বরিশালের বিভিন্ন বাজারে ইলিশের সংকট প্রকট হয়েছে। অল্প যা কিছু আছে তার দামও আকাশ ছোঁয়া। ফলে ইলিশ কিনতে গিয়ে বহু ক্রেতাই ফিরছেন খালি হাতে। তারা প্রকাশ করেছেন হতাশা। কেউ কেউ বলছেন, ভারতে ইলিশ রপ্তানির সিদ্ধান্ত হওয়ার পরে এক শ্রেণির অসাধু আড়তদার ইলিশ মজুদে মন দিয়েছেন। ফলে প্রায় এক সপ্তাহ ধরেই ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে বরিশালের হাটবাজারে। অবশ্য বিক্রেতাদের দাবি, খারাপ আবহাওয়ার কারণে ইলিশ আহরণ ও সরবরাহ দুটিই ব্যাহত হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বরিশাল নগরীর প্রধান তিনটি বাজার রুপাতলী, সাগরদি এবং বাংলাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ইলিশের সরবরাহ প্রায় শূন্য। যদিও দু-একজন বিক্রেতা সামান্য কিছু ছোট আকারের ইলিশ বাজারে আনতে পেরেছেন, কিন্তু সেগুলোর দাম ক্রেতাদের জন্য অত্যন্ত বেশি। বাজারে ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৯৫০ থেকে ১ হাজার টাকায়, যা সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়সীমার বাইরে।
সাগরদি বাজারে ইলিশ না পেয়ে হতাশ এক ক্রেতা খলিলুর রহমান বলেন, সকাল থেকে বৃষ্টি দেখে ইলিশ-পোলাও খাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম, কিন্তু বাজারে এসে দেখি, কোনো মাছ বিক্রেতাই ইলিশ আনেননি। এত বড় বাজারে ইলিশের কোনো নাম-গন্ধ নেই। শেষমেষ পোর্ট রোডের আড়তে যেতে হবে ভাবছি, কিন্তু সেখানেও দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। নগরীর বাংলাবাজারের একটি ঐতিহ্যবাহী মাছের দোকানে ক্রেতা মামুন সিকদার ইলিশ না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে ইলিশ রপ্তানির সিদ্ধান্তের পর থেকেই এই সংকট শুরু হয়েছে। আমার মনে হয়, ব্যবসায়ীরা ইলিশ মজুদ করে রাখছেন, যাতে উচ্চমূল্যে বিক্রি করতে পারেন। এর পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংস্থার সাম্প্রতিক অভিযানের প্রভাবও থাকতে পারে। যারা অতিরিক্ত দামে মাছ বিক্রি করতেন, তারা হয়তো সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। তবে বিক্রেতাদের একাংশের দাবি, মজুদের অভিযোগ ভিত্তিহীন। রুপাতলী বাস টার্মিনালের পাশের মাছের বাজারের ব্যবসায়ী জব্বার তালুকদার বলেন, বরিশালের আবহাওয়া অত্যন্ত খারাপ। এ পরিস্থিতিতে মাছবাহী ট্রাকগুলো আসতে পারেনি, ফলে বাজারে ইলিশের সরবরাহ নেই। পাশাপাশি বাজারে ক্রেতাও খুব কম, যার ফলে ইলিশ বিক্রেতারা বেশি মাছ আনতে চাচ্ছেন না। বরিশাল বিভাগের মৎস্য অফিসের উপপরিচালক নৃপেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, ইলিশের প্রায় ৬০ শতাংশ সমুদ্র থেকে আহরিত হয়, কিন্তু চলতি মৌসুমে সাগর উত্তাল এবং খারাপ আবহাওয়ার কারণে ইলিশ আহরণ কিছুটা কম হয়েছে। তবে শুধু প্রাকৃতিক কারণে বাজারে ইলিশের এই সংকট তৈরি হয়নি। মূলত ব্যবসায়ী এবং কিছু অসাধু ক্রেতার মজুদ প্রবণতা এর অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, যদিও ইলিশের সরবরাহ সাগরের অবস্থা ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল, তারপরও আমাদের মনে হচ্ছে, বাজারে ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ার পেছনে মজুদের বড় ভূমিকা রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী অতিমুনাফার আশায় ইলিশ মজুদ করছেন, আবার কিছু সচ্ছল ক্রেতা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ হওয়ার আগেই বেশি পরিমাণে মাছ কিনে বাসায় মজুদ করছেন। এর ফলে সাধারণ ক্রেতারা বাজারে এসে ইলিশ পাচ্ছেন না।
বাজারে ইলিশের অভাব এবং অন্যান্য মাছের দাম কিছুটা কমলেও, এই সংকট বরিশালের সাধারণ জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইলিশের চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি শুধু খাদ্য সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের ওপর প্রভাব ফেলছে না, বরং এটি বাজারের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছু সংখ্যক মানুষের মুনাফার লোভ এবং বিদেশি রপ্তানি নীতির প্রভাব বরিশালের মাছ বাজারের এই সংকট আরও ঘনীভূত করছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।