চার দশকের ঈর্ষণীয় ক্যারিয়ার। দেখেছেন সাফল্যের চূড়ান্ত। অডিও ইন্ড্রাস্ট্রির উত্থান এবং পতন। এই দীর্ঘ সময়ে বদলেছে অনেককিছুই। কিন্তু বদলায়নি জেমসে্র গান; আর তার প্রতি আমাদের ভালোবাসা। এখনো তিনি যখন মঞ্চে উঠেন তাকে যতটা কাছের মনে হয়, মঞ্চ ছাড়তেই হয়ে যান ততটা দূরের।
‘ক্যাসেট’, ‘সিডি’, ‘এমপি’ থ্রি হয়ে ‘স্পটিফাই’— সঙ্গীতের কত রূপ দেখতে হলো তাকে। তবুও এখনো তার কনসার্টে জেগে ওঠে ভালোবাসার উদ্দীপনা; বিরহে নামে পদ্মপাতার জল। বোহেমিয়ান জীবন, খ্যাতি, প্রেম, বিচ্ছেদ— সবই আছে জেমসে্র জীবনে। এসব নিয়েই তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মঞ্চ তারকা হিসেবে ধরে রেখেছেন শীর্ষ অবস্থান। তিনিই সম্ভবত প্রথম কোনো বাঙালি গায়ক, যিনি মঞ্চে ভক্তদের উদ্দেশে উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দেন।
অক্টোবরের ০২ তারিখ জেমসে্র জন্মদিন। এ বছর ষাটে পা দিলেন তিনি। জন্মেছিলেন নওগাঁয়। ১৯৬৪ সালে। শৈশব কেটেছে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে। পরিবারের কেউ কখনো গানের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ফলে বড় ছেলের গায়কজীবন চাননি বাবা ড. মোজাম্মেল হক আর মা জাহানারা খাতুন। পড়াশোনা না করায় কিশোর বয়সেই তাকে নিতে হয় কঠিন সিদ্ধান্ত। ঘর ছেড়ে পথে নেমেছিলেন জেমস্। পথেই হয়েছিল জানাশোনা।
সেই সময় তার ঠিকানা হয় চট্টগ্রামের কদমতলী এলাকার আজিজ বোর্ডিংয়ে। ‘১২ বাই ১২’-এর একটি ছোট্ট ঘরে থাকতেন তিনি। বোর্ডিংয়ের সামনের এক ছোট্ট রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া করতেন। আর সন্ধ্যায় সময় কাটতো হোটেল আগ্রাবাদের নাইট ক্লাবে। মার্ক নফলার, এরিক ক্ল্যাপটন, বব ডিলান, জিম মরিসন, বব মার্লের গান গাইতেন তিনি। এখনো ব্যান্ডপাড়ায় কান পাতলে শোনা যায়, তার মতো করে মার্ক নফলার গাইতে-বাজাতে পারেনি কেউ। যদিও জনপ্রিয়তা আসার পর ইংরেজি গান করা ছেড়েই দিয়েছেন।
আজিজ বোর্ডিং নিয়ে স্মৃতিকাতরতা আছে জেমসে্র। অনেকবারই তিনি বলেছেন, ‘গানের টানে, প্রাণের টানেই ঠাঁই হয়েছিল সেখানে। গান, আড্ডা আর যা-ই হোক না কেন সব ওখানেই। আজিজ বোর্ডিংয়ের দিনগুলো কখনও ভুলব না।’ ভাগ্যিস, ঘর ছেড়েছিলেন। পরে বন্দর নগরী চট্টগ্রামও। না হলে কী প্রেমিকার কাছ থেকে চিঠি এসেছে বলে যমদূতকে ফিরিয়ে দেওয়া যেত? অথবা গ্রাম-বাঙলার গল্প উঠে আসতো ব্যান্ড গানের শরীরে?
কি হত ‘হারাগাছের নূরজাহান’, ‘বাঙলার লাঠিয়াল’, ‘মান্নান মিয়ার তিতাস মলম’, ‘যাত্রা’, ‘গাঁয়ের খবর’, ‘সুলতানা বিবিয়ানা’, ‘লেইস ফিতা লেইস’, ‘হাউজি,’ ‘সুস্মিতার সবুজ ওড়না’-এর মতো গানগুলোর? সাইকেডেলিক রকে ভরে কে শোনাতো আমাদের ফোকলোর?
