লেবাননের রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমাগত বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এবার বৈরুতের কেন্দ্রস্থলের একটি ভবন লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তেল আবিব। এ ঘটনায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বৈরুতের মধ্যাঞ্চলের বাশুরা এলাকার একটি ভবনকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ভবনটি হিজবুল্লাহর স্বাস্থ্য সংস্থার একটি ইউনিট হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এ ঘটনায় আরও সাতজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ২০০৬ সালের পর থেকে বৈরুতের কেন্দ্রস্থলে এটিই ইসরায়েলের প্রথম হামলা। মধ্যাঞ্চল ছাড়াও বৈরুতের দক্ষিণ অংশের দাহিয়া অঞ্চলে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এখানেই তেল আবিবের হামলায় নিহত হয়েছিলেন হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের যেসব মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন, তাদের পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত ফিরতে নিষেধ করেছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী। সেখানে অভিযান অব্যাহত থাকবে উল্লেখ করে গতকাল এই সতর্কতা জানান আইডিএফের মুখপাত্র অভিচয় আদ্রে। সীমান্ত এলাকায় হিজবুল্লাহর সুড়ঙ্গ ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংসের জন্য তারা লেবাননে স্থল অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। তবে বৈরুত বা উত্তর-দক্ষিণের কোনো গুরুত্বপূর্ণ শহরে বড় ধরনের অভিযানের পরিকল্পনা নেই বলে জানানো হয়।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামলা অব্যাহত রেখেছে হিজবুল্লাহও। বুধবার দেশটিতে দুই শতাধিকের বেশি রকেট ছুড়েছে সংগঠনটি। ইসরায়েলে প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, হিজবুল্লাহ তিন ধাপে ২৪০টি রকেট ছুড়েছে। তবে সেগুলোর বেশিরভাগই আপার গ্যালিলি অঞ্চলের পশ্চিমাংশে উন্মুক্ত স্থানে পড়েছে। এ ছাড়া অঞ্চলটির উত্তরাংশে উন্মুক্ত স্থানে পড়েছে দুটি রকেট। তবে লেবাননে স্থল অভিযানের সময় ইসরায়েলের তিনটি ট্যাংক ধ্বংস করেছে হিজবুল্লাহ। আলজাজিরা জানায়, সীমান্তবর্তী মারুন আল-রাস গ্রামে প্রবেশের সময় ইসরায়েলের তিনটি মেরকাভা ট্যাংক লক্ষ্য করে শক্তিশালী হামলা চালায় সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। এ এলাকাতেই হিজবুল্লাহর প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল ইসরায়েলের সেনারা। এই সফলতাকে একটি কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখছে হিজবুল্লাহ। এটি যোদ্ধাদের মনোবলও বৃদ্ধি করেছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
এদিকে, নিহত হওয়ার কয়েক দিন আগে হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহকে ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনটি ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর হিজবুল্লাহর পেজার বিস্ফোরণের পর গোষ্ঠীটির প্রধানকে ইরানে চলে যেতে অনুরোধ করে একটি বার্তা পাঠান খামেনি। বার্তাটিতে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সে বার্তায় বলা হয়েছিল, গোষ্ঠীটির মধ্যে ইসরায়েলি অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং নাসরাল্লাহকে হত্যার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
লেবাননে নিহত আইআরজিসি কমান্ডার আব্বাস নিলফোরোশন ছিলেন সেই বার্তাবাহক। ইসরায়েলের হামলায় নাসরাল্লাহর সঙ্গে নিহত হন তিনিও। খামেনি এখন তেহরানে সিনিয়র সরকারি পদে ইসরায়েলি অনুপ্রবেশ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এরই মধ্যে ইরানের অভ্যন্তরে একটি নিরাপদ অবস্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে খামেনিকে। তার নির্দেশেই গত মঙ্গলবার ইসরায়েলে ১৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান।
তবে ইসরায়েলি আগ্রাসনের মধ্যেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের উদ্যোগ নিচ্ছে লেবানন। ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতার মধ্যে প্রায় ভঙ্গুর রাষ্ট্রটির পুনর্গঠনের প্রচেষ্টাস্বরূপ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানান দেশটির কয়েকজন নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদ। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকেই লেবাননে প্রেসিডেন্ট পদ খালি রয়েছে। দেশটির মন্ত্রিসভাও ততটা কার্যকর নয়। নাসরাল্লাহর মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্সির ইস্যুটি আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন শিয়া পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি। হিজবুল্লাহ সমর্থক বেরি এ বিষয়ে নমনীয় থাকার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নাজিব মিকাতি এমন একজন প্রেসিডেন্ট চান, যাকে নিয়ে কেউ আপত্তি তুলবেন না।
লেবানন জুড়ে ইসরায়েলের টানা হামলায় শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের বিশেষ সমন্বয়ক জেনিন হেনিস-প্লাশকার্ট। কোনো সতর্কতামূলক সাইরেন ছাড়াই ইসরায়েল হামলা চালানোয় মানবিক সংকটের চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা প্রশমনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে চীন। লেবাননে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে বুধবার নিরাপত্তা পরিষদের ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন জাতিসংঘে চীনের প্রতিনিধি ফু কং। চলমান পরিস্থিতি ‘খুবই সংকটাপন্ন’ বলে সতর্ক করে ফু কং বলেন, সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হলে তা হবে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়। তবে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়টি উসকে দিলে তা ভুল বার্তা দিতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
লেবাননে বিমান ও স্থল হামলার মধ্যেও ফিলিস্তিনে অভিযান অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। গাজা উপত্যকায় তেল আবিবের অভিযানে গতকাল শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী গতকাল দাবি করেছে, তিন মাস আগে চালানো হামলায় গাজার প্রধানমন্ত্রী রাহি মুস্তাহা, হামাস কর্মকর্তা সামি ওদেহ এবং সামেহ আল-সিরাজের মৃত্যু হয়েছে। তাদের লক্ষ্য করে গাজার উত্তরাঞ্চলের একটি সুড়ঙ্গে বিমান হামলা চালানো হয়েছিল। হামাসের যোদ্ধাদের মনোবল যাতে ভেঙে না পড়ে, সেজন্য এই তথ্য হামাস গোপন রেখেছিল বলে দাবি তেল আবিবের।