্য বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অন্দোলন এক বিশাল ভূমিকা রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় যত পুরনো, ছাত্রদের আন্দোলন বা প্রতিবাদ ঠিক ততটাই পুরনো। প্রাচীন চীনের সবচেয়ে বিখ্যাত শিক্ষক, দার্শনিক এবং রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কনফুসিয়াস যিশুখ্রিস্টের জন্মের অন্তত ৫০০ বছর আগে বলে গেছেন, যখন এটা স্পষ্ট যে, লক্ষ্যগুলোতে পৌঁছানো যাচ্ছে না, তখন সেগুলোতে কোনো সামঞ্জস্য আনবে না, বরং কর্মপরিকল্পনা সমন্বয় করবে। সাম্প্রতিক সময়ের আন্দোলনগুলো আবারও আমাদের এই মহান চৈনিক দার্শনিকের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয় : ন্যায়নীতির পক্ষে ছাত্রদের আন্দোলন নিয়ে আলোচনার আগে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে দু-চার কথা জেনে নিতে পারি। প্রাচ্যে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশেই ইতিহাসের অন্তত ছয়টি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এগুলো হলো তক্ষশীলা (বর্তমান পাকিস্তান), নালন্দা, বিক্রমশীলা, পুষ্পগিরি, বল্লভী ও সোমপুর মহাবিহার ইত্যাদি। সোমপুর বা পাহাড়পুর বাংলাদেশের নওগাঁয় অবস্থিত আর অন্যগুলো ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ছাত্ররা লেখাপড়া করতে আসতেন। তার আগ পর্যন্ত গুরুগৃহে (গুরুকুল) ছাত্রদের অবস্থান করে পড়াশোনা করতে হতো। কারিকুলামে বেদ, গৌতম বুদ্ধের দর্শন, অধ্যাত্মবিদ্যা, গণিত, যুক্তিবিদ্যা, মহাকাশ বিজ্ঞান, রাজনীতি ও অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ধর্মের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। প্রতীচ্যের অক্সফোর্ড (১০৯৬ খ্রিস্টাব্দ) যেটি কিনা বর্তমান যুক্তরাজ্যে অবস্থিত, সেখানেও খ্রিস্টান ধর্মের প্রাধান্য ছিল উল্লেখ করার মতো।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বড় ধরনের ছাত্র-শিক্ষকের যুগপৎ আন্দোলনের লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় ১২০৯ সালে। বছরটিতে এক নারী খুন হওয়ার পর আসল হত্যাকারী পালিয়ে গেলে তিনজন খ্রিস্টান কেরানীকে দোষী সাব্যস্ত করে জেলে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময় রাজা জনের আদেশে প্রকাশ্যে তাদের ফাঁসি দেওয়া হলে ছাত্র ও শিক্ষকরা এটির তীব্র প্রতিবাদ জানান ও ধর্মঘট পালন করেন। সে সময় অন্তত এক হাজার ছাত্র ও শিক্ষক অক্সফোর্ড ত্যাগ করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কেমব্রিজে যোগ দেন। এরপর, ১২২৯ সালে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষার্থী নিহত হলে দুবছর স্থায়ী একটি ধর্মঘট হয়েছিল। এরই প্রেক্ষিতে চার্চের ক্ষমতা কমানো ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশের পক্ষে ছাত্র-জনতার জনমত গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময় উনিশ শতকে রাশিয়ান সাম্রাজ্যেও ছাত্র বিক্ষোভ দেখা যায়। রাশিয়ায় একটি সাংবিধানিক, উদারনৈতিক বা প্রগতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে ১৮৯৯ সালে। এটিই হলো সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিয়ার প্রথম ছাত্র ধর্মঘট। তারপর, ফ্রান্সে পুঁজিবাদ, ভোগবাদ, আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ এবং ঐতিহ্যবাহী কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক বামপন্থি ছাত্র বিক্ষোভ-অন্দোলন শুরু করলে সেখানে নাগরিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। ফলে প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গল ১৯৬৮ সালের মে মাসে পশ্চিম জার্মানিতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