আবু মুসা চৌধুরী, আসিফ ইকবাল, বাপ্পী খান, লতিফুল ইসলাম শিবলী, আসাদুল্লাহ দেহলভী, আনন্দ, মারজুক রাসেল, সুমন, বিশু শিকদার, শফিক তুহিন, গোলাম মোরশেদ, নিয়াজ আহমেদ অংশু, সাকী আহমেদ, রাজীব আহমেদ, জামীউর রহমান রনিম, তরুণ মুনশীর মতো কবি-গীতিকবিরা তাদের সবচেয়ে ভালো লিরিকগুলো লিখেছেন জেমসে্র জন্য। ফলে তার গান শুধু সুরনির্ভর নয়, কাব্যনির্ভরও।
গানের জন্য কবিতার কাছে শরণাপন্ন হতেও ভোলেননি জেমস্। কবি শামসুর রাহমানের রোমান্টিক পটবয়লার ‘উত্তর’-এর ফিলিংস ভার্সন ‘তারায় তারায়’ সেই শরণাপন্ন হওয়ার একটি উদাহরণ। আর তা ক্ল্যাসিক হয়ে আছে। অবশ্য এর আগেও কবিতা থেকে গান করেছিলেন তিনি। লতিফুল ইসলাম শিবলীর ‘প্রিয় আকাশী’ তেমন একটা গান। এরপর তার কণ্ঠে শোনা যায় কবি আবুল হাসানের বিখ্যাত ‘পাখি হয়ে যায় প্রাণ’ কবিতাটি। তবে এক্ষেত্রে শুধু প্রথম লাইনটাই (অবশেষে জেনেছি মানুষ একা) নিয়েছিলেন জেমস্।
গত শতাব্দীর আশির দশকে ফিলিংসের সঙ্গে যুক্ত হন জেমস্। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’। পরের বছরই জেমস্ হাজির হন একক অ্যালবাম নিয়ে। ‘অনন্যা’ নামের সেই অ্যালবামটি জনপ্রিয়তা পায় সঙ্গে সঙ্গেই। যদিও ডেব্যুর সবগুলো গানই ছিল ইংরেজি গানের সুরে। আর সবগুলো লিরিকই ছিল আসিফ ইকবালের লেখা।
এরপর ‘জেল থেকে বলছি’ (১৯৯৩), ‘নগর বাউল’ (১৯৯৬) ও ‘লেইস ফিতা লেইস’ (১৯৯৮)— এই তিনটি অ্যালবামের পর ভেঙে যায় ফিলিংস। ছন্দ হারায় ফান্টি-জেমস-আসাদের কিংবদন্তী বোঝাপড়া। জেমস্ গড়ে তোলেন নতুন ব্যান্ড ‘নগর বাউল’। তবে এই ব্যান্ডটি আটকে যায় প্রথম অ্যালবামেই। ‘দুষ্টু ছেলের দল’ (২০০১)-এর পর নগর বাউলের নতুন গান আর বেরোয়নি। এর কয়েকবছরের মধ্যে বলিউডে আত্মপ্রকাশ করে ক্রমশ একক হয়ে ওঠেন তিনি। পরিচালক মহেশ ভাটের বদৌলতে ছড়িয়ে পড়েন উপমহাদেশে। এ সময় নগর বাউল পরিণত হয় তার স্টেজ নেমে।
জেমসে্র একক অ্যালবামের সংখ্যা আটটি। অনন্যা’র পর একে একে বেরিয়েছে ‘পালাবে কোথায়’ (১৯৯৫), ‘দুঃখিনী দুঃখ করোনা’ (১৯৯৭), ‘ঠিক আছে বন্ধু’ (১৯৯৯), ‘আমি তোমাদেরই লোক’ (২০০৩), ‘জনতা এক্সপ্রেস’ (২০০৫), ‘তুফান’ (২০০৬) ও ‘কাল যমুনা’ (২০০৯)। এছাড়া অজস্র মিক্সড অ্যালবামে রয়েছে তার গান। সিনেমার গান, জিঙ্গেল তো রয়েছেই। সব মিলিয়েই নাইট ক্লাব থেকে মাঠে-ঘাটে পৌঁছেছেন তিনি।
আর এ নিয়ে জেমসে্র ভাষ্য যথেষ্ট স্ট্রেটকাট। ‘এক জীবনে অগণিত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। ভালোবাসা পেতে কার না ভালো লাগে! এ যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি। এটাও ঠিক, এই ভালোবাসা পাওয়ার পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। অনেক ওঠানামা ছিল। কিন্তু হাল ছাড়িনি। গান করেছি, এটাই ছিল আমার আনন্দ, এটাই ছিল আমার ভালো লাগা-ভালোবাসা। তারপর কী হয়েছে, না হয়েছে তা নিয়ে ভাবিনি। কিছু না হলেও গানই গাইতাম।’
ব্যান্ড বা সলো ক্যারিয়ার নিজের হাতে গড়লেও সংগীত পরিচালক লাকী আখান্দ্, প্রিন্স মাহমুদ, জুয়েল-বাবু, শউকত, কৌশিক হোসেন তাপস ও প্রীতমের পছন্দের তালিকায় ছিলেন জেমস্। ২০০৫ সালে বলিউডে যখন ‘ভিগি ভিগি’ গানটি প্রকাশিত হয়, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি মুম্বাইতে স্থায়ী হবেন। কিন্তু তিনি জানতেন, গণমানুষের গান করতে চেয়েছিলেন সারা জীবন। তাই ফিরে এসেছেন নিজ দেশে, নিজের শর্তে জীবন কাটাতে।
গানের রয়্যালিটি সংক্রান্ত জটিলতায় একবার একটি টেলিকম অপারেটরের বিরুদ্ধে মামলা করতে আদালতে গিয়েছিলেন জেমস্। পরে তা মিটমাটও হয়েছে। কিন্তু সে সময় রয়্যালিটি নিয়ে হয়রানির কারণে বিরক্ত হয়েছিলেন তিনি। গণমাধ্যমকর্মীদের বলেছিলেন, ‘আমি গণমানুষের গান গেয়েছি আজীবন। আমার জীবন দর্শন, আবেগ অনুভূতি, তরুণদের উৎসাহ দেওয়া, দেশপ্রেমের কথা বলা— সবই এনেছি গানের ভেতর।’
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
nsrahman10@gmail.com