কর্মজীবনের প্রথম দিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার ইচ্ছা হয়েছিল। আমার একজন শিক্ষক ছিলেন যিনি একজন শিক্ষার্থীও যদি কোনো বিষয়ে ১৯/২০ করত, তাহলে লাইন দিয়ে সবাইকে মারতেন। আবার সেই শিক্ষককেই দেখা যেত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে তার বাসায় গিয়ে মাথার কাছে বসে হাত বুলাচ্ছেন। সামাজিক আর পারিবারিক বাস্তবতার চাপে আমার মাস্টার মশাইয়ের মতো শাসন আর আদরের সমন্বয়ে শিক্ষক হওয়ার বাসনাকে এক সময় হারিয়ে ফেলি। কারণ সে সময় থেকেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকদের আদর ও শাসন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করে। তারপরও নিজের ইচ্ছে এবং মাস্টার মশাইয়ের প্রতি সম্মানের কারণে শিক্ষাজীবন শেষে প্রথম সুযোগেই শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করি। যদিও নিজের পক্ষ থেকে আন্তরিকতার কোনো অভাব না থাকার পরও এই পেশাগত জীবন খুব দীর্ঘ করতে পারিনি। সে কারণে পরে যখন সুযোগ পেয়েছি তখনই আবার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। আবার পেশা পরিবর্তনের পরও নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছাপূরণের জন্য সুযোগ হলেই গ্রামের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি।
স্বল্প সময়ের শিক্ষকতা পেশায় থাকাকালে একটা বিষয়ে খুব পরিষ্কার ধারণা হয়েছে যে, আজকের সময়ে যারা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন তারদর আন্তরিকতা অনেক কমে গেছে। শিক্ষকদের মধ্যে একটা অংশ এই পেশাকে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আজ এই যে শিক্ষকদের অপমান, অসম্মান, হেনস্তা এ সবই এমন শিক্ষক সমাজের অবদানের অংশ হিসেবে সামনে আসছে কি না ভেবে দেখা প্রয়োজন।
শিক্ষকদের কাছ থেকেই শিখেছিলাম ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের নৈতিকতা, মানবিকতা, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ। আমার আজকের অবস্থান সেই শিক্ষাগুরুদেরই অবদান। যদিও নিজের ব্যর্থতার কারণে তাদের প্রদত্ত শিক্ষাকে পরিপূর্ণভাবে অর্জন করতে পারিনি। এখনো সমাজে এমন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের অভাব আছে তা মনে করি না। কিন্তু পরিকল্পনাহীন শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্তি, ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতিযোগিতায় নেমে অনেক শিক্ষক পেশার মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলেছেন। দিনে দিনে সরকারি ও রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় এই শিক্ষকরা বেড়েই চলেছেন আর সামাজিক মর্যাদাহীন হয়ে পড়েছেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত যেভাবে শিক্ষক অসম্মান চলমান তা প্রতিরোধে কেউ দাঁড়াতে পারছেন না। কেউ সারা দেশে শিক্ষকদের চরম অসম্মানের কারণ অনুসন্ধানে এগিয়ে আসছেন না।
শিক্ষা আজ পণ্যে পরিণত হয়েছে। অর্থ দিয়ে শিক্ষা কিনতে হয়। এ দায় কার কতটা তার বিচারের ভার জ্ঞানীগুণী শিক্ষিতজনদের ওপর ছেড়ে দিলেও কিছু শিক্ষক এ দায় এড়াতে পারেন না। এক দল শিক্ষক ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য পদ-পদবির লোভী হয়ে পড়েছেন এবং অন্য এক দল শ্রেণিকক্ষ থেকে কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট পড়ানোর মধ্য দিয়ে শিক্ষাকে পণ্যে রূপান্তর করেছেন। দেশে একজন অভিভাবকও পাওয়া যাবে না যিনি বলতে পারবেন, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার পর সন্তানকে নিয়ে শিক্ষকের দুয়ারে দুয়ারে তাকে ঘুরতে হয় না। এক সরকারি কলেজের বাংলা শিক্ষকের বাড়িতে সকাল ৬টা থেকে শুরু করে রাত ১০টা পর্যন্ত দলে দলে শিক্ষার্থীদের যাওয়া-আসা চলে। তিনি কখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা দিতে কলেজে যান তা এলাকার মানুষজনও বলতে পারবেন কি না সন্দেহ। এ অবস্থা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সবার জন্য আবশ্যক করে ফেলা হয়েছে। বাংলা বিষয়ের যদি এমন ব্যবস্থা হয়ে থাকে তবে ইংরেজি, অঙ্ক, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের অবস্থা কী?
অতীতে সরকারি দলের আনুকূল্যের পাশাপাশি বিনিময়মূল্য থাকায় পদপ্রাপ্তদেরও শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারিতে অনিয়ম, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, ছাত্র ভর্তিতে অর্থের লেনদেন, শিক্ষকদের নির্ধারিত ভাতা বা অন্যান্য প্রাপ্তিতে অনিয়মের মাধ্যমে দলীয় ক্ষমতাসীনদের তোষণ করে প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকরা বিচারের ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছিলেন। একজন উপাচার্য সরকারি দলের এক অঙ্গ সংগঠনের প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। দেশের রাজনীতি এতটাই অর্থকরী হয়ে উঠেছিল যে, উপাচার্যের পদের সম্মানের চেয়ে অঙ্গ সংগঠনের প্রধানের পদ পাওয়াকে গুরুত্ব দিতে শিক্ষকশ্রেষ্ঠ রাজি ছিলেন। দুই কোটি টাকা দিয়ে পদ বা সম্মান কেনার চেয়ে এই টাকার অংশীদার হওয়া লাভজনক বিবেচনা করেই নিশ্চয়ই তিনি এমন আশা ব্যক্ত করেছিলেন।
হানাহানি-মারামারির এ সমাজে শিক্ষক বৈষম্যহীন থাকতে পারবেন, তা স্বাভাবিক বলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দলকানা শিক্ষকরা সরকার ঘোষিত পৃথক বেতন কাঠামোর ভিত্তিতে বিভাজিত থাকায় নিজেদের প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের আন্দোলনকে বেগবান করতে এক যুগেও ঐক্য সৃষ্টি করতে পারেননি। তেমনি শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে রেখে ধ্বংসের দ্বার পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হলেও দলকানা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মুখ খোলেননি। তাই দলীয় রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের কাম্য। শুধু দলীয় ছাত্ররাজনীতি নয়, শিক্ষকদেরও দলীয় রাজনীতি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
জাতি গঠনের কারিগরদের নিজেদের কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। আর আন্দোলনকারীদেরও বিশ্বাস রাখা প্রয়োজন, তাদের মেধার চরম বিকাশে শিক্ষকের কী অবদান। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্কের একটা মেরূকরণের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ এবং পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো জরুরি। অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী এখনো আছেন যারা হেনস্তা হননি, হেনস্তায় অংশ নেননি বরং হেনস্তাকৃত শিক্ষককে সম্মানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনছেন। মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিলোপ যে এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটেনি, এটাই তার প্রমাণ।
লেখক : সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি)
khairulumam1950@gmail.com