এবার হিজবুল্লাহর প্রধান নেতাকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। একের পর এক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতাদের হত্যা করে মধ্যপ্রাচ্য অশান্ত করে তুলছে তারা। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে হিজবুল্লাহর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরে ইসরায়েলের ব্যাপক বোমা হামলায় হাসান নাসরাল্লাহ নিহত হয়েছেন। তিনি ৩২ বছর ধরে হিজবুল্লাহর নেতা ছিলেন। হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে নাসরাল্লাহর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। অভিযোগ রয়েছে, গত কয়েক বছরে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হওয়া নেতাদের তালিকায় এখন পর্যন্ত সর্বশেষ নাম নাসরাল্লাহ। এ পর্যন্ত ইসরায়েল হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ, ইব্রাহিম কুবাইসি, ইব্রাহিম আকিল, আহমদ ওয়াহবি, ফুয়াদ শুকর, মুহাম্মদ নাসের, তালেব আবদুল্লাহ; হামাস নেতা মোহাম্মদ দেইফ, ইসমাইল হানিয়াহ, সালেহ আল-আরোরি এবং ইরানি কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজা জাহেদিকে হত্যা করেছে।
নাসরাল্লাহ
শুক্রবার লেবাননের রাজধানীতে এক হামলায় হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহকে ‘নির্মূল’ করা হয়েছে বলে ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র ঘোষণা করে। যদিও এর আগে ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধের সময়ও নাসরাল্লাহকে হত্যা করার গুজব রটিয়ে যায়। কিন্তু তিনি পরে অক্ষত অবস্থায় আবির্ভূত হন। তবে এবার হিজবুল্লাহ বিবৃতি দিয়ে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। আল জাজিজার প্রতিবেদনে বলা হয়, নাসরাল্লাহর মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির নয়, লেবাননের শিয়া আন্দোলনকে বৃহত্তর অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। নাসরাল্লাহ ১৯৯২ সালে হিজবুল্লাহর সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। নাসরাল্লাহ যার স্থলাভিষিক্ত হন, ১৯৯২ সালে সেই আব্বাস আল-মুসাভিকেও ইসরায়েল হত্যা করে বলে জানা যায়। আল-মুসাভি, তার স্ত্রী এবং পাঁচ বছরের ছেলে তাদের বাড়িতে থাকা অবস্থায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন। নাসরাল্লাহ দায়িত্ব পাওয়ার পর দ্রুত হিজবুল্লাহকে বিশে^র অন্যতম শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। তার তত্ত্বাবধানে হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননকে ইসরায়েলের ১৮ বছরের দখল থেকে মুক্ত করে, যা তাকে সমগ্র অঞ্চলে বীরের মর্যাদা দেয়। তার ক্যারিশমা এবং বুদ্ধি তাকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সম্মানিত নেতাদের একজন করে তোলে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধেও তার নেতৃত্বে হস্তক্ষেপ করে হিজবুল্লাহ। তারা গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনের তোপের মুখে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে উদ্ধার করে। যদিও পরে ওই আন্দোলন দমনে নৃশংস হয়ে ওঠেন আসাদ।
হিজবুল্লাহর কার্যনির্বাহী পরিষদের প্রধান এবং নাসরাল্লাহর চাচাতো ভাই সাফিউদ্দিন পরবর্তী মহাসচিব হওয়ার জন্য এগিয়ে আছেন বলে মনে করা হয়। ১৯৬৪ সালে টায়ারের কাছে দেইর কানুন এন-নাহরের দক্ষিণ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সাফিউদ্দিন। নাসরাল্লাহর সঙ্গে ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন তিনি। তবে নাসরাল্লাহর জনপ্রিয়তা ছিল অনেক। যা অর্জনে সাফিউদ্দিনকে অনেক দূর যেতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নাসরাল্লাহর জনপ্রিয়তা নিয়ে আল জাজিরা প্রকাশিত প্রতিবেদনে এক নারী বলেন, আমি যখন প্রথম খবরটি শুনেছিলাম, তখন আমি ভেবেছিলাম এটি মিথ্যা। আমি ভেবেছিলাম, এটি সত্য হতে পারে না। