নতুন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় সংস্কার। বিভিন্ন ক্ষেত্রের সংস্কার নিয়ে গোষ্ঠী ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা ধরনের প্রস্তাবনা আসছে যা ইতিবাচক। নিঃসন্দেহে সংস্কারের প্রশ্ন রাজনৈতিক। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা কেমন হওয়া উচিত সেটা রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হবে। যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের সংস্কার চাওয়ার অধিকার সবার আছে, বিশেষ করে নাগরিক অধিকারের জায়গা থেকে। তবে সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যটা বোঝা জরুরি এবং কেন সংস্কার দরকার সেই সমঝোতাটাও সেরে নেওয়া দরকার। এই ধরনের দরকারি আলাপ ছাড়া সংস্কার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গেলে লাইনচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সংখ্যালঘুর অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ যেকোনো পদক্ষেপেই সংস্কারবিরোধী উদ্যোগ। সে রকমটা হতে চলছে এই মুহূর্তে তেমনটা বলা অপরিপক্বতা তবে এর আশঙ্কাও একবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যালোচনায়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে প্রশ্নগুলোকে বাদ দিয়ে সংস্কার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা দুঃসাধ্য। আর এসব প্রশ্নের মধ্যেই রয়েছে যে, বাংলাদেশ কী আগের থেকে বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, নাকি কোনো গোষ্ঠীর মতাদর্শ দ্বার নির্ধারিত হবে? সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সব জনগণের অধিকারের গণ্ডি কি আরও বিস্তৃত হবে নাকি সীমিত? মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার আওতা কি বাড়বে নাকি সেখানেও কোপ পড়বে? মানুষ কি স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারবে নাকি একের পর এক টানাপড়েনে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে? এ সবগুলো প্রশ্নই মৌলিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত এবং একই সঙ্গে সাংবিধানিক অধিকারও।
এতো গেল নতুন বাংলাদেশের ভাবাদর্শগত জায়গা থেকে কিছু বিষয়। তবে বাংলাদেশের জনগণের সংকটসমূহ শুধু আদর্শিক নয় প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার সঙ্গেও যুক্ত। সমাজে অস্থিরতার বেশ কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে যা অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ভূত। বেশ কিছুদিন যাবৎ আমরা কর্মসংস্থানহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখে আসছি। যুব জনমিতির যে সুযোগ তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের অভাবে তা প্রায় ব্যর্থ হতে বসেছে। সরকারি তথ্য মতে, দেশে প্রায় ৪১ শতাংশ যুব জনগোষ্ঠী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আয়ের সঙ্গে যুক্ত না। লেখাপড়া জানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার গড় হিসাবের থেকে অনেক বেশি। কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তারই একটি প্রতিধ্বনি পাওয়া গেছে, যা শেষে গিয়ে এক দফায় পরিণত হয়েছে। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন সরকারকে অনেক বেশি সচেতন মনে হয়েছে, অর্থনৈতিক খাত সম্পর্কিত শ্বেতপত্র প্রকাশে সরকারের জায়গা থেকে একটি কমিটি করা হয়েছ। তবে এই ধরনের উদ্যোগ কি যুবদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোনো গতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারবে?
বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থায় সংকটের একটি বড় বিষয় হচ্ছে প্রশাসন বা শাসন বিভাগের সঙ্গে নাগরিকদের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক অনেক সময় শাসক ও শোষিতের মধ্যকার ক্ষমতা সম্পর্ক দ্বারা নির্ধারিত। নতুন বাংলাদেশে এই সম্পর্ককে উভয়ের জন্য মর্যাদাপূর্ণ করা দরকার। এমন একটা ব্যবস্থা দরকার যেখানে নাগরিকরা নিজেদের যেমন মর্যাদাবান মনে করবেন এবং একইসঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ করবেন। কোনো ধরনের অন্যায় আচরণ ও সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের বিশেষ মর্যাদা ও ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে ভাবার সুযোগ পাবেন না। অধিকন্তু জনগণকে সেবা প্রদানে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবেন। বিভিন্ন ধরনের জবাবদিহির কাঠামো তা তাদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেবে। যে ভিআইপি কালচার দেখে আমরা অভ্যস্ত সেই কালচারের সংস্কার দরকার। শাসক হওয়ার ও শাসনের নামে শোষণ করার ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে।
আমাদের সমাজব্যবস্থায় আইনের শাসনের বড়ই অভাব। ব্যক্তিবিশেষে আইনের ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োগ দেখা যায়, ক্ষমতাবানদের ইচ্ছা ও অনিচ্ছায় আইনের প্রয়োগের তারতম্য সমাজের মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আইনের ঊর্ধ্বে যেমন কেউ না তেমনি ব্যক্তি ও অবস্থা ভেদে আইনের প্রয়োগের তারতম্য আইনের শাসনের পরিপন্থি। আইনের শাসনে জনগণও ততটুকু ক্ষমতাবান যতটুকু ন্যায্য ও আইনের মধ্যে পড়ে। সুশাসন নিয়ে নাগরিকদের দাবি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে আইনের শাসনের কোনো বিকল্প নেই। দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা শাসন বিভাগের জন্য যেমন প্রযোজ্য একইভাবে বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগের জন্যও প্রযোজ্য হতে হবে। যদিও আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহির সংস্কৃতির প্রচণ্ড ঘাটতি। বিশেষ করে ক্ষমতাবানদের কখনো জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয় না, সেটা রাষ্ট্রের সব পর্যায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্যদিকে ক্ষমতাবানরা দায়িত্ব পালনে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দেন না, ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। দুই বছর, পাঁচ, সাত বা পনেরো বছর পর পর হঠাৎ জবাবদিহির রীতি জনগণের জন্য মঙ্গলকর নয়, তার সব থেকে বড় ভুক্তভোগী আমরা। সে বিবেচনায় রাষ্ট্রের সব বিভাগে জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে যা হতে হবে জনগণের অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের অধীনে। আর তা করা গেলে যে দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে দেশকে ধীরে ধীরে মুক্ত করা সম্ভব।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় রাজনৈতিক সংস্কার একটি জটিল বিষয়। ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলো বারেবারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে তা ভঙ্গ করেছে। একবার ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলো তোষামোদকারী ও সুবিধালোভীদের দ্বারা এমনভাবে আবৃত হয়ে যায় যে সংস্কার তখন একটি দুরাশা মাত্র। অধিকন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেমকে টিকিয়ে রেখে সুবিধা আদায় করা যেন তাদের জন্য প্রধানতম কাজ হয়ে যায়। আমাদের সংস্কৃতিতে ‘পরশ্রীকাতরতার’ প্রভাব নিয়ে নানা সময়ে আলাপ-আলোচনা করা হয় এবং একই সঙ্গে এ নিয়ে নানা ধরনের ঠাট্টা মশকারাও প্রচলিত আছে। ব্যাপকভাবে আলোচিত না হলেও ‘হীনমন্যতা’ কীভাবে সমাজের অগ্রগতির জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তা নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে ‘প্রতিহিংসাপরায়ণতা’ ও ‘পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া’ আমাদের সমাজের অগ্রগতির একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। প্রতিহিংসা ও পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া শুধু পুরনো চক্রে বন্দি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই তৈরি করে।
ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কার প্রস্তাবনা তৈরির লক্ষ্যে বেশ কিছু কমিশন গঠনে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সংস্কার প্রশ্নে এটি একটি অগ্রগতি। তবে সংস্কার প্রস্তাবনা হতে হবে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিরপেক্ষ সামগ্রিক অগ্রগতির বিবেচনায় এবং জনগণের ক্ষমতায়নের নিমিত্তে। পাশাপাশি সংস্কার অ্যাজেন্ডাকে যত দ্রুত সম্ভব অন্তর্বর্তী সরকারের চর্চায় নিয়ে আসতে হবে। সব সংস্কারের জন্য প্রস্তাবনা চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষার দরকার নেই, এর কোনো কোনোটি এখনই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কারণ শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংস্কার প্রশ্নে জনগণের আকাক্সক্ষা, সমর্থন ও সংস্কার কার্যক্রমের গতি বেশি দিন ধরে রাখা যাবে না।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
psmiraz@yahoo.com