চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ডলফিন জেটিতে (তেল খালাসের জেটি) নোঙর করা অবস্থায় ১৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার ‘বাংলার জ্যোতি’ নামের অয়েল ট্যাংকার জাহাজটি ১১ হাজার ৭০০ টন তেল নিয়ে বিস্ফোরিত হয়। ৩৭ বছরের পুরনো জাহাজটি বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটলেও কোনো তেল নদীতে পড়েনি। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও বিস্ফোরণে তিনজন মারা গেছেন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন থেকে দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
নিহত তিনজনের মধ্যে একজন ডেক ক্যাডেট এবং অন্য দুজন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মেরিন ওয়ার্কশপের কর্মী ছিলেন। জাহাজটিতে ৪২ জন ক্রু ছিলেন। দুর্র্ঘটনায় নিহতরা হলেন বিএসসির নিজস্ব মেরিন ওয়ার্কশপের চার্জম্যান চট্টগ্রামের নুরুল ইসলাম, ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে বিএসসিতে ডেইলিবেসিস কাজ করা কিশোরগঞ্জের মো. হারুন, বরিশাল মেরিন একাডেমি থেকে পাস করে বের হওয়া ঝিনাইদহের ক্যাডেট সৌরভ কুমার সাহা।
এদিকে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পতেঙ্গার ডলফিন জেটিতে যে পয়েন্টে জাহাজটিতে বিস্ফোরণের পর আগুন লেগে যায় এর পাশেই ছিল বিভিন্ন তেল শোধনাগার ক্ষেত্রগুলো। কৌশলে জাহাজটির ক্যাপ্টেন তা নদীর দিকে নিয়ে যায় এবং আর তখনই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের টাগবোট, কোস্ট গার্ডের ও নৌবাহিনীর টাগবোট থেকে জলকামান মারা শুরু হয়। এতে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্ণফুলী নদীতে বন্দর চ্যানেলের পাশে এত বড় দুর্ঘটনা অতীতে কখনো ঘটেনি। এর আগে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ এমটি সৌরভে ২০০৬ সালে বহির্নোঙরে অগ্নিকান্ড ঘটেছিল।’
এই দুর্ঘটনাটি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারত উল্লেখ করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া যে, তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি। জাহাজের ট্যাংকারে ১১ হাজার টন ক্রুড অয়েল ছিল। কিন্তু জাহাজের নিচে কোনো বিস্ফোরণ ঘটেনি। ওপরের অংশে বিস্ফোরণ ও বিস্ফোরণের পর আগুন লেগেছে।’
কেন এই বিস্ফোরণ হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জাহাজে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না। জাহাজে রুটিন ওয়ার্ক কাজ করতে যে তিনজন গিয়েছিলেন তারাই নিহত হয়েছেন। মনে হয় তারা কোনো কাজ করতে যাওয়ার পরই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রকৃত ঘটনা তদন্তে বের হয়ে আসবে। এজন্য দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হেেছ।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি তদন্ত কমিটি ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য কী করতে পারে সে বিষয়ে নির্দেশনা দেবে। অন্য কমিটি দুর্ঘটনায় যে তিনজন নিহত হয়েছেন তাদের কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় এবং সব প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেবে।’
জানা যায়, বিএসসির বহরে বর্তমানে সাতটি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি সমুদ্রগামী, যা বহির্বিশ্বের পণ্য পরিবহনে কাজ করছে। বাকি দুটি লাইটার জাহাজ। লাইটার জাহাজ দুটি ১৯৮৭ সালে ডেনমার্কে তৈরি করা হয়েছে। বাংলার জ্যোতি এমনই একটি লাইটার জাহাজ। যে জাহাজ মাদার ভেসেল ( বড় জাহাজ) থেকে তেল নিয়ে এসে ইস্টার্ন রিফাইনারিকে দিয়ে থাকে। ইস্টার্ন রিফাইনারি এই তেল পরিশোধন করে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানিকে সরবরাহ করে। আর এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সারা দেশে জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়।