‘উন্নত দেশগুলোর জীবাশ্ম জ্বালানিতে অর্থ দেওয়ায় জলবায়ু সংকট’

বিশ্বে বছরে জীবাশ্ম জ্বালানি প্রতিষ্ঠানে ও বাণিজ্যিক কৃষি খাতে প্রতিবছর প্রায় ৬৭৭ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, যা গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা বাড়িয়ে তুলছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসে ভূমিকা রাখছে এমন অনেক ব্যবসা সরকারি পর্যায়ে ভর্তুকি পাচ্ছে। উন্নত দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানিতে অর্থায়নের মাধ্যমে জলবায়ু সংকট সৃষ্টি করছে বলে এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ তাদের পরিচালিত ‘হাউ দ্য ফাইন্যান্স ফ্লো’ শীর্ষক ওই সমীক্ষার ফল প্রকাশ করে। সে সময় জলবায়ু বিপর্যয় প্রতিরোধবিষয়ক ক্যাম্পেইন ‘ফান্ড আওয়ার ফিউচার’ উন্মোচন করা হয় সেখানে।

সমীক্ষায় বৈশ্বিক দক্ষিণের জনগণের টাকা কীভাবে জলবায়ু ধ্বংসের পেছনে খরচ হচ্ছে এবং এই অর্থ দিয়ে কীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি ও বাণিজ্যিক কৃষি খাতগুলো লাভবান হচ্ছে, সেসব চিত্র উঠে এসেছে সমীক্ষায়।

এতে দেখা যায়, ২০১৬ সালে জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি গৃহীত হওয়ার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জনগণের ভর্তুকির টাকা প্রতিবছর ৪৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যাচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে এবং বাণিজ্যিক কৃষি খাত এই ভর্তুকি থেকে প্রতিবছর ২৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার লাভবান হচ্ছে।

সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর নবায়নযোগ্য শক্তি রূপান্তরে যে অর্থ ব্যয় করা হয়, তা ভর্তুকির তুলনায় নগণ্য। ৪০ ভাগের ১ ভাগ অর্থ ব্যবহার হয় নবায়নযোগ্য শক্তিতে। টেকসই ও সবুজ নবায়নযোগ্য শক্তিতে অর্থায়নের হার নিম্নমুখী। পাশাপাশি আগের থেকে বেশি দেশ এই জলবায়ু-সংক্রান্ত ঋণঝুঁকিতে রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকির অর্থায়নের পরিমাণ জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সাধারণ মানুষের মাথাপিছু ৫০ শতাংশেরও বেশি।  

সমীক্ষার ফল নিয়ে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবিরের সঞ্চালনায় আয়োজিত আলোচনা সভায় নাগরিক সংগঠন (সিএসও), জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা, স্থানীয় সংগঠনের পরিবেশ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ, অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য দেন।

প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো যে পরিমাণ জলবায়ু অর্থায়ন অনুদান পাচ্ছে, তা সর্বমোট ভর্তুকির ২০ ভাগের ১ ভাগ, যা জলবায়ু ধ্বংসের বিপরীতে জলবায়ু মোকাবিলার তুলনায় অপর্যাপ্ত। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর তরুণ, কৃষক, নারী এবং প্রান্তিক সম্প্রদায়গুলোয়। এ অবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে টেকসই প্রকল্প এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এই লক্ষ্যে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৯-কে বছরে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন জলবায়ু অর্থায়নের লক্ষ্যে একমত হতে হবে। এই জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত ও সুপরিকল্পিত কর্মপরিকল্পনার মধ্য দিয়ে জলবায়ুর ক্ষতিপূরণ সম্ভব।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘প্রতিবেদনটিতে দেখা যাচ্ছে কীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি এবং বাণিজ্যিক কৃষি প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের জলবায়ু সংকটের মূল চালক হিসেবে কাজ করছে। আমাদের লক্ষ্য নির্ধারণ, জবাবদিহি এবং পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের অবশ্যই ন্যায়বিচার চাইতে হবে এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক আহমেদ জুবায়ের বলেন, ‘গ্রিন এনার্জির বাস্তবসম্মত কী কী বিকল্প আছে, তা ভেবে দেখা দরকার। আমরা তহবিল পাই কিন্তু এর প্রক্রিয়া একটু জটিল। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট মিটিগেশনের থেকে ক্লাইমেট অভিযোজনের দিকে আমাদের বেশি মনোযোগ দিতে হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবিলিটি ফাইন্যান্স বিভাগের সাবেক পরিচালক মোর্শেদ মিল্লাত বলেন, ‘জলবায়ু তহবিল ব্যবহারের থেকে স্বচ্ছতা আনা বেশি জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে যেসব পলিসি রয়েছে, তা মাঠপর্যায়ে চর্চায় নিতে হবে।’

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘জ্বালানির প্রাপ্তি বৃদ্ধিতে বিদ্যমান নবায়নযোগ্য শক্তির অন্য উৎসগুলো বাড়াতে হবে। আমাদের জনসংখ্যার তুলনায় জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। সবুজ কৃষি রূপান্তরের লক্ষ্যে ক্ষতিকর সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে জমির সর্বোচ্চ উপযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে হবে।’

জার্মান দূতাবাসের হেড অব জার্মান ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন কাউন্সেলর ফ্লোরিয়ান হেলেন বলেন, ‘বাংলাদেশের জ্বালানি খাত পুনর্গঠন করতে হবে। সরকারকে গ্রিন এনার্জি ট্রানজিশন নিয়ে এমনভাবে উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে মানুষ এতে আগ্রহ দেখায়। বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, সেগুলো কীভাবে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনে রূপান্তর করা যায়, সেটা ভেবে দেখতে পারে সরকার।’

ব্র্যাক ব্যাংকের চিফ অপারেটিং অফিসার সাব্বির হোসেন বলেন, ‘ঢাকার বাসাবাড়ির ছাদে ব্যবহার করা ১০০ ভাগের ৮০ ভাগ সোলার প্যানেলই অকার্যকর হয়ে আছে। কিন্তু এসব নিয়ে পর্যালোচনা করা হয় না। এখন নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করে সোলার নিয়ে নতুনভাবে পরিকল্পনা করার সময় এসেছে।’

অ্যাকশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির চেয়ারপারসন ইব্রাহিম খলিল আল জায়াদ বলেন, ‘জ্বালানি নিয়ে নতুন করে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বয়মূলক পলিসি করার সুযোগ এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সবুজ জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। আমাদের জ্বালানি-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে নতুন পদ্ধতি বের করতে হবে।’