ভারতে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম : তৎকালীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ তাড়াও বা দেশকে স্বাধীন করার আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের অভূতপূর্ব ভূমিকা ছিল। বাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অনুশীলন তত্ত্বের আদর্শে গঠিত হয় বাংলার একটি সশস্ত্র ব্রিটিশ-বিরোধী সংগঠন, অনুশীলন সমিতি। মূলত ঢাকা ও কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে এই সংগঠনটি বিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুতে তৈরি হয়। কলকাতায় জন্ম হলেও এটি ঢাকায় উল্লেখযোগ্য বিস্তার লাভ করে। ‘অনুশীলন দল’ ও তার সহযোগী ‘যুগান্তর দল’ শহরের প্রান্তভাগে ব্যায়ামের আখড়ার আড়ালে তাদের কার্যক্রম চালাত। অনুশীলন দলের উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ। অনুশীলন দল রাজনৈতিক ডাকাতি, বোমা তৈরি, অস্ত্র প্রশিক্ষণ, ব্রিটিশ রাজকর্মচারী ও বিশ্বাসঘাতক ভারতীয়দের হত্যার কাজে নিযুক্ত ছিল। বাংলার গ্রামাঞ্চলেও অনুশীলন দলের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। ভারতের অন্যান্য স্থানেও এর শাখা প্রসারিত হয়েছিল।
ঢাকা অনুশীলন সমিতি ১৯০৫ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে পুলিন বিহারী দাসের নেতৃত্বে আশি জনের একটি দল গঠন করা হয়, যা সমগ্র পূর্ববঙ্গে ‘দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে’। ওই সময়ে ভারতবর্ষের ছাত্ররা রাজনৈতিক সচেতনতা ও জাতীয়তাবাদী ধারণা ছড়িয়ে দিতে সক্রিয় ছিল। তারা রাজনৈতিক মিটিংয়ে অংশ নিত, ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা করে প্রবন্ধ লিখত এবং স্বরাজের (স্বশাসন) ধারণা জনপ্রিয় করতে প্রচারপত্র বিতরণ করত। সে সময় কিশোর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু অনুশীলন সমিতির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পরবর্তী সময়, অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-২২), আইন অমান্য আন্দোলনে (১৯৩০-৩৪) অংশ নিয়ে অনেক ছাত্র গ্রেপ্তার হন। তারপর, ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২), ধর্মঘট, বিক্ষোভ এবং নাগরিক অবাধ্যতা সংগঠিত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল ছাত্রসমাজ। মোট কথা, ব্রিটিশবিরোধী ও স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্রদের এক বিশাল-বৈশিষ্ট্যম-িত ও ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল।
আরও পরে পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার জন্য আবদুস সালাম, আবুল বরকত, রফিক উদ্দিন আহমেদ ও আবদুল জব্বার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শাহাদতবরণ করেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ছাত্রদের জীবনদানের ঘটনা সোনার অক্ষরে ইতিহাসে লেখা থাকবে। এরপর, নানা স্বৈরশাসককে গদিচ্যুত করতে, বিশেষত স্বৈরাচারী এরশাদ ও শেখ হাসিনার সরকারকে উচ্ছেদ করতে ছাত্রদের অন্দোলন সারা বিশ্বে সাড়া জাগিয়েছে। হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে এক মাসে প্রায় এক হাজার জনকে (বেশিরভাগই ছাত্র) গুলি করে হত্যা করা হয় আর এতে আহত হন প্রায় ২০ হাজার ছাত্র-জনতা।
ছাত্রসমাজ এই শতাব্দীরও গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা : তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি, ভঙ্গুর ও বিকৃত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাকস্বাধীনতাকে এখন আর মোটেও পছন্দ করছে না। বাকস্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে হরণ করা হচ্ছে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। বাকস্বাধীনতার জোর সমর্থক (?) খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এখন নানাভাবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত গণতান্ত্রিক এই অধিকারকে পছন্দ করছে না। তারা নাগরিকের এই স্বাধীনতা হরণ করতে নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, বিশ্বব্যাপী তাদের দোসররা তা বিক্রয় করছে এবং ছাত্র-জনতাকে সততই ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। তাই আমরা দেখি যখন মার্কিন শেয়ার বাজার ধসের কারণে ছাত্ররা উত্তাল আন্দোলনে নেমেছিল, যা আমরা Occupy Wall Street হিসেবে জানি, তা ন্যক্কারজনকভাবে প্রতিহত করা হয়েছিল। ওয়াল স্ট্রিট দখলের অনুপ্রেরণাগুলো মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার পরে এবং বেসরকারি খাতের ওপর থেকে জনগণের অবিশ্বাসের ফলে তৈরি হয়েছিল। এর আগেই শুরু হয় অকুপাই ওয়াশিংটন ডিসি, যেখানে কিনা খোদ মার্কিন সাম্রাজ্যের রাজধানী অবস্থিত। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাবিরোধী আন্দোলন ২০১১ সালে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। এটির চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রায় তিন লাখ ছাত্র-জনতা এসব আন্দোলনে অংশ নেন। তাদের দাবি ‘মাত্র ১ শতাংশ অতি ধনী মার্কিন ধনকুবেরের সম্পত্তির ওপর ৯৯ শতাংশ সাধারণ মানুষের হক রয়েছে।’ এ বিষয়ে একটি বিহিত হওয়া উচিত। সেসময় একটি স্লোগান অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায় আর তা হলো ‘আমরা ৯৯ শতাংশ!’ এই আন্দোলন মার্কিন রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা স্বীকার করেছিলেন এই বলে যে, অসমতা ‘আমাদের সময়ের একটি সংজ্ঞায়িত সমস্যা।’ এটি Occupy Movement-এর একটি অর্জন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এর আগে ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ অভাবনীয় এক আন্দোলন করেছে। আফ্রিকান-আমেরিকান ছাত্ররা পুলিশি হয়রানি ও সাদা পুলিশ কর্র্তৃক কালো বর্ণের ছাত্র-নাগরিককে অকারণে গুলি করে হত্যা করা নিয়ে ‘Black Life Matters’ নামের একটি আন্দোলন গড়ে তুলেছে।
হংকং, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারে আন্দোলন : দশ বছর আগের হংকংয়ের আমব্রেলা আন্দোলনের কথা আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। এই আন্দোলন ছিল বিশেষত গণতান্ত্রিক সংস্কার ও হংকংয়ের নির্বাচনে সর্বজনীন ভোটাধিকারের পক্ষে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন এক বিশাল প্রতিবাদ। নামটি হয়েছে পুলিশ কর্র্তৃক নিক্ষিপ্ত টিয়ার গ্যাসের ঝাঁজালো গন্ধ ও চোখ-মুখ জ্বালা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ছাতার ব্যবহার থেকে। এরপর ২০১৯-২০ সালের বিক্ষোভগুলোতে ছাত্রসমাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। চীন কর্র্তৃক হংকংকে মূল ভূখন্ডের সঙ্গে একীভূত করতে বেইজিংয়ে বিল উত্থাপিত হলে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিগুলো অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াস নেওয়া হয়। এদিকে থাই ছাত্রসমাজ ও তরুণ কর্মীরা রাজতন্ত্রের সংস্কার, প্রধানমন্ত্রী প্রুথ চ্যান-ও-চা-এর (একজন প্রাক্তন সামরিক নেতা) পদত্যাগ এবং আরও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
আজ থেকে তিন বছর আগে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং অং সান সুচিসহ আটক নেতাদের মুক্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে আসা ছাত্র ও যুবসমাজ উত্তাল আন্দোলনে নেমেছিল। আমরা দেখেছি ছাত্ররা সামরিক জান্তার পক্ষ থেকে কীভাবে নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়েছিল। একই সময়কালে বেলারুশ, চিলি ও সুদানেও ছাত্ররা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও নানাবিধ সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল। এই উদাহরণগুলো গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে আর স্বৈরাচারী সরকারকে প্রতিরোধ করতে ছাত্র আন্দোলনের অতুলনীয় শক্তিকেই তুলে ধরে।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
govindashil@gmail.com