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, নাসরাল্লাহ আমাদের ভাই ছিলেন এবং আমরা সবসময় তার কাছে নিরাপদ বোধ করতাম। এখন, আমরা জানি না আমাদের ভাগ্যে কী হবে। সংবাদ প্রতিবেদন এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীর তথ্য অনুযায়ী সিরিয়া সরকার এবং হিজবুল্লাহ বিদ্রোহ দমনে নৃশংসতা চালিয়েছে। এসব প্রতিবেদন সমগ্র অঞ্চলে নাসরাল্লাহর জনপ্রিয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদিও তার সবচেয়ে উৎসাহী সমর্থকরা এ ভেবে তার তার পাশে দাঁড়িয়েছিল যে, অন্য কেউ ইসরায়েল থেকে লেবাননকে রক্ষা করতে সক্ষম না বা ইচ্ছুক না। যেমন নিহত হওয়ার পর তার এক সমর্থক বলেছেন, আমি শুধু তার কণ্ঠ আবার শুনতে চাই। তিনি আমাদের কাছে বাবার মতো ছিলেন। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না।
হিজবুল্লাহর আরও নেতা
হিজবুল্লাহর অন্য নেতাদের মধ্যে ইব্রাহিম কুবাইসি গত ২৪ সেপ্টেম্বর বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে এক বিমান হামলায় নিহত হন। তিনি হিজবুল্লাহর রকেট বিভাগের কমান্ডার এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। এ ছাড়া হিজবুল্লাহর অপারেশন কমান্ডার ইব্রাহিম আকিল ২০ সেপ্টেম্বর বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন। আকিল হিজবুল্লাহর শীর্ষ সামরিক সংস্থার সদস্য ছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে লেবাননে দুটি মারাত্মক বোমা হামলায় জড়িত থাকার জন্য অভিযুক্ত করে, যাতে কয়েকশ মানুষ নিহত হয়। এরপর শীর্ষ কমান্ডার আহমেদ ওয়াহবি ২০ সেপ্টেম্বর আরেকটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন। ২০২৪ সালের প্রথম দিকে গাজা যুদ্ধে বিশেষ বাহিনীর সামরিক অভিযানের তত্ত্বাবধান করছিলেন তিনি। হিজবুল্লাহর অন্য নেতাদের মধ্যে ফুয়াদ শুকর গত ৩০ জুলাই লেবাননের রাজধানীর দক্ষিণ শহরতলিতে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন। হিজবুল্লাহর শীর্ষ কমান্ডার ছিলেন ফুয়াদ শুকর। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাকে নাসরাল্লাহর ডান হাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ৪০ বছরেরও বেশি আগে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ফুয়াদ ছিলেন হিজবুল্লাহর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সামরিক ব্যক্তিত্ব। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তাকে ১৯৮৩ সালে বৈরুতে মার্কিন মেরিন ব্যারাকে বোমা হামলায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করার জন্য অভিযুক্ত করে। ওই হামলায় ২৪১ জন সেনা নিহত হয়। এ ছাড়া লেবাননের টায়ারে ৩ জুলাই ইসরায়েলি বিমান হামলায় সিনিয়র হিজবুল্লাহ নেতা মুহাম্মদ নাসের নিহত হন। ইসরায়েল এ হত্যার দায় স্বীকার করে জানায়, নাসের দক্ষিণ-পশ্চিম লেবানন থেকে ইসরায়েলের দিকে গুলি চালানোর জন্য দায়ী একটি ইউনিটের প্রধান ছিলেন। গত ১২ জুন ইসরায়েলের তালেব আবদুল্লাহকে হত্যা করে বলে দাবি জানায়। তালেব হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ ফিল্ড কমান্ডার ছিলেন। লেবাননের নিরাপত্তা সূত্র জানায়, তিনি দক্ষিণ সীমান্তের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে হিজবুল্লাহর কমান্ডার ছিলেন এবং নাসেরের মতো একই পদমর্যাদার ছিলেন।
হামাস নেতা
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর দেওয়া তথ্যে জানা যায়, গত ১৩ জুলাই গাজার খান ইউনিস এলাকায় একটি গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর যুদ্ধবিমান হামলায় মোহাম্মদ দেইফকে হত্যা করা হয়। দীর্ঘদিন অধরা ছিলেন দেইফ। তিনি অন্তত সাতটি ইসরায়েলি হত্যা চেষ্টা থেকে বেঁচে যান। দেইফ হামাসের সামরিক শাখা ও কাসাম ব্রিগেডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। গাজায় আগ্রাসনের শুরু হয় ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার মধ্য দিয়ে। দেইফ যে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বলে মনে করা হয়। ইসরায়েল এরপর গত ৩১ জুলাই ইসমাইল হানিয়াহকে হত্যা করে। ওই দিন ভোরে ইরানে হানিয়াহকে হত্যা করা হয়। তিনি তেহরানের একটি রাষ্ট্রীয় গেস্ট হাউজে অবস্থান করছিলেন। তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর ইসরায়েল সরাসরি আঘাত করতে পারে, এমন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হত্যা করে। যদিও ইসরায়েল হামলার দায় স্বীকার করেনি। এ ছাড়া হামাস নেতা সালেহ আল-আরৌরিকে হত্যা করা হয় বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি এলাকায়। ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ডেপুটি হামাস প্রধান সালেহ আল-আরৌরি নিহত হন। আরৌরি হামাসের সামরিক শাখা, কাসাম ব্রিগেডেরও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। হামাস ও হিজবুল্লাহর বাইরে ইরানি কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজা জাহেদিকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের উচ্চ শাখা কুদস ফোর্সের জ্যেষ্ঠ কমান্ডার রেজা জাহিদ। তার ডেপুটি মোহাম্মদ হাদি হাজরিয়াহিমি এপ্রিল মাসে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন, যা দামেস্কে ইরানের কনস্যুলেট ধ্বংস করেছিল।
ইতিহাস
গত অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। যদিও এর শুরুটা বেশ পুরনো। ইসরায়েল ১৯৮২ সালের জুনে লেবানন আক্রমণ করে। তখন দক্ষিণ লেবানন থেকে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) আক্রমণ চালায় ইসরায়েল। যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইসরায়েলও পাল্টা হামলা করে। লেবাননেও আবার তখন সাত বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলছিল। লেবাননে বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার প্রতিষ্ঠার আশায় ইসরায়েল দক্ষিণাঞ্চল দখল করে এবং পশ্চিম বৈরুত পর্যন্ত চলে যায়। যেখানে আবার পিএলওর ঘাঁটি ছিল। একটি শান্তিচুক্তির পর পিএলও তিউনিসিয়া চলে যায় কিন্তু ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী লেবাননে থেকে যায়। কিন্তু ইসরায়েল গৃহযুদ্ধে একটি গোষ্ঠীর পক্ষ নিয়ে মাত্র দুদিনে দুই হাজার থেকে তিন হাজার পাঁচশ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু এবং লেবাননের বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে। এ আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য বেশ কয়েকটি লেবানিজ দল গঠিত হয়। যার একটি ছিল শিয়া মুসলিম সম্প্রদায় নিয়ে গড়া। যান নাম ছিল হিজবুল্লাহ। কথিত আছে যে, তারা ইরান সমর্থিত এবং ইসরায়েলকে বিতাড়িত করার আদেশ নিয়ে লড়াইয়ে নামা দল। ১৯৯২ সালে লেবাননে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হিজবুল্লাহ সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে। ধীরে ধীরে সংসদে তাদের আসন ও প্রভাব বাড়ে। ১৯৯৩ সালের জুলাইয়ে ইসরায়েল লেবানন আক্রমণ করে। হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি হামলার জবাব দিলে হতাহতের ঘটনা ঘটে। সেই থেকে শুরু। এরপর বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধ বাধে। গাজায় চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর প্রত্যুত্তর যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ায়। যাতে হতাহতও বাড়ে অনেক। তবে অনেক বিশ্লেষক বলেছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কারণে এত রক্তপাত ঘটছে। তিনি ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য একের পর যুদ্ধ বাঁধিয়ে যাচ্ছেন। পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থির হয়ে উঠেছে তার কারণে। যুক্তরাষ্ট্রও বিভিন্ন সময়ে বিব্রত হয়েছে। নতুন করে হিজবুল্লাহ প্রধানকে হত্যার মাধ্যমে সংঘাত আরও বাড়বে। নেতানিয়াহু এটাই চাইছেন। নিজ দেশে তার যে টালমাটাল অবস্থা, তা থেকে রেহাই পেতে বিভিন্ন স্থানে হামলা চালাচ্ছেন নেতানিয়াহু। তাকে থামানোর মতো শক্তি নেই বিশে^। যদিও ক্ষোভ-বিক্ষোভ বাড়ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু যুদ্ধ থামছে না। হিজবুল্লাহ প্রধানকে হত্যার মাধ্যমে বারুদের স্তূপে নতুন আগুন জ্বালিয়ে দিলেন নেতানিয়াহু।