কেন বিখ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী?

ছানামুখীর নাম শুনলে জিভে জল আসে না— এমন মিষ্টিপ্রেমী কমই আছে। তবে হ্যাঁ, যে কি না জীবনে কখনো ছানামুখী খায়নি, তাকে এর স্বাদ বোঝাবে কে? তাই আসল স্বাদের ছানামুখীর স্বাদ পেতে ঢুঁ মারতে হবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশেষ কয়েকটি দোকানে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ছানামুখী। এর সুনাম এখন জেলার সীমা ছাড়িয়েছে সারা দেশে।

প্রায় ১০০ বছর আগে ছানামুখীর নাম মজাদার মিষ্টির তালিকায় যোগ করেন ভারতের কাশীধাম থেকে আসা মহাদেব পাড়েঁ। শহরের মেড্ডার শিবরাম মোদকের দোকানে মিষ্টি তৈরির চাকরি নিয়েছিলেন মহাদেব। তিনি দুটি মিষ্টি বানাতেন। একটি ছানামুখী, অন্যটি লেডি ক্যানিং বা লেডি ক্যানি। মহাদেবের তৈরি করা এই দুই মিষ্টি বাংলাদেশের অন্য কোথাও পাওয়া যেত না। এরপর থেকে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে অন্য দোকানিরাও ছানামুখী বানাতে শুরু করেন।

সেই ছানামুখী মিষ্টি এবার ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের আবেদনের প্রেক্ষিতে এই মিষ্টান্ন জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার বিষয়টি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনকে নিশ্চিত করে। ডিপিডিটিতে ছানামুখী ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) নম্বর ৪১।

২৪ সেপ্টেম্বর ডিপিডিটির মহাপরিচালক মো. মুনিম হাসান স্বাক্ষরিত জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো জিআই সনদে উল্লেখ রয়েছে, ভৌগোলিক নির্দেশক (যার নমুনা এতদসঙ্গে সংযুক্ত আছে) নিবন্ধন বইয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের নামে ২৯ ও ৩০ শ্রেণিতে জিআই-৭৫ নম্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টি পণ্যের জন্য চলতি বছরের ৮ এপ্রিল থেকে নিবন্ধিত হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. শাহগীর আলম প্রথমে ও পরে সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান গত ২ এপ্রিল ‘ছানামুখী’ মিষ্টান্নকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) খাবার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ডিপিডিটির রেজিস্টারের কাছে ১০ পৃষ্ঠার একটি আবেদন পাঠান। সেখানে ছানামুখী মিষ্টান্নের বৈশিষ্ট্য, ভৌগোলিক নাম, ছানামুখীর বর্ণনা, উৎপাদনের প্রদ্ধতিসহ নানা বিষয় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ছানামুখী জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সরকারিভাবে ছানামুখীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্র্যান্ডিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে। জেলার ব্র্যান্ডবুকেও একে অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে।বিদেশি অতিথিসহ মন্ত্রী পর্যায়ের যারাই আসেন, ছানামুখী দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

জেলা তথ্য বাতায়নে পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে উল্লেখ আছে ছানামুখীর নাম। সেখানে বলা আছে, ছানামুখীর উৎপত্তি ব্রিটিশ রাজত্বকালে বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। এক কেজি ছানামুখী তৈরিতে গরুর সাত-আট লিটার দুধ লাগে। প্রতি কেজি ছানামুখীর দাম ৭০০ টাকা।

ব্যবসায়ীরা জানান, ‘প্রসিদ্ধ এই ছানামুখী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বেশকিছু দোকানে পাওয়া গেলেও মহাদেবের রেসিপি মেনে আদি স্বাদের ছানামুখী তৈরি করছে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এক কেজি ছানামুখী তৈরিতে ৬-৭ লিটার দুধ প্রয়োজন হয়। দুধের ছানা তৈরি করে তা থেকে অতিরিক্ত পানি ঝরাতে হয়। এরপর সেই ছানা দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি হয় ছানামুখী।’

একেকটা ছানামুখীর ওজন হয় ১০ থেকে ১৫ গ্রাম। সেই হিসাবে কেজিতে গড়ে ৮০-৯০ পিস ছানামুখী পাওয়া যায়। দুধ ও চিনির দাম বাড়তি বলে এখন ছানামুখীর দামও বেড়েছ।